এই দেশের সড়কে কে নিরাপদ?

Send
বিনয় দত্ত
প্রকাশিত : ১৩:৪৮, এপ্রিল ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৬, এপ্রিল ০৮, ২০১৯

বিনয় দত্ততারেক মাসুদ থেকে আবরার, ছোট রাস্তা থেকে মহাসড়ক, রিকশাযাত্রী থেকে বাসযাত্রী, কেউ কোথাও নিরাপদ নয়। নিরাপত্তা শব্দটিই এখন কোথাও নেই, অন্তত সড়কে নেই। এই কথাটি বলার জন্য কোনও বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। একজন সাধারণ মানুষই বলতে পারেন, আমাদের সড়কে কোনও ধরনের নিরাপত্তা নেই।
বছরের পর বছর একটি ফুটফুটে বাচ্চাকে মানুষ করে তুলতে একজন অভিভাবকের কী পরিমাণ অমানুষিক পরিশ্রম, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ জড়িত, তা আমরা জানি। সেই বাচ্চা বা তরুণ যখন রাস্তায় নামছে তখন তাকে আমরা নিরাপত্তা দিতে পারছি না। প্রতিবার একজন মায়ের কোল খালি করছি আর বলছি ‘আমরা লজ্জিত’। সত্যিই ধিক আমাদের নিজেকে। ধিক আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সবাইকে।
এই দেশের সড়কে কে নিরাপদ? যার ব্যক্তিগত গাড়ি আছে তিনি? নাকি গণপরিবহনের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে গাড়ি ভাড়া করে সামর্থ্য আছে তিনি? এদের কেউ না কেউ, কখনও না কখনও রাস্তায় নামবেন তখন একটি যন্ত্রমানব খেকো বাস এসে তার জীবনটা কেড়ে নেবে না, এই নিশ্চয়তা কে দেবে?

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ৫৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। মৃত্যুর সংখ্যা শুনতে শুনতে আমাদের চোখ, কান, শরীর সয়ে গেছে। সয়ে গেছে আমাদের গোটা ইন্দ্রিয়। এই ৭২২১ জনকে একসঙ্গে করে যদি দেখেন তাহলে বুঝবেন সংখ্যাটা আসলে কত বড়, কত বিশাল। কতটা অসহায় আমরা এই সড়ক-মহাসড়কের কাছে, তা দুর্ঘটনার এক তথ্যতে স্পষ্ট।

আবরার আহমেদ চৌধুরী। বিশ বছর বয়সী মেধাবী তরুণ। এই তরুণের আমাদের দেশকে অনেক কিছুই দেওয়ার কথা ছিল, ছিল দেশের একজন হয়ে সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার কথা, ছিল বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই তরুণকে একজন বাসচালকের হাতে প্রাণ দিতে হলো। সিরাজুল ইসলামের যে চালক তরুণ আবরারের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে তার বয়স ২৯। যার প্রাণ গেলো আর যে প্রাণ নিলো দুইজনের বয়স ‘দুই’য়ের ঘরে। দুর্ভাগ্য একজন জীবিত, একজন মৃত। গণমাধ্যমে দেখেছি ওই বাসের চালক সিরাজুল ওইদিনই একজন নারীকে ধাক্কা মারে। তার গাড়ি চালানো কেমন হতে পারে তা আর নতুন করে কাউকে বলতে হবে না।

২.

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর চলবে না। রাজধানী থেকে ২০ বছরের পুরনো সব বাস তুলে দেওয়া হবে। তার দুই বছর পর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রিত্ব নেওয়ার এক বছর পরে তিনি ফিটনেসবিহীন যানবাহন তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেন। তা আর কার্যকর হলো না।

দীর্ঘ আট বছর ধরে দেশবাসী শুধু ঘোষণাই শুনলো। এইসব ঘোষণা আর বাস্তবায়িত হলো না। ফিটনেসবিহীন গাড়ি যে সড়কে বীরদর্পে চলেছে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্কুল-কলেজের ছোট ছেলেমেয়েরা। নড়বড়ে-ভাঙাচোরা বাস, লাইসেন্সবিহীন চালক, নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতা  সবই যেন একের পর এক লাইনে সাজানো। মন্ত্রী, পুলিশ বা সরকারি গাড়ির চালকও যে ‘ফিটনেসবিহীন’ তা গতবারই নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আবিষ্কার করেছিল। গোটা যোগাযোগ খাতটি কতটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে চলছে তার নমুনা পাওয়া যায় এতে।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) সাময়িক হিসাবে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা এ যাবৎকালের রেকর্ড। বাংলাদেশে এর আগে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মাথাপিছু আয়ও বাড়বে। মাথাপিছু বার্ষিক আয় বেড়ে দাঁড়াবে এক হাজার ৯০৯ ডলার।

আবার ২০১৭ সালের আগস্টে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণার তথ্যমতে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে আমাদের জিডিপি যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় মেধাবী প্রাণ হারাতে হারাতে আমাদের জিডিপি কমছে।

৩.

যদি চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো বন্ধ না হয়, যদি গোটা পরিবহন খাতকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, যদি পরিবহন মালিকদের কারণে সরকারি দ্বিতল বাস বন্ধ থাকে, যদি পরিবহন মালিকদের কারণে নৌপথ এবং রেলপথকে অব্যবস্থাপনায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়, যদি ছোট থেকে শুরু করে মহাসড়কের চালকদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা না যায়, যদি গোটা পরিবহন খাতকে ঢেলে সাজিয়ে বৃহৎ পরিকল্পনা করা না যায় এবং সর্বোপরি যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি না হয় তবে কখনও সড়কে শান্তি এবং স্বস্তি ফিরবে না।

কখনও আমার সন্তান, কখনও আপনার সন্তান বা কখনও আমি সড়কেই মারা যাবো। কখনও আমার মায়ের বুক খালি হবে, কখনও আপনার মায়ের বুক খালি হবে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে নেমে শিক্ষার্থীদের গলা ফাটানো বিক্ষোভ দেখেই বোঝা যায় তারা আমাদের প্রশাসনের ওপর কতটা বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ। যেখানে স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের আমরা সন্তুষ্ট করতে পারছি না, তাদের একটা দাবি আমরা পূরণ করতে পারছি না, সেখানে তারা কীসের আশায় আমাদের ওপর ভরসা করবে? কেন ভরসা করবে?

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ