ঘোষণা চাই বিরোধী দলে গেলে কী করবেন

Send
সাইফুল হাসান
প্রকাশিত : ১৪:১৭, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৪, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮

সাইফুল হাসান৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ উপলক্ষে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মহাজোট এবং ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ঐক্যফ্রন্টের পাশাপাশি বিএনপিও আলাদা একটি ইশতেহার দিয়েছে। ক্ষমতায় গেলে কে কী করবেন-তার বয়ান আছে ঘোষিত এসব ইশতেহারে।
ইশতেহার মূলত একটি রাজনৈতিক দলিল। যেখানে সমাজ ও রাষ্ট্রে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন এবং কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, সম্পদবণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনাগুলো প্রতিফলিত হয়। যদিও, প্রতিশ্রুতি, স্বপ্ন, সম্ভাবনায় সাজানো ইশতেহারগুলো মূলত সরকারে যাওয়ার বিবেচনা থেকে তৈরি। কথা হচ্ছে, ভোটে যেকোনও একপক্ষ জিতবে। মহাজোট বা ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু যারা পরাজিত হবে, তারা কী করবেন? সেই ঘোষণা কোথায়?
এ বিষয়ে ইশতেহারে পরিষ্কার ঘোষণা থাকা উচিত। কেননা, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দায়-দায়িত্ব কোনও অংশেই সরকারের চেয়ে কম নয়।

এ দেশের সরকার ও বিরোধী দল সম্পর্কে জনগণের অভিজ্ঞতা বিপুল। সুশাসন-কুশাসন, ক্ষমতার ব্যবহার-অপব্যবহার, সরকার দলীয়দের দৌরাত্ম্য, আস্ফালনের সঙ্গে মোটামুটি সবাই পরিচিত। অন্যদিকে,বিরোধী দল লাগামহীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে। সংসদে যেতে চাইবে না এবং টানা সংসদ বর্জন করবে। তবে, রাষ্ট্রীয়-সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণকে অধিকার মনে করবে। বিরোধীদের এমন আচরণও এদেশে কারো অচেনা বা অজানা নয়। বিরোধীরা সম্ভবত ভুলেই যান, জনগণ তাদের সংসদে পাঠিয়েছেন।

‘উইনার টেকস অল’–এটাই এ দেশে সবচেয়ে চালু নীতি। ফলে, সরকার ও সরকারি দল ছাড়া, বাকিদের প্রায় বাতিল গণ্য করা হয়। দেশের সর্বত্র তাদের একচেটিয়া আধিপত্য। তা এতটাই যে সাধারণভাবে কল্পনাও অসম্ভব। নদ-নদী, খাল-বিল, বন-জঙ্গল, ঢাকা-চট্টগ্রাম, টেকনাফ-তেতুলিয়া– সবকিছুতে সরকারের প্রভাব ব্যাপক। সরকার, সংসদের ভেতরে-বাইরে বিরোধীদের কোনও স্পেস দিতে চায় না। বরং সর্বদা চাপে রাখার চেষ্টা করে। আর বিরোধীরা এই সুযোগই খোঁজে। তার সংসদে যেতে উৎসাহবোধ করে না। অবশ্য দশম সংসদের কথা আলাদা।

তুলনামূলক বিচারে, ৫ম জাতীয় সংসদ হচ্ছে, সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সফল ও কার্যকরী। কারণ, এই সংসদে সরকারের মতোই বিরোধী দল ছিল প্রতাপশালী। সে সময় প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাছাড়া, ওই সময়ে রাজনীতি এত দূষিত ছিল না। রাজনীতিবিদদের মধ্যে আন্তযোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল ভালো। সদ্য স্বৈরাচার হটানোর উত্তাপ এবং ইতিবাচক অনেক উপাদান ছিল রাজনীতিতে।

এরপর প্রতিটি নির্বাচনেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি। এতে সংসদে বিরোধীরা সত্যিকারের সংখ্যালঘুতে পরিণত হয় এবং এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। সংসদে আসন কম থাকার কারণে তারা সংখ্যাগত তো বটেই, মানসিকভাবেও দুর্বল হয়। যদিও তা হওয়ার কথা নয়। এ পরিস্থিতির জন্য সরকার ও বিরোধী উভয়পক্ষই দায়ী।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে, বিরোধীদলকে বিকল্প বা ছায়া সরকার বলা হয়। যাদের প্রধান কাজ হচ্ছে, জনগণের পক্ষে সংসদে, সরকারকে নিরন্তর প্রশ্ন করে যাওয়া। এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকারের নীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা, জনকল্যাণ বিবেচনায় প্রয়োজনে বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা। সংসদের ভেতরে বাইরে জনমত গঠন ও সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা। মূল কথা হচ্ছে, সংসদে থেকে সরকারের মতোই বিরোধী দলকেও পারফর্ম করতে হবে।

সরকার কথা বলতে দিতে চায় না, এ অভিযোগ অনেকাংশেই সত্য। আবার বিরোধী দলগুলোরও আন্তরিক চেষ্টা থাকে না-এটাও সত্যি। তারা বরং রাজনৈতিক ফায়দা নিতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। বিরোধীদল হলেই সব কাজে বিরোধিতা করতে হবে এমন নয়। জনকল্যাণ বিবেচনায়, কখনও কখনও সরকারকে সহযোগিতা করাও তাদের দায়িত্ব। এই প্রজ্ঞা এবং বোধ দুটোই প্রবলভাবে অনুপস্থিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে। নাগরিক ধারণা হচ্ছে, দুর্বল বিরোধীদলের আরও ‘দুর্বল’ ভূমিকার কারণেই আধিপত্যবাদী ও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার সুযোগ পায় সরকারগুলো।

১৯৯১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতির হার সত্যিই হতাশাজনক। এরমধ্যে দশম সংসদের বিরোধী দলের হিসাব ধর্তব্যের মধ্যে না আনাই ভালো। কেননা, তারা হচ্ছে ‘সরকারি বিরোধী দল’।

টিআইবি ও সংসদ সূত্রে জানা গেছে, ৫ম সংসদের (১৯৯১-৯৬) সবক’টি অধিবেশন মিলিয়ে মোট কর্মদিবস ছিল ২৬৫টি। এরমধ্যে ১৩৫ দিন সংসদ বর্জন করে, প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সময় বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত ছিল। এবং বিরোধী দলের সংসদে উপস্থিতির হার এটাই সর্বোচ্চ। ৭ম সংসদে (১৯৯৬-২০০১), মোট ২১৯ কর্মদিবসের মধ্যে ১৬৩ দিন সংসদ বর্জন করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তৎকালীন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৮ দিন।

অষ্টম জাতীয় সংসদে (২০০১-২০০৬), ৩৭৩ কর্মদিবসের মধ্যে মোট ২২৩ দিন সংসদের বাইরে ছিল প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন ৪৫ দিন। সবশেষ, নবম জাতীয় সংসদে (২০০৯-২০১৩), মোট ৪১৮ কার্যদিবসের মধ্যে ৩৪২ দিন সংসদ বর্জন করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্ররা। এবং টানা ৮২ দিন সংসদ বর্জন করে রেকর্ড বইয়ে নাম লেখায় দলটি। বেগম খালেদা জিয়া এই সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০ দিন।

এসব তথ্যই প্রমাণ করে, বিরোধী দলগুলো তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। ওয়াক আউট, সংসদ বর্জন সংসদীয় রীতিনীতিরই অংশ। তাই বলে টানা সংসদ বর্জন কারো একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। কারণ, সংসদে না গিয়েও সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন প্রতিটি সংসদের বিরোধীদলীয় সদস্যরা। কাজটা আইনত ঠিক, কিন্তু কতটা নৈতিক? জনগণের টাকায় সম্মানী নেবেন, বিদেশ ঘুরবেন, বিনা শুল্কে গাড়ি আনবেন, অথচ জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য সংসদে বসবেন না, এটা হতে পারে না। হওয়া উচিত না। এমন ব্যবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন জরুরি।

সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এতে জনগণ বঞ্চিত হয় এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে, বিরোধী দলগুলোকে সংসদে ধরে রাখতে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। টানা ৯০ দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকলে সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে-এই বিধানের পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ৩০ দিন করা প্রয়োজন। বিশেষ কারণ ছাড়া, টানা ১৫ কর্মদিবস সংসদে অনপুস্থিত থাকলে সদস্যদের সম্মানী ও অন্যান্য সুযোগ-‍সুবিধা রহিত করার বিধান করা যেতে পারে। মোট কথা, বিরোধী দলের সংসদে উপস্থিতি বাধ্য করার জন্য রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গীকারের ব্যবস্থা করতে হবে রাজনীতিবিদদেরই।

বিরোধী দল না থাকলে, সরকারি দলের সদস্যরাও সংসদে যেতে খুব একটা আগ্রহ পান না। কোরাম সংকটের তথ্যগুলোই তার প্রমাণ। প্রতি সংসদে কোরাম সংকট এক বিড়ম্বনার নাম। বিরোধী দলহীন নবম সংসদে কোরাম সংকেটের কারণে ২২২ ঘণ্টারও বেশি সময় অপচয় হয়। অষ্টম সংসদে কয়েকবার মাঝপথে অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সরকার দলীয় সাংসদদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদ ভেঙে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেন। তথ্য-উপাত্ত বলছে, বিরোধী দল সংসদে থাকলে, সরকারি দলের সদস্যদের উপস্থিতিও বাড়ে।  

সংসদকে বলা হয় আইন সভা। নীতিনির্ধারণ, দিকনির্দেশনা ও আইন প্রণয়নই সাংসদদের কাজ। যদিও এ কাজেই তারা সবচেয়ে কম সময় দেন। সক্রিয় বিরোধী দল না থাকলে তো কথাই নেই। সরকার তার নিজের মতো করে আইন পাস করিয়ে নেয়। ফলে, কোনও আইন নিয়েই তেমন কোনও আলোচনা হয় না। সরকার দলীয় সদস্যরা সচরাচর কোনও বিলের বিরোধিতা করে না। সংসদে হ্যাঁ বা না জয়যুক্ত করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

যে কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ একেকটি বিল পাস হতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। টিআইবির গবেষণা বলছে, গত তিনটি সংসদে, সদস্যরা সবচেয়ে বেশি অংশ নিয়েছেন বাজেট আলোচনায়। নবম সংসদে ৪১৮ কর্মদিবসে (১৩৩১ ঘণ্টা) ২৭১টি আইন পাস হয়। এসব আইন প্রণয়নে ব্যয় হয় মাত্র ১০৯ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট। বিল উত্থাপন, বিলের ওপর আলোচনা, মন্ত্রীর বক্তব্যসহ একটি বিল পাস হতে সময় লাগে গড়ে প্রায় ১২ মিনিট।

জনগণের ভোটেই সরকার ও বিরোধী উভয়পক্ষই সংসদে যাবে। জনরায়ের প্রতি সবারই সম্মান দেখানো উচিত। ওয়াক আউট, সাময়িক সংসদ বর্জন চললেও তা যেন ‘বদভ্যাস’ হয়ে না দাঁড়ায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে রাজনীতিবিদদের। সংসদে থাকতে ভালো না লাগলে পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ ছাড়লে সুযোগ-সুবিধাও ছাড়তে হবে। বিরোধী দলে গেলে, তারা কীভাবে রাষ্ট্র-সরকার পরিচালনা এবং জনকল্যাণে ভূমিকা রাখবে– ভোটের আগেই এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অঙ্গীকার দরকার ছিল।

আশা রাখি ভবিষ্যতে দলগুলো তাদের ইশতেহারে বিরোধী দল বিষয়ক একটি অধ্যায় যুক্ত করবেন। পাশাপাশি নাগরিক সমাজও বিধানটি ইশতেহারে যুক্ত করার দাবি তুলতে পারে। মোদ্দাকথা, এক সদস্যের বিরোধী দল হলেও সংসদে থাকতে হবে। সরকার কোণঠাসা করতে চাইবে, কিন্তু বিরোধীদের শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সরকার অন্যায় করলে, বিচার করবে জনগণ। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত আপনাকে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, বিরোধী দল হচ্ছে সরকারের আয়না। তাদের ওপরই নির্ভর জনগণের সাফল্য, স্বাধীনতা, অর্জন। রাষ্ট্রের উন্নতি এবং সমৃদ্ধি।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ