ভারতের সংহতি রক্ষায় মমতাকে প্রয়োজন

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:০২, জুন ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৪, জুন ২০, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীমমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াকু নেত্রী। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস আর ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করে ক্ষমতায় এসেছেন। একবার মেয়াদ শেষ করে দ্বিতীয়বারও বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে রাজ্যে সরকার গঠন করেছেন। দ্বিতীয় দফার দুই বছরের মাথায় সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের সম্মুখীন হতে হলো তাকে। লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের আসনসংখ্যা ৪৩টি। এর আগের লোকসভা নির্বাচনে তার দলের আসনসংখ্যা ছিল ৩৪টি, এবার কিন্তু তার আসনসংখ্যা কমে গেছে। তৃণমূল এবার পেয়েছে ২২টি আসন, ১২টি আসন হারিয়েছে বিজেপির কাছে।
বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হলেও পশ্চিম বাংলায় নবীন দল। এবার তারা আসন পেয়েছে ১৮টি। আগেরবারের একটি আসন থেকে এবার ১৮টি আসন পাওয়া চমৎকার উন্নতি। তৃণমূলের দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুকুল রায়। তিনি ২০১৭ সালে কয়েকশ’ তৃণমূলের কর্মী নিয়ে দল পরিবর্তন করে বিজেপিতে যোগদান করেছেন। এবার নাকি তাকে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি তার মন্ত্রিসভার সদস্য করার কথা ছিল, কিন্তু মুকুল রায় ২০২১ সালের পশ্চিম বাংলার বিধানসভার নির্বাচনে মমতাকে দেখিয়ে দেওয়ার শপথ নিয়েছেন বলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হননি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে থেকে হটানোর জন্য এখন নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ এক পায়ে খাড়া। একদিকে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সভাপতি সীতারাম কেশরী আর রাজ্যে সোমেন মিত্রের সঙ্গে, অন্যদিকে কমিউনিস্ট ফ্রন্টের জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করে তখন বিজয়ী হয়েছিলেন মমতা। দুই শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার সময় তিনি নিজে একাই বাঘিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এটা দিয়ে মমতা প্রমাণ করেছেন, তিনি নিজে কত শক্তিশালী লক্ষ্যকে মোকাবিলা করতে সক্ষম।

এবার কিন্তু মোকাবিলা করতে হবে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে। নরেন্দ্র মোদি আর বিজেপি এখন আর ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান দেয় না। এখন তারা স্লোগান দেয় ‘জয় শ্রী রাম’ বলে। ধীরে ধীরে নরেন্দ্র মোদিরা সমগ্র ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ২০২১ সালের পশ্চিম বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবর্তন চাইবেন ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে।

পশ্চিমবাংলায় সংখ্যালঘু, অর্থাৎ মুসলিম ভোট হচ্ছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এখন মুসলিম তোষণ নিয়ে মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে। মমতা যে মুসলমানদের সোনার পালঙ্কে বসিয়ে দুধ-ভাত খাওয়াচ্ছেন, তা নয়। বা সর্বত্র চাকরি দিচ্ছেন না, তাও নয়। ঈদের নামাজের ময়দানে নিজে উপস্থিত হয়ে মুসলমানদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এটুকুই। সুখে-দুঃখে খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এই যা। এটার নামই হচ্ছে মুসলিম তোষণ।

মুসলমানরাও তাদের নিরাপত্তার জন্য একজন শক্তিশালী নেতা তালাশ করা স্বাভাবিক। কারণ এখন যে দল ভারতে ক্ষমতায় আছে, সে দলের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, আর বর্তমান বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ যখন গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তখন ২০০২ সালে মুসলিম নিধনযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছিল গুজরাটে। সুতরাং মুসলমানরা তাদের ভয় করাটাই স্বাভাবিক। মোদি-অমিত শাহকে নিয়ে ভীত হওয়ারই কথা।

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে কোনও সম্মিলিত বিরোধী ঐক্য মোদির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠেনি। সুতরাং ভারতীয় ভোটারদের বিভক্ত রায় হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। সর্বোপরি বিজেপি ফ্যাসিস্ট কায়দায় মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে, অঢেল অর্থ ঢেলেছে ভোটের ময়দানে। মোদির তৎপরতা যেখানে সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা কঠিন, সেখানে পৃথক পৃথকভাবে বিরোধীদের মোকাবিলার কৌশল ব্যর্থ হতে বাধ্য। এবং হয়েছেও।

মিডিয়া কোনও সম্মিলিত বিরোধী পক্ষের নেতা না পেয়ে মোদির বিপরীতে রাহুলকে দাঁড় করিয়েছে প্রতিবার। কিন্তু রাহুল তো ভদ্রলোকের নেতা। তিনি মোদির মোকাবিলায় দুর্বল ছিলেন। মমতা দেশের পূর্ব প্রান্তের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হলেও তিনি মোদির প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী, এ কথা প্রমাণ করতে পেরেছেন। যদিওবা এখন মমতা পরাজিত পক্ষ। মায়াবতীকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে প্রচার করলেও তিনি প্রচার-প্রচারণায় তা প্রমাণ করতে পারেননি, দৃষ্টির আড়ালে ছিলেন।

মোদি নিজেও নিশ্চয়ই বুঝেছেন, আগামীতে তার প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি বলেছে তারা ২০৪৫, অর্থাৎ ২২তম লোকসভা পর্যন্ত কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকবে। এটি এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সেখানে মমতা তাদের পথের কাঁটা। এবারের লোকসভা নির্বাচনের মতো পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন করে ২০২১ সালের নির্বাচনে মমতাকে হটাবেন, নাকি পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে মমতার মন্ত্রিসভা ভেঙে দেবেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের একটা ক্ষুদ্র ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক’দিন ধরে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল কলকাতায়, যা সর্বভারতীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল নীলরতন মেডিক্যাল কলেজের পাশের মহল্লা থেকে এক বৃদ্ধকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় তার আত্মীয়-স্বজনরা নিয়ে এসেছিলেন। উপস্থিত ইন্টার্ন ডাক্তাররা বলেছিলেন, একজন বড় ডাক্তার প্রয়োজন। তখন রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা খোঁজ করে একটা বড় ডাক্তার হাতে ধরে রোগীর কাছে নিয়ে এসেছিলেন। ডাক্তার আসার আগে রোগী মারা গিয়েছিলেন।

বড় ডাক্তারকে হাত ধরে আনাতে তিনি রাগ করেছিলেন। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরা যখন লাশ নিয়ে যেতে চাইলেন, তখন সমগ্র মেডিক্যালের ডাক্তাররা একত্রিত হয়ে বললেন, তারা লাশ নিতে দেবেন না, যদি রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা বড় ডাক্তারের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা না করেন। তারা ক্ষমা ভিক্ষা না করে তাদের মহল্লা থেকে লোক ডেকে এনে জোর করে লাশ নিয়ে যেতে চাইলে তাতে ডাক্তার আর মহল্লার লোকের মাঝে মারামারি হয় এবং একজন ডাক্তার মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। রোগীটি ছিলেন একজন মুসলমান, আবার তিনি ছিলেন মসজিদের ইমাম। ডাক্তাররা ধর্মঘট করেছেন। বিজেপি ঘটনায় পানি না ঢেলে ঘি ঢেলেছিল। অবশেষে নানা কাহিনির পর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বসে ডাক্তাররা এই ধর্মঘট শেষ করেছেন।

দ্বিতীয় একটা ঘটনা ঘটেছে সন্দেশখালিতে। বিজেপি আর তৃণমূলের মাঝে সংঘাত হয়েছে, আর উভয়পক্ষের কর্মী প্রাণ হারিয়েছে। সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই দুর্ঘটনাকে উপলক্ষ করে ইচ্ছা করলে রাষ্ট্রপতি ৩৫৬ ধারা মোতাবেক মমতার সরকার ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করতে পারেন। রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী এর মাঝে দিল্লি গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং অমিত শাহের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।

১৯৫৬ সালের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কেরালায় কমিউনিস্ট নেতা নাম্বুদৃপদের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছিলেন। তাতে নাম্বুদৃপদের প্রতি সাধারণ মানুষের এক সহানুভূতি দেখা দিয়েছিল। নাম্বুদৃপদও শহীদের ভান করে সহানুভূতি আদায় করে তার পার্টিকে কেরালায় এক শক্তভিত্তি রচনা করে দিয়ে গিয়েছেন। সে কারণে ১৯৫৬ সালের পর থেকে কেরালায় পালাক্রমে হয় কংগ্রেস নয় কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসছে। তৃতীয় কোনও পক্ষ আর ক্ষমতায় আসতে পারেনি সেখানে। এসব ঘটনার কথা স্মরণে এলে মোদি হয়তো মমতার সরকার নাও ভেঙে দিতে পারেন। বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। এখন সাময়িকভাবে অনেকে মমতার ওপর ক্ষিপ্ত সত্য, তখন বাংলা বঞ্চিত দাবি করে মমতাকেই আবার চাইবে।

গত লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা তাকে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের এক দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহরা ভারতকে হিন্দুত্ববাদী ধারায় প্রবাহিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব পড়েছে এখন মমতার মতো নেতাদের ওপর। সে দায়িত্ব পালনের মানসিক প্রস্তুতি মমতার থাকা প্রয়োজন। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন ভারতের সংহতির জন্য। সুতরাং দেশের স্বার্থে এ দায়িত্বভার এখন মমতার বহন করা জরুরি এবং দায়িত্ব নিয়ে মোদি-অমিত শাহদের হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতের নেতা হয়ে উঠবেন তিনি। তার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক জনতা একত্রিত হবে।

মোদির মতো নেতার নেতৃত্বে যদি হিন্দুত্ববাদীরা একত্রিত হতে পারে, তবে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, শিক্ষিত এবং বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য কামনাকারীরা কেন মমতার নেতৃত্বে একত্রিত হতে পারবে না!

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ