দুই এমপির শপথের সিদ্ধান্ত: ভাঙছে কি গণফোরাম ও ঐক্যফ্রন্ট?

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:২৯, জানুয়ারি ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৪, জানুয়ারি ২৯, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনকোনোভাবেই কি ঐক্যফ্রন্টের ফাটল রোধ করা যাচ্ছে না? এক নেতা যদি বাঁয়ে যান অন্যজন তাকে টেনে ধরেন। আবার ডানে যেতে গেলে আরেকজন বলেন, সোজা চলো। বিষয়টা কি বেতাল গতির পরিণতি?
নির্বাচন নিয়ে এন্তার অভিযোগ ঐক্যফ্রন্টের। কিন্তু নির্বাচনের ৬ দিনের মাথায় ড. কামাল হোসেন তার দলের নির্বাচিত দুই এমপির শপথ নেওয়ার বিষয়কে ইতিবাচক মন্তব্য করলেন সাংবাদিকদের সামনে। এমন কথায় আকাশ ভেঙে পড়ে জোটের বড় দল বিএনপির মাথায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তুমুল আলোচনার খোরাক পেলো ঐক্যফ্রন্টের ভাঙনের সুর শুনে। ৬ জানুয়ারিই ডাকা হলো ঐক্যফ্রন্টের সংবাদ সম্মেলন। তামাম নেতাদের উপস্থিতিতে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মহসীন মন্টু বললেন, এটা হচ্ছে না। ওই সময় ড. কামাল হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। আগের দিনে দেওয়া ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যকে ভুলভাবে গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযুক্ত করলেন পত্রিকা-টেলিভিশনকে। ভুল বোঝাবুঝির অবসান করার জন্যই সাংবাদিকদের সামনে ঐক্যফ্রন্টের এবং একইসঙ্গে গণফোরামের বক্তব্য উপস্থাপন করা হলো। সব দোষ গিয়ে পড়লো গণমাধ্যমের ওপর। এমন অবস্থায় গণমাধ্যম আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই আগের দিনে দেওয়া ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য পুনঃপ্রচার করে। স্পষ্ট হয়ে যায়, ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য ভুলভাবে প্রচারিত হয়নি।

পরদিন ঐক্যফ্রন্টের খবর প্রকাশ করলো। হেডলাইন হলো ‘ঐক্যফ্রন্টের এমপিদের শপথ নেয়ার প্রশ্নই আসে না’। ঐক্যফ্রন্ট ভাঙছে না এমন মন্তব্য তাই আসতেই পারে। রাজনৈতিক নেতারা বললেন, ঐক্যফ্রন্ট ভাঙার জন্য সৃষ্টি হয়নি।

বিএনপি সমর্থকদের অনেকেই মনে করেছিলেন–বিএনপির সঙ্গে আলোচনা না করে এভাবে গণফোরামের সংবাদ মাধ্যমে কিছু বলা ঠিক হয়নি। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমেই আরেকটি ছোট সংবাদ আগেই প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল। বলা হয়েছিল, বিএনপির সমর্থনপুষ্ট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম বাবলু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ করেছেন। যিনি খালেদা জিয়ার নিজ আসন বগুড়া-৭ নির্বাচনি এলাকা থেকে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বিএনপির মনোনয়ন না পেলেও ঘটনাক্রমে বিএনপির সমর্থন লাভ করেন। বিএনপির দলীয় কর্মী, সমর্থকরা তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। আশা ছিল, বিএনপি থেকে কোনও প্রার্থী না থাকলেও এ আসনটি হাতছাড়া হচ্ছে না অন্তত। কিন্তু যখন ঘোষণা করা হলো নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ শপথ গ্রহণ করছেন, তিনি বিএনপির অনুমতি না নিয়ে কিংবা তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই শপথ নিলেন।

বলতেই পারেন, তিনি তো আর বিএনপির টিকিটে নির্বাচন করেননি। ‘ফাও’ হিসেবে বিএনপির সমর্থন নিয়ে বৈতরণী পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না, বিএনপি তাকে ভরসাস্থল ভেবেই সমর্থন দিয়েছিল। আর তার শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে কি বিএনপির সেই ভরসাতে ফাটল ধরলো না?

প্রশ্ন হলো, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর তো সরাসরি ধানের শীষে চড়েই নির্বাচনে উতরে গেছেন। তাকে শুধু সমর্থনই নয়, মার্কাটাও দিয়েছে বিএনপি। কুলাউড়া-কমলগঞ্জ আসনে ধানের শীষ মার্কা তাকে দিতে গিয়ে বিএনপিকে আরেকটা রাজনৈতিক ত্যাগও করতে হয়েছে। কুলাউড়ায় বিএনপির জনপ্রিয় এমপি প্রার্থী ছিলেন এম এম শাহীন। তিনি একাধিকবার এমপি ছিলেন বিএনপির। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে যখন সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের নাম নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, তখন শাহীন সাহেব ‘দৌড়ের ওপর’ বিকল্পধারায় যোগ দিয়ে নির্বাচন করলেন বিএনপি সমর্থিত ও গণফোরামের প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের বিরুদ্ধে। তার মানে হচ্ছে– এম এম শাহীনের মতো নামি একজন নেতাকেও হারালো বিএনপি। সঙ্গে পরীক্ষিত কিছু কর্মীকেও।

সর্বশেষ সুলতান মোহাম্মদ মনসুর গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি। তবে বিএনপি কী করবে সেটা তাদের ব্যাপার।’

সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের বক্তব্য অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্ত আর জোটগত সিদ্ধান্ত স্পষ্টত ভিন্নতা পেয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, তিনি এটাও বললেন, বিএনপি কী করবে সেটা তাদের ব্যাপার। আরও স্পষ্ট হয়ে যায়, ঐক্যফ্রন্টের দুটি দল বিএনপি আর গণফোরাম যার যার তার তার হয়ে গেলো।

তাহলে মোস্তফা মহসীন মন্টুর বক্তব্য অনুযায়ী ‘ঐক্যফ্রন্টের কারো শপথ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না’- এমন কঠিন ঘোষণাটির জবাব কী দিয়ে দিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর?

এদিকে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, গণফোরামের দুই সংসদ সদস্যের শপথ নেওয়ার বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। তিনি সন্দেহ করেছেন গণমাধ্যমে এটা অপপ্রচার করা হয়েছে।

গণফোরামের পক্ষ থেকে ৬ জানুয়ারি বলা হয়েছিল, ড. কামাল হোসেনের মন্তব্য ভুলভাবে গণমাধ্যমগুলো প্রচার করেছে। ২৮ তারিখ রিজভী সাহেব এটাকে অপপ্রচার বলে আখ্যায়িত করলেন। তাহলে সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে যে সংবাদ ছাপা হলো সেটা কি ভুল? যেহেতু প্রতিবাদ হয়নি তাই ধরে নিতে হবে এটাই সত্য। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর এবং সিলেট-২ আসন  থেকে নির্বাচিত এমপি মোকাব্বির খান শপথ নেওয়ার মাধ্যমে নিজেরা সংসদে ঢুকছেন আর সরকারবিরোধী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাতেও পাথর ছুড়ে মারছেন- এমনটাই কি বলা হবে? তাদের এই সিদ্ধান্ত দেখে মনে হচ্ছে শৈশবের একটি খেলার কথা। হাতে হাত রেখে বৃত্ত বানিয়ে বসতাম শিশু-কিশোররা, একজন থাকতো বৃত্তের ভেতরে। তাকে বৃত্তের বাইরে যেতে হবে, কৌশলে। যখনই সে বের হওয়ার চেষ্টা করতো তখনই সমস্বরে বাকিরা বলতো– কোন দুয়ার দিয়া যাবি রে, বেতের বারি খাবি রে। তখন বাইরে যেতে ইচ্ছুক খেলোয়াড় ছটফট করতো, কিন্তু বের হতে পারতো না। বিএনপির অবস্থাটা যেন ঠিক তেমনই হয়েছে।

প্রশ্ন আসতে পারে, গণফোরাম এই দুই সংসদ সদস্যের সিদ্ধান্তকে দলীয় বলে মনে করছে কিনা। গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী ২৮ জানুয়ারি বলেছেন,‘কেউ যদি পার্টির সিদ্ধান্ত না মানেন বা জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান না দেখান তাহলে যা হওয়া তা-ই হবে। এখন সেটা তাদের ব্যাপার।’ ঐক্যফ্রন্ট নেতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, ড. কামাল হোসেন দেশে ফেরার পর সিদ্ধান্ত হবে।

এখন দেখার বিষয় ড. কামাল হোসেন দেশে ফিরে কি ৫ জানুয়ারিতে তার দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী শপথ বিষয়ে ইতিবাচক থাকেন নাকি দুই সংসদ সদস্যকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করে আরেকটা গণফোরাম তৈরি হওয়ার পথ খুলে দেন। তবে ঘটনাক্রমকে সাজালে এটুকু স্পষ্ট হয়ে যায়, দুই এমপি শপথ নিলে, গণফোরাম ব্র্যাকেটবন্দি হবে আর ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়া দল হিসেবে বিকল্পধারার অনুগামী হিসেবে গণফোরামের খণ্ডিত অংশের নামও যুক্ত হবে।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ