মাটির ভাষার দাবি ও স্বাধীনতার বীজ

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ২০:৫৮, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৯, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

স্বদেশ রায়ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সর্বোচ্চ উদার জাতীয়তাবাদ নয়। আর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ অনেক কম উদার।  জাতীয়তাবাদ তখনই উদার হয় যে সময়ে সেটা একটা কনসেপ্ট হয়। তখন স্বাভাবিকই তার ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি হয়। সেখানে উদারতা অনেক বেশি। যেমন- আমেরিকান জাতীয়তাবাদ, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। এই দু’টি জাতীয়তাবাদ মূলত একটা কনসেপ্ট। যে কারণে ট্রাম্প যখন আমেরিকান জাতীয়তাবাদের ধারণ ক্ষমতার চারিপাশে দেয়াল তুলছেন তখন ওই জাতীয়তাবাদ হাঁসফাঁস করছে। তার দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঠিক একই অবস্থা এখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের। বিজেপি বা হিন্দু মহাসভা যখনই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের চারিপাশে ধর্মের দেয়াল তুলছে তখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দম ছাড়তে কষ্ট হচ্ছে। আমাদের এই ভূখণ্ডের (তখন এর নাম ছিল পূর্ব বাংলা) মানুষের অবস্থা এর থেকে খারাপ হয়েছিলো পাকিস্তান সৃষ্টির ভেতর দিয়ে। পূর্ববঙ্গের মানুষের সহজাত একটা সহজিয়া জীবন ছিল, যেখানে বাউল, সুফী সহজে জন্ম নিতো, যেখানে ধর্মের আনন্দ ছিল, উৎসব ছিল, আচরণ ছিল তবে কঠিন কোনও বাধন ছিল না। তখনও এ ভূখণ্ড কোনও জাতি রাষ্ট্র হওয়ার সুযোগ যেমন পায়নি বরং বাংলা হিসাবে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐক্যতানে জোড়া ছিল। একদিকে সূক্ষ্ম ঐক্যতান অন্যদিকে নদী মাতৃক দেশের ভৌগলিক কারণে সহজিয়া আচরণ এই নিয়েই হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা নরগোষ্ঠীকে হঠাৎ করেই পাকিস্তান নামক দেশের অংশ করে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার চেষ্টা হয় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ দিয়ে।

পাকিস্তান সৃষ্টির সময় এই ভূখণ্ডের সাধারণ মুসলিম সমাজ একটা উন্মাদনার মধ্যে ছিল। তারা যতটা না একটা ধর্মীয় রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলো তারা থেকে বেশি তারা স্বপ্ন দেখেছিলো এক সঙ্গে দুটো শোষণ থেকে মুক্তি পাবে। এক. ব্রিটিশের শোষণ, দুই. হিন্দু জমিদার ও জোতদারের শোষণ। তারা মনে করেছিলো ধর্মীয় একতা এখান থেকে তাদেরকে মুক্ত করে অনেক সুন্দর একটা জীবন দেবে। যদিও সেদিন ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ধর্মের সব নিয়মও মানেনি। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বাস্তবে কট্টরও কম ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন হয়, তার পরেও যে কোনও ধর্ম কিন্তু অন্য ধর্মীয় মানুষকে হিংসা করা থেকে বিরত থাকতে বলে। কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনের ভেতর দিয়ে একটা হিংসাও কম বেশি জাগ্রত হয়েছিলো। যদিও সেটা শতভাগ স্পর্শ করেনি এ ভূখণ্ডের সহজিয়া মানুষকে। তারপরেও দেখা গেলো যখনই ধর্মের নামে দুটো ভাগ হতে গেলো তখনই একটা হিংসা, একটা রক্তপাতের সৃষ্টি হলো। এই হিংসা ও রক্তপাত ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষিত তরুণ শ্রেণিকে ধাক্কা দিলো অনেক বেশি। তাদের তরুণ মন এই হিংসা ও রক্তপাতে ব্যথিত শুধু নয়, নতুন খোঁজার একটা তাগিদ বোধ করলো।

উপমহাদেশের যে অংশটি ভারত নামে একটি রাষ্ট্র হলো সেখানকার রাষ্ট্র নায়ক পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এটা উপলব্ধি করতে পেরে ধর্মের নামে দেশ ভাগ হলেও ধর্মকে রাষ্ট্রের থেকে দূরে রাখার পথ নিলেন। পাকিস্তানে কায়েদে আযম মোহম্মাদ আলী জিন্নাহও সেভাবেই রাষ্ট্র গড়তে নেমে পড়লেন। প্রথম ভাষণেই তিনি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানালেন। কিন্তু পূর্ব বাংলার ভৌগলিক পরিবেশে হাজার বছরে যে নরগোষ্ঠী বেড়ে উঠেছে তাদের সহজিয়া চরিত্র সম্পর্কে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত জিন্নাহ’র খুব কোনও ধারণা ছিল বলে মনে হয় না। তাহলে তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন, এই সহজিয়া জনগোষ্ঠীটি তাদের ধর্মকে তাদের মতো করে নিজস্ব ভাষায় শুধু নয়, সেই ভাষার পুঁথি, সঙ্গীত সহ নানান কিছুতে জড়িয়ে নিয়েছে। তাই এর অন্তস্থলভাগে যে স্রোতধারা সেখানে ভাষার জোর অনেক বেশি। এখানে শুধু ধর্মের স্রোত প্রবাহিত করা সম্ভব নয়। জিন্নাহর মতো শিক্ষিত লোকের এই সাধারণ সত্যটুকু বোঝার কথা ছিল। যা হোক তিনি বোঝেননি। তিনি বাংলা ভাষাকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে না চাইলেও বাংলা ভাষার ওপর উর্দুর রাজত্ব বসিয়ে দিতে চাইলেন। জিন্নাহ হয়তো মনে করেছিলেন, বাংলা ভাষার ওপর তো দীর্ঘদিন ফার্সি ভাষা রাজত্ব করেছিলো, একশ সাতানব্বই বছর ইংরেজি ভাষা রাজত্ব করে গেলো- এখন সেখানে উর্দু ভাষা রাজত্ব করবে তাতে ক্ষতি কী? ফার্সি বা ইংরেজি যেমন রাজভাষা ছিল উর্দুও তেমন থাকবে। তাতে বাংলার তো কোনও ক্ষতি হবে না। জিন্নাহর ওই চিন্তা খুব যে শতভাগ অমূলক ছিল তাও নয়। তবে বাদ সাধল ওই তরুণ সম্প্রদায়, যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলো ধর্মের নামে ঠিকই তবে ধর্মের মাধ্যমে সৃষ্ট হিংসাকে, হত্যাকে ধারণ করতে নয়। দেশ সৃষ্টি হতে গিয়ে যে নরহত্যা হয়েছিলো তা শুধু তাদের ব্যথিত ও লজ্জিত করেনি, বরং ওই তরুণদের মনোজগতে একটা ধাক্কা দিয়েছিলো। তারা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলো এই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ তাদেরকে কুপমন্ডুকতার দিকে শুধু নয়, ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। এমনকি কারও কারও উপলব্ধি দেশ সৃষ্টির আগে ততদূর চলে গিয়েছিলো যে না, আর ধর্মের নামে দেশ নয়। বরং আরও উদার কোনও জাতীয়তার নামে দেশ হোক। যে কারণে পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব মুহূর্তে মুসলিম লীগের প্রাজ্ঞদের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, কংগ্রেসের শরৎ বোস সহ অনেকে মিলে ইউনাইটেড বেঙ্গল নামে আলাদা দেশ তৈরির চেষ্টা করেন। যেখানে ধর্মের থেকে নৃতাত্ত্বিক দিকটির গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছিলো।  তাদের সঙ্গে কর্মী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো প্রগতিশীল তরুণরা ছিলেন। তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় ঠিকই তবে তারা পাকিস্তানে প্রবেশ করেন নতুন উপলব্ধি নিয়ে, ধর্মের নামে যে রাষ্ট্র দুটো সৃষ্টি হলো এটা সঠিক হলো না। এর সারা শরীরে রক্ত মাখানো। আর সে রক্ত নিজেদের হাতের ছুরিতেই ঝরেছে। তাই স্বাভাবিকভাবে ধর্মের নামে এই রাষ্ট্রের প্রতি তাদের শতভাগ বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলো রাষ্ট্রটির জন্মের আগেই। এ কারণে জিন্নাহ যখনই উর্দুকে রাজভাষা বললেন, তখন তারা আর ফার্সি বা ইংরেজির কথা মনে করলেন না এ সব তরুণরা। বরং তারা দেখতে পেলেন ধর্মের একটি নতুন ফাঁদ আসছে তাদের গলায়। তারা তুলনা করতে পারলেন সহজেই এই ধর্মের নামে ৪৬ এ যেমন নরহত্যা হয়েছে এবার ধর্মের নামে ভাষা হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু হচ্ছে। তাই আর দেরি না করেই তারা রুখে দাঁড়ালেন।

ভারতবাসীর মনে ধর্ম থাকলেও প্রশাসনে ধর্ম ঢুকতে দেননি জওহরলাল। জিন্নাহও শুরু থেকে সেই চেষ্টা করছিলেন। তার প্রতিটি ভাষণ তা প্রমাণ করে। তারপরেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির প্রশাসনে অনেক খানি ধর্ম ঢুকে গিয়েছিলো। যার ফলে রাজভাষা উর্দু করার বিরুদ্ধে যখনই বাঙালি তরুণরা কথা বললেন, যখনই তারা ১৫০ মোগলটুলিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে এক হতে শুরু করলেন। তখনই তারা এটাকে ধর্মের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে দেখলো। তারা প্রশাসনের ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সেই সমস্যা সমাধানের মন নিয়ে, এটা একটি সমস্যা–একে নরম হাতে সমাধান করতে হবে- এভাবে মোটেই বিষয়টি দেখলেন না। রোদে তাতিয়ে একে শক্ত করলে সেটা ভেঙে যাবে এই চিন্তাটি পাকিস্তানের প্রশাসনের ও তাদের মাথার ওপর বসা কর্তা ব্যক্তিদের মাথায় এলো না। তারা যতই কড়া হয়ে সমস্যাটিকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে রাজপথে আসার সুযোগ দিতে লাগলেন ততই এটা রোদে তেতে কড়া ও শক্ত হতে থাকে। তার ফলে যা হওয়ার তাই হলো ৪৮ এ শেখ মুজিবুর রহমান, কমরেড তোহা সহ একদল তরুণ মিলে দেশের মানুষের সামনে এটা প্রমাণ করে ফেললেন, পূর্ববাংলার মানুষকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্যে উর্দুকে রাজভাষা করা হচ্ছে। মারা যাবে এর ফলে বাংলা ভাষা।

যার নিট ফল দাঁড়ালো– ৪৭ এ ধর্মের নামে যে পাকিস্তান হলো ৪৮ সালে সেই ধর্মের নামের পাকিস্তান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেলো। এ ভূখণ্ডের মানুষ বললো, কোনও রাজভাষা নয়, আমার মাটির ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা বা রাজভাষা করতে হবে। মাটির ভাষা নিয়ে এ দাবি একেবারে স্বাধীন দেশের মানুষের দাবি। এটা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা কোনও দেশের মানুষের দাবি নয় আবার ধর্মের নামে সৃষ্ট কোনও দেশের মানুষের দাবি নয়। নিজ ভূখণ্ডের মাটির ভাষাকে রাজভাষা চায় কেবলমাত্র স্বাধীন ভূখণ্ডের মানুষেরা। তাই কেউ কিছু না দেখতে পেলেও ৪৮ সালে ১৫০ মোগলটুলির একদল তরুণদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীনতার বীজটি মাটিতে লাগানো হয়ে যায়। আর তারপর থেকে ইতিহাস এগিয়ে চলে স্বাধীনতার লক্ষ্যে। আর বীজটি যেহেতু ভাষার নামে বোনা হলো তাই স্বাধীনতার পথটি স্বাভাবিকই তৈরি হয়ে গেলো ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পথে। যার নামকরণ হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। মানুষও দ্রুত গতিতে একে গ্রহণ করতে থাকে। কারণ ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদে যত উগ্রতা থাকুক না কেন, ধর্মীয় জাতীয়তার থেকে এর অনেক বেশি গ্রহণের ক্ষমতা। তাই স্বাধীনতার পথ চলাটিও ভাষার নামে সকলে মিলে অর্থাৎ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শুরু করে।  

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ