দিল্লির মসনদ কার দখলে যাচ্ছে?

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:২৩, এপ্রিল ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩১, এপ্রিল ০৯, ২০১৯

আনিস আলমগীরভারতের লোকসভা নির্বাচনের ঘণ্টা গণনা শুরু হয়ে গেছে। তার আগেই প্রায় প্রতিদিন বেরুচ্ছে কোনও না কোনও মিডিয়ার জনমত জরিপ। তার কোনোটাতে বিজেপি জোট আবার কোনোটাতে কংগ্রেস জোটকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৯ থেকে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। লোকসভার ভোট হবে সাত পর্বে– এপ্রিল এবং মে মাসজুড়ে। ফল জানা যাবে ২৩ মে। ভোটারসংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি। ভারতীয় লোকসভার আসন ৫৪৫টি হলেও সরাসরি ভোট হয় ৫৪৩টি আসনে। বাকি ২টি আসনে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের থেকে ২ জনকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি মাখনে ছুরি চালিয়ে ছিলেন কিন্তু ২০১৯ সালের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন মাখনে ছুরি চালানোর মতো আর সহজ মনে হচ্ছে না। খুবই কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়েছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ গং। আঞ্চলিক দলগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সর্বত্র। নরেন্দ্র মোদির বিজেপির সঙ্গে আছে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা, বিহারের নিতিশের জনতা দল এবং রাম বিলাস পাশওয়ানের লোকশক্তি, তামিলনাড়ুতে প্রয়াত জয়ললিতার আন্না-ডিএমকে, পাঞ্জাবে আকালী দল, আসামে অসম গণপরিষদ।

আর রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসের সঙ্গে আছে মহারাষ্ট্রের শরৎ পাওয়ারের কংগ্রেস, বিহারে লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল, তামিলনাড়ুতে প্রয়াত করুণানীধির ডিএমকে, কেরালায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ এবং দিল্লি ও হরিয়ানায় কেজরিওয়ালের আম আদমী পার্টি।

আবার যে রাজ্যটি কেন্দ্রের ক্ষমতা নির্ধারণ করে সেই উত্তর প্রদেশে মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি, অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি আর প্রয়াত চৌধুরী চরণ সিং-এর লোকদল জোটবদ্ধ হয়েছে। প্রয়াত চৌধুরী চরণ সিং, মোলায়েম সিং যাদব, অখিলেশ যাদব আর মায়াবতী উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সবারই শক্ত ভিত্তি রয়েছে। উত্তর প্রদেশে লোকসভার আসন ৮০টি। জোট সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা রাহুল গান্ধীর আসন আমেথি ও সোনিয়া গান্ধীর আসন রায়বেরিলিতে কোনও প্রার্থী দেবে না। শেষদিকে এসে অবশ্য রাহুলের আসনে প্রার্থী দিয়েছেন মায়াবতীর দল। চৌধুরী চরণ সিং-এর লোকদলকে ছেড়েছে ৩টি আসন। এ চারটি আসন বাদে ৭৬টি আসনের মায়াবতী আর অখিলেশ সমান ভাগাভাগি করেছেন।

মায়াবতীর ২২ শতাংশ হরিজন, অখিলেশের ২৩ শতাংশ অনগ্রসর ও মুসলমান আর পশ্চিম উত্তর প্রদেশে চৌধুরী চরণ সিং-এর লোকদল- সব মিলিয়ে উত্তর প্রদেশে বিজেপির খুব ভালো অবস্থা হওয়ার কথা নয়। বিজেপি আর কংগ্রেসের ভোটার হচ্ছে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা। সে ভোট উভয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হবে। সুতরাং বিজেপি ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে যে ৭২ আসন উত্তর প্রদেশে পেয়েছিলো তা সপ্তদশ লোকসভায় পাবে বলে মনে হচ্ছে না।

একটা উদাহরণ দিলে বুঝা যাবে। ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিম উত্তর প্রদেশের বাগপত কেন্দ্রে বাগপতের ভূমিপুত্র সত্যপাল সিং বিজেপির টিকিট নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪ লাখ ভোটে জিতেছিলেন। আর তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে লোকদলের অজিত সিং পেয়েছিলেন দুই লাখ বিশ হাজার ভোট। সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী গোলাম মুহাম্মদ পেয়েছিলেন এক লাখ আশি হাজার ভোট আর বহুজন সমাজ পার্টির প্রার্থী প্রশান্ত চৌধুরী পেয়েছিলেন দেড় লাখ ভোট। এবারের নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি, লোকদল, বহুজন সমাজ পার্টি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সুতরাং ভোট ভাগাভাগি কমবে।

নরেন্দ্র মোদিও সফল কোনও প্রধানমন্ত্রী নন, তার পড়ন্ত বেলা। একমাত্র সম্পদ মুসলিম বিদ্বেষ আর হিন্দুত্ববাদ। বিজেপি এবারও নির্বাচনি ইশতেহারে বলছে ক্ষমতায় গেলে আসামের মতো অন্য রাজ্যেও নাগরিকত্ব সংশোধন বিল বা এনআরসি কার্যকর করা হবে। যতদ্রুত সম্ভব অযোধ্যায় বিতর্কিত জমিতে তৈরি হবে রাম মন্দির। বাতিল করা হবে কাশ্মিরকে বিশেষ মর্যাদা আইনও। ইশতেহারে এনআরসি কার্যকর করার কথা বলেছে মূলত পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মৌলবাদীদের ভোট পাওয়ার আশায়। সেখানে দীর্ঘদিন থেকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বাংলাদেশি মুসলমানদের অনুপ্রবেশের।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছিলো হিন্দি বলয়ে। হিন্দি বলয়ের উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়ে বিজেপি প্রতিযোগিতায় পড়ে গেছে এবং এবার হিন্দি বলয়ে কোনোভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে না। দক্ষিণ ভারতের গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, উড়িষ্যা ও বাংলা- এ ছয় রাজ্যের ১৯১টি আসনের মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিলো মাত্র ২১টি আসন।

ভারতীয় এক কলামিস্ট বন্ধু লিখেছেন হিন্দি বলয়ে মোদির নামে নাকি তুফান বইছে। মোদি নাকি পালওয়ামার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জাতীয়তাবাদকে তুঙ্গে তুলতে পেরেছেন। গত কয়দিন আগে ভারতের রেলওয়েতে ৬০ হাজার নিম্নমানের চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তাতে দরখাস্ত পড়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ। মধ্যমানের একটা দেশের লোকসংখ্যার সমান। আর দরখাস্তকারীদের মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী লোকও নাকি রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রতিবছর দুই কোটি বেকারের চাকরির সংস্থান করবেন। এক্ষেত্রে মোদির ব্যর্থতা ঐতিহাসিক। এমনভাবে ব্যর্থ হয়েছেন যে বেকার পরিসংখ্যান অধিদফতর পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছেন।

কৃষকের হাহাকার তো গগনচুম্বী। গত দেড় বছরে পাঁচ শতাধিক কৃষক জীবনযাপনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলে এক লাখ কৃষক এসেছিলো মুম্বাইতে। ৩০ হাজার কৃষক এসেছিলো দিল্লিতে। মোদি আর অমিত শাহ চেষ্টা করেছিলেন উত্তর প্রদেশ থেকে আসা কৃষকদের পথ রোধ করে দিল্লি আসা বন্ধ করতে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। এত ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে একটা দল নির্বাচনে সফল হয় কীভাবে! পাকিস্তানের সঙ্গে রণে বিজয়ের সাম্প্রতিক ধুয়া তুলে?

গত দু’মাস আগে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের বিধানসভার নির্বাচন হয়েছে। তিন রাজ্যেই বিজেপি ক্ষমতাসীন ছিলো। তিন রাজ্যেই বিজেপি কংগ্রসের কাছে পরাজিত হয়েছে। রাহুল বলেছিলেন কংগ্রেস জিতলে তারা কৃষি ঋণ মওকুফ করে দেবেন। সরকার গঠন করে কংগ্রেস তাই করেছে। বিধানসভার নির্বাচন দিয়ে লোকসভার ফলাফল নির্ধারণ করা কঠিন। আমি একটা বিষয়ে লক্ষ করেছি, ভারতীয় ভোটাররা কোনও সরকারের ওপর আস্থা হারালে তারা লোকসভার উপনির্বাচনে ওই সরকারদলীয় প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেন না।

দুই বছর আগে উত্তর প্রদেশ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হয়েছে, আর বিজেপি বিপুল ভোটে জিতে রাজ্য সরকার গঠন করেছে। অথচ দুই মাসের মাথায় গোরকপুরে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ও উপ-মুখ্যমন্ত্রী তাদের ছেড়ে দেওয়া লোকসভা আসনে যখন বিজেপি প্রার্থী লোকসভার উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলো, বিজেপি প্রার্থী লোকদল ও বহুজন সমাজ পার্টির প্রার্থীর হাতে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছিলো। এর মধ্যে পালওয়ামার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একযোগে সরকার ও দেশীয় মিডিয়া মিলে জাতীয়তাবাদের যে হাওয়া তুঙ্গে তুলেছে- সেটি ছাড়া তো মোদির ইমেজে নতুন কোনও সংযোজন নেই।

কিছু জনমত জরিপকারী সংস্থা বলছে মোদি পুনরায় ক্ষমতাসীন হচ্ছেন। ভারতীয় কিছু প্রবীণ কলামিস্টও একই মত পোষণ করছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের টিভি ‘টাইমস নাও’ তাদের দ্বিতীয় জরিপ প্রকাশ করেছে ৮ এপ্রিল। এই জরিপেও দেখাচ্ছে বিজেপি জোট ২৭৮ আসন পেতে যাচ্ছে। বিজেপি নিজেরা একটা সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আরএসএসের হেড কোয়ার্টার হচ্ছে নাগপুর। নাগপুর টাইমস খোলামেলাভাবে বলেছে বিজেপির প্রতিবেদন তাদের হস্তগত হয়েছে এবং তা তারা ছাপিয়ে দিয়েছে। নাগপুর টাইমস বিজেপির নিজস্ব সমীক্ষা উল্লেখ করে যে প্রতিবেদন ছাপিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ম্যাজিক ফিগার ২৭২ থেকে অনেক দূরে থমকে যেতে পারে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)। তারা পেতে পারে ১৮২ আসন।

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) পেতে পারে ২১৬ আসন। অন্যরা পেতে পারে ১৪৪ আসন। বিজেপির নিজস্ব সমীক্ষা নামে পরিচিত এ প্রতিবেদনে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, বিজেপি এবার এককভাবে পেতে পারে ১৫১টি আসন, আর তার শরিকরা পেতে পারে ৩১টি আসন। অর্থাৎ এনডিএ জোটের আসনসংখ্যা হবে ১৮২টি। অন্যদিকে কংগ্রেস এককভাবে এ নির্বাচনে পেতে পারে ১৪১ আসন আর তার শরিকরা পেতে পারে ৭৫টি আসন। অর্থাৎ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ পাবে ২১৬ আসন।

এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি ও রাষ্ট্রীয় লোকদল ৪৫ আসন পেতে পারে। পশ্চিম বঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নাকি ৩৬ আসন পেতে পারে। অন্ধ্র প্রদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে আঞ্চলিক দল ওয়াইএসআর কংগ্রেস ১৯ আসন পাবে। তেলেঙ্গানায় চন্দ্র শেখর রাও-এর তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি নাকি ১৪ আসন পেতে পারে।

এ পর্যন্ত হাতে যেসব তথ্য উপাত্ত এসেছে তাতে দেখছি, ভারতের সতেরতম লোকসভা নির্বাচনে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হবে। আঞ্চলিক দলগুলোই হবে ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। রাহুল প্রধানমন্ত্রী না হলেও হয়ত মন্ত্রিসভা গঠনে কংগ্রেস মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। বিজেপি নিজস্ব সমীক্ষা নামে পরিচিত নাগপুর টাইমসের প্রতিবেদন মতে বিজেপির পক্ষে সরকার গঠন খুবই সহজ হবে না। তারপরও ভোটের খেলার শেষ দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা তো করতেই হয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X