শপথের পথটা যে কণ্টকাকীর্ণ

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:৪২, মে ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৩, মে ০৫, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনপূর্বে অনুমিত এবং ইতিবাচক পথেই এগিয়ে গেলেন বিএনপি মনোনীত পাঁচ এমপি। সরকারি দল ও তাদের জোটসহ অনেকেই এমপিদের শপথগ্রহণকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। একইসঙ্গে বেশকিছু প্রশ্নেরও জন্ম হয়েছে এরই মধ্যে। ২৭ থেকে ২৯ এপ্রিল মাত্র দেড়-দুই দিনে কী এমন ঘটে গেলো যে বিএনপি’র সর্বোচ্চ পদাধিকারীকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হলো? এমনভাবেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো, যখন স্থায়ী কমিটিও জানতে পারলো না আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। আবার মির্জা ফখরুল ইসলামকেও কোন কারণে শপথ নিতে নিষেধ করা হলো তাও রহস্যাবৃতই রয়ে গেলো। (মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন যে সিদ্ধান্তে এমপিরা শপথ নিয়েছেন একইরকম সিদ্ধান্তেই তিনিও শপথ নেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন।)
শপথগ্রহণের পর বিএনপি থেকে বলা হচ্ছে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন স্থায়ী কমিটির কাছ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুমতি নিয়েছেন। তার মানে দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ার ইঙ্গিত তিনি তখনই দিয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তারপরও কেন শপথগ্রহণকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। জাহিদুর রহমানকে যখন শোকজ করা হয় তখনও কি তারেক রহমান জানতেন না? স্পষ্ট প্রমাণ হয়, স্থায়ী কমিটি ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের মধ্যে দূরত্ব আছে। কিংবা মতবিরোধও থাকতে পারে।
২৭ তারিখ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন শপথ নেওয়া এমপির সদস্য পদ বাতিলের কোনও আইনি সুযোগ আছে কিনা সেটা বের করার জন্য। জাহিদুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছিল তার দুই ঠিকানায়। সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ১২/১/খ ধারা অনুযায়ী স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেওয়ার বিষয়েও কাজ শুরু হয়েছিল। সবই প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ হলো। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা হয়তো তখনও ভাবতে পারেননি তাদের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটি ‘ওহি নাজিল’ হতে যাচ্ছে। আর সে কারণেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের বিষয়ে গণমাধ্যমে তখন কিছুই প্রকাশ করা হয়নি।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, হাফিজউদ্দিন বীরবিক্রম, আমির খসরু মাহমুদের মতো প্রবীণ রাজনীতিবিদরা যখন সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন  তখন বিএনপিই শুধু নয়, সর্বসাধারণের কাছে অতি উঁচুমাপের বলে গণ্য হয়। সেক্ষেত্রে তাদের গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ক্ষমতা প্রয়োগ করলেও এই প্রবীণ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে পরামর্শের বিষয়টি সৌজন্যতা হিসেবে কাম্য। কিন্তু পাঁচ এমপি শপথ নেওয়ার পর সিনিয়র নেতাদের ভাষ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে কথা বললেও স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতাদের উপেক্ষা করেছেন। গঠনতান্ত্রিক কারণে হয়তো সিনিয়র নেতারা সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু প্রকারান্তরে তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ আছে তাও কিন্তু বোঝা যায়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজউদ্দিন (অব.) বীরবিক্রম টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইনি বিধান অনুযায়ী নির্দেশনা এসেছে, সুতরাং এ নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু যে বিধান বলে এই নির্দেশনা এসেছে সেটি নিয়ে কথা হতে পারে।

গণমাধ্যমে অন্য সিনিয়র নেতাদের মন্তব্যও ছিল অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ এবং তাদের বডি লেঙ্গুয়েজ ছিল হতাশাজনক। রাজনীতিতে পোড় খাওয়া এই নেতারা আগে থেকেই জানতেন, তাদের গঠনতন্ত্রে এমন বিধান সংযোজিত আছে,এবং এটা দলের জন্মলগ্ন থেকেই। আজকে যখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এই বিধানটি কার্যকর করলেন, তখনই তাদের বলতে শোনা যাচ্ছে, এই বিধান নিয়ে কথা হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা এতদিন পর্যন্ত তাদের দলীয় ফোরামে এই বিধান নিয়ে কি কিছু বলেছেন? বাস্তবতা হচ্ছে, জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া সর্বশেষ তারেক রহমান চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালনকালে কেউই টুঁ শব্দটি করেননি। তবে লক্ষণীয় জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া যখন এই বিধানটি ব্যবহার করেছেন তখন তাদের মুখ থেকে কোনও শব্দ বের না হলেও এখন হতে শুরু করেছে।

তারপরও ইতোমধ্যে আলোচনা হতে শুরু করেছে, এই সিনিয়র নেতারা এত বড় অপমান হওয়ার পরও কীভাবে নিজ নিজ পদ ধরে রেখেছেন? এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না নির্বাচিত এমপিদের শপথ নিয়ে শুরু থেকেই এক ধরনের খেলায় মেতে উঠেছিলেন তারা। বেঈমান, গণশত্রু থেকে শুরু করে হেন বিশেষণ নেই যা সম্ভাব্য শপথগ্রহণকারীদের জন্য বর্ষিত হয়নি। সবই হয়েছে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে। আর সেই বেঈমান কিংবা গণশত্রু হওয়াটাই আজকে বাস্তবে রূপান্তর হলো।

একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে দলের ভেতরে দুই ধারার নেতাদের সহাবস্থান হয় কী করে? প্রশ্ন আসতেই পারে। এমনও বলা হচ্ছে, অপমানিত নেতাদের উচিত এই মুহূর্তে নিজেদের সম্মানের দিকে তাকিয়ে পদত্যাগ করা।

একইসঙ্গে আলোচনায় আসছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে জবাবদিহিতার বিষয়টি। হাজার হাজার কর্মী কারাগারে এবং কয়েক লাখ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে বিএনপি থেকে বলা হয়। এই নেতাকর্মীরা আন্দোলন করেছে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনায়। তাদের দাবি ছিল সংসদ নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচন দিতে হবে। তাদের সামনে দাবি ছিল, এমপিরা যাতে শপথগ্রহণ না করেন। শুধু তাই নয়, এর আগে বাংলাদেশের ৮টি বিভাগে ৪৯২টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের পথও বন্ধ করে দিয়েছে আন্দোলনের অংশ হিসেবে। উপজেলা নির্বাচনে প্রায় হাজারখানেক নেতাকর্মী নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। যদি তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান মিলে ৪/৫শ’ জন নির্বাচিত হতে পারতেন। এই নেতারা এখন দেখছেন, পাঁচজন এমপি শপথ নিয়ে সংসদে যাচ্ছেন। আর তাদের রাজনৈতিক বলি হতে হলো কেন্দ্রীয় নির্দেশনায়। প্রশ্ন  আসতেই পারে তৃণমূলের এই নেতাদের দলের প্রতি আনুগত্য কতটা থাকবে। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অবস্থানগত কারণে রাখঢাক করে কথা বলছেন। তারা কি সেরকম রাখঢাক করবেন? তাদের আস্থাহীনতা কি আরও বৃদ্ধি পাবে না?

বিএনপির এমপি হারুনুর রশিদ শপথ নেওয়ার পরপরই বললেন, তিনি বিএনপির মুখপাত্র। তার মানে তিনি প্রকারান্তরে বলে দিলেন, ফখরুল ইসলাম নয়, তিনিই হলেন বিএনপি সংসদীয় দলের নেতা। আর ৩০ এপ্রিল মির্জা ফখরুল ইসলাম এর নির্বাচনী আসন যখন স্পিকার শূন্য ঘোষণা করেন তখন মনে হতেই পারে, মির্জা ফখরুল ইসলামও তাদের দলীয় খেলার গুটিতে পরিণত হয়েছেন।

তাহলে কি এতদিন যা গুঞ্জন হিসেবে শোনা গিয়েছে, সেটাই সত্য হতে যাচ্ছে? গুঞ্জন ছিল- তারেক রহমান চান মির্জা ফখরুল ইসলামকে একটা সীমানায় আবদ্ধ করে রাখতে। যেমনি বছরের পর বছর তিনি তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বানিয়ে রেখেছিলেন। মঙ্গলবার যখন মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, পাঁচ এমপি দলীয় সিদ্ধান্তেই শপথ নিয়েছেন এবং তিনিও শপথ নিতে বিরত আছেন দলীয় সিদ্ধান্তেই। অথচ স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম হয়তো শিগগিরই শপথ নেবেন। বাস্তবতা হচ্ছে, শপথ না নেওয়ায় তার আসনই শূন্য হয়ে যায়। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যখন এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানেন না, তাই ধরে নিতে হবে এটিও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনেরই সিদ্ধান্ত। সঙ্গত কারণেই দ্বৈত আচরণের বিষয়টিও স্পষ্ট। আর প্রশ্নও দেখা দেয়, তাহলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন কি সত্যি মির্জা ফখরুল ইসলামকে তার ইচ্ছার সীমানায় আটকে রাখতে চাইছেন?

শপথ নেওয়াটা ঠিক হয়নি এমনটা বলার কোনও উদ্দেশ্য নেই। অবশ্যই শপথ নেওয়াটা যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পদ্ধতি নিয়ে এবং গণতান্ত্রিক একটা দলের অভ্যন্তরে আস্থা-অনাস্থার বিষয়টি। এমন অবস্থায় বিএনপি থেকে নির্বাচিত পাঁচ সংসদ সদস্য কি সংসদে তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ভূমিকা পালন করতে পারবেন? তৃণমূলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বঞ্চিত রেখে পাঁচজন সংসদ সদস্য কতটাইবা সফল হবেন তাদের দাবি পূরণের ক্ষেত্রে?

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ