কাদেরের অসুস্থতা ও ঘৃণা সংস্কৃতির চর্চা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:৪৩, মার্চ ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, মার্চ ০৫, ২০১৯





আনিস আলমগীরআওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিন মার্চ ২০১৯ যখন এ সংবাদ অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছিলাম– তা পড়তে গিয়ে অনেকেরই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। বিশেষ করে অনলাইন খবরগুলোর নিচে যা খুশি লেখার স্বাধীনতা থাকায় কিছু মানুষ এই অসুস্থতাকে নিয়ে যে অসুস্থ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করেছে– তা আমাদের সমাজের স্বীকৃত প্রথা নয়। আমরা শত্রু মারা গেলেও তার আত্মার শান্তি কামনা করি, না পারলে চুপ থাকি। কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের অসুখে মির্জা ফখরুল ইসলামসহ বিএনপির প্রথম সারির নেতারা হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে যথাযথ সৌজন্যতা দেখাতে পারলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের অনুসারীসহ অনেক বিবেকহীন মানুষ আমাদের সামাজিক ঐতিহ্য ধরে রাখেননি।



যারা ট্রল করেছেন তারা মূলত রাজনীতিকে সামনে এনে ওবায়দুল কাদের এবং আওয়ামী লীগের কিছু নেতার অতীতের কথিত বক্তব্য দিয়ে তাদের আক্রমণ করেছেন। অবশ্য পাল্টা দৃশ্যও দেখা গেছে। দল-মতের ঊর্ধ্বে ওঠে অনেক মানুষ তার রোগমুক্তি কামনা করছেন। অনেকে এই ঘৃণা সংস্কৃতির নিন্দা করেছেন। অনেকে বলেছেন, তারা তাদের ফ্রেন্ডলিস্টে রাখা কিছু লোককে এ জাতীয় নির্মম রসিকতা, বাজে মন্তব্য করার জন্য আনফ্রেন্ড করেছেন বা ব্লক করেছেন।
আমি দীর্ঘদিন ধরে সমাজে ঘৃণার সংস্কৃতি চর্চার সুদূরপ্রসারী প্রভাব মনোযোগ সহকারে খেয়াল করে আসছি। লিখেও আসছি। সোশ্যাল মিডিয়া এটাকে দিন দিন চাঙ্গা করে চলছে। বিশেষ করে উপমহাদেশে। ধর্মান্ধতা তো ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের জন্মলগ্নের সঙ্গী, হালে ক্রিকেট নিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদের চর্চাও এই ঘৃণা সংস্কৃতিকে মাত্রা দিচ্ছে। তার প্রতিফলন ঘটেছে রাজনীতিতে, সমাজ জীবনে। মৃত বা অসুস্থ লোকের অকল্যাণ কামনা করে প্রকাশ্যে কিছু বলা আমাদের সংস্কৃতিতে না থাকলে আমরা নতুন করে তাই দেখছি। এটা কি একদিনে হয়েছে? না। টের পাচ্ছি না যে আমরাও ধীরে ধীরে ঘৃণার সংস্কৃতিতে ডুবে যাচ্ছি। রাষ্ট্রীয়ভাবে না হলেও ঘৃণার সংস্কৃতিকে কেউ কেউ দলীয়ভাবে উৎসাহ দিচ্ছি। এসবই তার ফল।
আমাদের একশ্রেণির লোক কথিত ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধিতার নামে ভারতকে ঘৃণা করা শেখাতে দেখি। এদের মধ্যে মুসলিম মৌলবাদীরা ভারতকে ঘৃণার নামে সুপ্তভাবে হিন্দুদেরও ঘৃণা করাতে শেখাচ্ছে। আবার আরেক শ্রেণি পাকিস্তানকে ঘৃণা করা শেখাতে দেখি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে। এদের মধ্যে আবার কিছু হিন্দু মৌলবাদী তাদের সুপ্ত বাসনা নিয়ে পাকিস্তান বিরোধিতায় অতি উৎসাহী। এই বিরোধিতাকে রাজনৈতিক স্বার্থে আমাদের রাজনীতিবিদরা জিইয়েও রাখেন। কাশ্মির প্রসঙ্গ তুলে কিছু লোক ভারতকে ঘৃণা করা ইমানি দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন আর কিছু লোক পাকিস্তান এবং পাকিস্তানিদের ঘৃণা করাকে প্রগতিশীলতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন।
এই ঘৃণাজীবীদের কেউ কেউ আবার নিজেকে পোপের চেয়ে বড় ক্যাথলিক প্রমাণ করতে চান নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়ে। ভারত এবং আওয়ামী লীগের একান্ত লোক প্রমাণ করতে তারা পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে বলেন। পাকিস্তানকে ঘৃণা করাকে এরা দেশপ্রেম, দেশের প্রতি আনুগত্যের ব্যারোমিটারও বানাচ্ছেন। অন্য গোষ্ঠী ভারতের যোগ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে পাকিস্তানকে দাঁড় করাতে গিয়ে নিজের জন্মপরিচয় ভুলে যান। দু’পক্ষ এসব করছে স্ব-স্ব পরিমণ্ডলে চেতনা বিক্রির নামে ধান্ধা করার সুবিধার জন্য অথবা স্রেফ মানসিক বৈকল্য থেকে।
আশঙ্কার বিষয়, মেরুদণ্ডহীন, সুবিধাবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত এসব বিপ্লবীরা এই ঘৃণা সংস্কৃতিকে নিজের আইডেনটিটি হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে এখন। তাদের কেউ নিজেকে ভারতবিরোধী বা ভারতের দোসর নয়– ঘটা করে প্রচার করতে চায়। যেন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাদ দিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে মহান কিছু অর্জন করবে বাংলাদেশ। অথবা ওই গোষ্ঠীর শীর্ষনেতা খালেদা জিয়া বা বিএনপি-জামায়াত সরকারে গেলে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কই রাখবে না।
ঘৃণাজীবীদের আরেক দল ‘পাকিস্তানের সবকিছুকে ঘৃণা করি’ বলে নিজেকে সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী প্রমাণেও মরিয়া। কেউ তার প্রতিবাদ করলে রাজাকারের বংশ বলে ট্যাগ দিয়ে দেবে। যেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রধান হয়ে পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে বলে গেছেন। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়াননি। তাদের জন্য বলতে হচ্ছে, ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশ সফর করবেন এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সহায়তা করতে অতীতের ভুলগুলো ক্ষমা করার ও ভুলে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। একইভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও ’৭১ সালে বাংলাদেশে যে হত্যাযজ্ঞ, লুণ্ঠন হয়েছে তা ভুলে জনগণকে নতুন করে যাত্রা শুরু করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণকে দেখাতে হবে তারা ক্ষমা করে দিতে জানে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে বলেননি, এখনও বলছেন না। বরং প্রথম দফা প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার সময় দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি দিল্লি ও ইসলামাবাদ সফর করেন। তিনি উপমহাদেশে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করতে গিয়ে পাক-ভারতের তিক্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছেন। এটা ঠিক যে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে বাংলাদেশ যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে তার মর্যাদা তারা দিতে পারেনি। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু ইস্যুতে নাক গলিয়ে, জঙ্গি মদতের চেষ্টা করে সম্পর্কে তিক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলেছে পাকিস্তান। তার যথাযথ ওষুধও বর্তমান সরকার কূটনৈতিকভাবে দিচ্ছে। এর জন্য ঘৃণার সংস্কৃতি বিস্তারের প্রয়োজন নেই। ভারত-পাকিস্তান বা তৃতীয় কোনও দেশের সঙ্গে আমাদের যা কিছু হবে কূটনৈতিকভাবেই তার সমাধান করতে হবে। সম্পর্কের উত্থান পতনও স্বাভাবিক হিসেবে নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ঘৃণা কোনও অবস্থায় সুস্থতার লক্ষণ নয়। দেখা গেছে, পাকিস্তান রাষ্ট্র তার শিশুকে জন্ম থেকেই ভারতকে ঘৃণা করা শিখিয়েছে। আমি পাকিস্তানের রাস্তায় পাকিস্তানি জঙ্গি-যোদ্ধা ভারতীয়দের কামান দিয়ে মারছে এমন পোস্টার বিক্রি হতে দেখেছি। তারা ঘৃণাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চর্চা করেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কেও তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের শিখিয়েছে– বাংলাদেশের লোকেরা গাদ্দার, হিন্দুস্থানিরা তাদের সঙ্গে মিশে পাকিস্তানকে ভাগ করেছে। আর পূর্ব পাকিস্তানের লোক গরিব এবং পাকিস্তানের জন্য বোঝা। ঘৃণার সংস্কৃতি লালন করতে করতে কিন্তু পাকিস্তান মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়েছে বাংলাদেশকে। সে ঘৃণার আগুনে পুড়ে ওরা আজ বিশ্বদরবারে নিজেরাই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমাদের বলার কিছু নেই।






তবে দেরিতে হলেও পাকিস্তানিরা নিজেদের ভুল একটু করে এখন উপলব্ধি করেছে। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রশংসা করে সাধারণ পাকিস্তানিরা নয় শুধু, রাষ্ট্রের কর্তারাও বলছেন যে তারা ভুল করেছেন। এতদিন বাংলাদেশকে নিয়ে ভুলের মধ্যে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধি পাকিস্তানে সাধারণ জনগণের মধ্যে বাংলাদেশকে নিয়ে একটি পজেটিভ ধারণার জন্ম দিচ্ছে, বিশেষ করে ইমরান খানের সরকার আমলে। যদিও দু’ দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক আগের মতোই খারাপ চলছে।
ইউটিউবসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে পাকিস্তানি তরুণ প্রজন্মের ভাবনাগুলো দেখলে আপনিও উপলব্ধি করবেন তারা পূর্ব প্রজন্মের অপকর্মের দায়িত্ব নিতে চায় না। তারাও বাংলাদেশের কল্যাণ এবং অগ্রগতি কামনা করে। কেউ কেউ বাংলাদেশকে হারানোর জন্য দুঃখ করে আবার এক হওয়ার খায়েশ ব্যক্ত করলেও সিংহভাগই দু-দেশের সুন্দর সহ-অবস্থান কামনা করে।
পাকিস্তানের শিক্ষিত তরুণ সমাজের একাংশের মধ্যে যখন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ছে তখন দুঃখজনক হলে সত্য যে ভারতে নরেন্দ্র মোদির আমলে পাকিস্তানকে, এমনকি বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশীকেও ঘৃণা করার সংস্কৃতির চর্চা বেড়েছে। পাকিস্তান-বাংলাদেশে যেমন অতি উগ্রবাদী মুসলমানরা জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিচ্ছে, ভারতের অতি উগ্রবাদী হিন্দুরা বিজেপিতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ উত্তেজনায় ভারতীয় মিডিয়ায় চোখ রাখলেও তার প্রমাণ মিলবে। ভারতের বিমান সেনা অভিনন্দন পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়লে সে দেশের তরুণ সমাজ মানববন্ধন করে সরকারের কাছে দাবি জানায় যেন তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। একটু চিন্তা করে দেখেন–ভারতে যদি পাকিস্তানি পাইলট ধরা পড়তো এবং ভারতীয় তরুণরা পাকিস্তানি বিমান সেনাকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি করছে–তাদের কী অবস্থা হতো। তাদের দেশদ্রোহী বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হেনস্তা করা হতো আর মূলধারার মিডিয়া তাদের জীবনযাপন হারাম করে দিতো। এবার যেসব ভারতীয় পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ চাই না বলে স্বর উঁচু করেছে বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের ভারতীয় মিডিয়া রীতিমত দেশদ্রোহী বানিয়ে ছেড়েছে।
ভারত-পাকিস্তানকে ঘৃণা করার মতোই আমাদের রাজনীতির দুই শিবিরে বিভক্ত মতলবি অথবা নির্বোধ লোকগুলো এখন জোরেশোরে একে অপরকে ঘৃণা করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গ্রেনেড মেরে একযোগে শেষ করে দেওয়া, সন্তানের মৃত্যুতে শোক জানাতে যাওয়া ভিন্ন শিবিরের লোকদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার সময় হয়তো এই ঘৃণার সংস্কৃতি চর্চার কুফল অনেকে টের পাননি। ওবায়দুল কাদেরের অসুস্থতায় সেটা সবার চোখে ধরা পড়েছে বড় করে। এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে যে যত হেয় করতে পারবে, যত আঘাত দিতে পারবে, যত ঘৃণা করবে- নিজস্ব রাজনৈতিক শিবিরে তার তত উত্থান হবে।
অথচ আমাদের সব ধরনের ঘৃণার সংস্কৃতি বন্ধ করা দরকার। ঘৃণা নয়, ভালোবাসার হাত বাড়াতে হবে সব প্রতিবেশীর প্রতি। হিংসা-ঘৃণা নয়, স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গেও। সেটি করতে হবে আমাদের প্রতিবেশী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের স্বার্থে নয়- জাতি হিসেবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার স্বার্থে, নিজেদের সুস্থ রাখার স্বার্থে।

লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ