জামায়াত ও রাজনৈতিক ইসলাম

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১১:২৭, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩০, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-কে। জামায়াত তার সৃষ্টিলগ্ন থেকে গণমানুষের বিরুদ্ধে থেকেছে।   তার জেহাদি, মৌলবাদী, কট্টরপন্থী রাজনীতি কোথাও কখনও কোনও জাগরণ ঘটাতে পারেনি, তবে মানুষকে সন্ত্রস্ত করেছে দীর্ঘ সময় ধরে। দলটি এদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। তবে তা শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা ছিল না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে, বাহিনী গঠন করে জামায়াতের নেতা কর্মীরা সক্রিয়ভাবে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছে।
পুরোপুরি এসব না বলে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জামায়াতের ১৯৭১-এর ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি জামায়াত ছেড়েছেন, কারণ হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে গণমানুষ তার দলকে সমর্থন করেনি কখনও। এমনকি যারা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক তাগিদ বা প্রেরণা অনুভব করেন তারাও এই দলকে মেনে নেননি যে এই দল সৎ মানুষের রাজনীতি করে।
খাদ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার আদায়ে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। ন্যায়বিচার, বৈষম্যমুক্তি, প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থার দাবিতে নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের পাশে কখনও দাঁড়ায়নি এই দল। দলের কাঠামোতে কোনও গণতান্ত্রিক চরিত্র নেই। জামায়াত নেতারা ১৯৭১-এর ভূমিকা সম্পর্কে বারবার মিথ্যা বলেছেন বিধায় বৃহত্তর মুসলিম জনসমাজে তাদের তৈরি রাজনৈতিক ইসলাম কখনও প্রাসঙ্গিকতা পায়নি। জামায়াত ভুল স্বীকার করে সততার সঙ্গে বিচারের মুখোমুখি হতে চায়নি। চেয়েছে তালেবান, আল হামাস, হেজবুল্লা বা আল-কায়দা হতে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আশি ও নব্বইয়ের দশকে ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সমূহে জামায়াতকে জায়গা দিয়েছে অনেক সেক্যুলার দলও। কিন্তু প্রতিটি স্পেস এই দলটি ব্যবহার করতে চেয়েছে নিজেকে জেহাদি সংগঠন হিসেবে বিকাশের জন্য।
জামায়াত একদিকে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে থেকে রাজনীতি করে, আরেক দিকে মদিনা শাসনের আদলে শাসন ব্যবস্থা চায়। ফলে দেশের কিছু অঞ্চলে এবং পকেটে এদের শক্তিশালী ক্যাডার বাহিনী গড়ে উঠলেও তাদের ডাকে কখনও জনতা রাস্তায় নামেনি। বরং যারা স্বাধিকারের জন্য নেমেছে তাদের বিরুদ্ধে এই দল বারবার সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছে। কখনও আওয়ামী লীগের সমান্তরালে মাঠের আন্দোলন, আবার বিএনপির সঙ্গে ২০০১-সালে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে পারলেও জামায়াত তার রাজনৈতিক ইসলামের অনুকূলে জনমত ঘুরিয়ে দিতে পারেনি। তারা প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাফল্য পায়নি। বায়তুল মোকাররমের দরজায় শুক্রবারের নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে তাদের বহু চিৎকার ভেস্তে গেছে এদেশের সাধারণ মানুষের মনে চিরস্থায়ী জেগে থাকা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনেতিক চেতনার কারণে।
তবে একথা সত্য জামায়াতে নিজে রাজনৈতিক দল হিসেবে সফল না হলেও জামায়াতের কারণেই একটা রাজনৈতিক ইসলামের ধারা মাথা চাড়া দিয়েছে এদেশে। এরা আল-কায়েদা বা আইএসকে অনুসরণ করতে চায়, আর চায় বলেই হলি আর্টিজানের মতো জেহাদি সন্ত্রাসের তৎপরতা দেখায়। হেফাজতে ইসলামের মতো সংগঠন আজ বড় হয়েছে জামায়াতের কারণেই।
জামায়াত পাকিস্তানি ধারায় এক বাংলাদেশ চায়। কিন্তু খোদ পাকিস্তানেই জামায়াত এখন এক প্রান্তিক রাজনৈতিক দল। পাকিস্তান জামায়াত স্বৈরাচারের অপসারণ এবং প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচিত সরকার কায়েমের গণ-আন্দোলনে থাকেনি কখনও।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক কিংবা আর যারা জামায়াতের সংস্কার চেয়েছেন তারা কতটা এই সত্য অনুধাবন করেছেন জানা নেই। তবে সন্ত্রাসীদের লালন করে, প্ররোচণা দিয়ে, নেতৃত্বে রেখে জনগণের দল হওয়া আদৌ সম্ভব না, এটা হয়তোবা তারা দেরিতে হলেও বুঝেছেন। নাশকতা বা অন্তর্ঘাতের ঘটনা ঘটিয়ে জনজীবনে ত্রাস কায়েম করা যায়, অস্ত্রের ঝনৎকারে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের চেষ্টা করা যায়, কিন্তু আন্দোলনে বসন্ত আনা যায় না।
প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে এতদিন জামায়াত রাজনীতি করলো কী করে? আরও যেসব দল রাজনৈতিক ইসলামকে ভিত্তি করে রাজনীতি করছে তারাওবা আছে কী করে? এর কারণ সেক্যুলার রাজনীতির আপস। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের অভাবের কারণেই রাজনৈতিক ইসলামের জন্য জমি তৈরি হচ্ছে। আশ্রয় প্রশ্রয় পেয়ে বড় হচ্ছে, প্রভাব রাখছে ক্ষুদ্র, কিন্তু ক্রমশ সংগঠিত মৌলবাদীরা। তারা রাষ্ট্রের সেক্যুলার ইমারতকে ভেঙে ফেলতে সক্রিয়।
জামায়াতের আর প্রাসঙ্গিকতা নেই এদেশে। কিন্তু তার মাধ্যমে জায়গা পাওয়া রাজনৈতিক ইসলাম অন্য নামে, অন্য মোড়কে ডালপালা মেলছে। এদেশে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান স্বাভাবিক রাজনীতির ব্যর্থতাকেই সূচিত করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক শক্তিতেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করবে এটাই সহজ কথা। কিছু প্রতিক্রিয়াশীল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নামের এক তত্ত্বকে আশ্রয় করে এক আধিপত্যকামী জাতীয়তাবাদ তৈরি হয়েছে যা মূলত সাম্প্রদায়িকতাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে।
এই রাজনৈতিক ইসলাম আর প্রতিক্রয়াশীল জাতীয়তাবাদ আসলে একই শক্তি, একই আদর্শ। আজ বাংলাদেশ যে উন্নয়ন-চিন্তাকে রাষ্ট্রীয় ভাবনায় নিয়ে এসেছে সেই ভাবনার সঙ্গে এই রাজনীতি যায় না। উন্নয়নের কথা ভাবলে ভাবতে হবে উদার ধর্মনিরপেক্ষ শাসনতন্ত্রের কথা। আমরা যেন একটা উদার, সর্বজনীন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পথ থেকে সরে না আসি। এখনকার প্রেক্ষাপটটি গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ নির্বাচনের পর দেশের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নে ধর্মনিরপেক্ষতাকে আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত করার পথ এখন প্রশস্ত।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ