‘সময় এখন আমাদের’

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৬:৩২, জুন ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৬, জুন ২২, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনবছর দু’য়েক আগে আমাদের বিভাগের একজন ছাত্র মারা যান। তার লিভার সিরোসিস হয়েছিল। ঘটনাটি খুবই বেদনার। আজও মনে হলে অসম্ভব দায়ে ভুগতে থাকি। ওই ছাত্র মারা যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের। নিজের এবং পরিবারের খরচ মেটাতে তাকে তিন/চারটি টিউশনি করতে হতো। তার মৃত্যুর পর আমি সেই এলাকার এমপিকে ফোন করি এবং তার কাছ থেকেই জানতে পারি ছেলেটির পরিবারের অবস্থা। ভোটের সময় জনগণের খুব কাছে থাকার অঙ্গীকার করলেও নির্বাচিত হওয়ার পর জন প্রতিনিধিদের দেখা দরিদ্র মানুষেরা খুব কমই পায়। যদিও পরবর্তী সময়ে তার মাকে থাকার জন্য ঘর করে দেওয়া হয়। কিন্তু ছেলে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার বিধবা মা কখনও বিধবা ভাতা পাননি। এই ঘটনার প্রায় মাস ছয়েক পরে আমি আমার গ্রামের বাড়ি যাই। সেখানে আমার এক মধ্য বয়সী আত্মীয়কে দেখি বেড়াচ্ছেন। হঠাৎ তিনি কানের কাছে মুখ ‌এনে বললেন, বয়স্ক ভাতা পাচ্ছি।
মনে পড়ছিল আরেকটি ঘটনাও। আমার বাসা তদারকিতে থাকা খালা একদিন বলছিলেন তার বাবার কথা। দুঃখ করে বললেন, বাবার কোনও ছবি নেই তার কাছে। তার বাবা বয়স্ক ভাতা পেতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর একদিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য লোক পাঠিয়ে তার বাবার সেই বয়স্ক ভাতার কার্ডটি নিয়ে যান। পরে তারা জানতে পেরেছিলেন, সেই কার্ডটি আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে সেই খালা অনেক ঘুরেছেন সেই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যের পেছনে। না, ভাতার জন্য নয়, সেই কার্ডে লাগানো তার বাবার ছবিটির জন্য, যা ছিল মৃত বাবার একমাত্র ছবি। কিন্তু এর কোনও মূল্য ছিল না ইউপি সদস্যের কাছে। ছবিটি আর পাওয়া গেলো না।

এত ঘটনাকে একসঙ্গে হাজির করার কারণ দরিদ্র মানুষদের নিরাপত্তা বেষ্টনিতে রাখার যে বাজেট, সেটি কোথায় যাচ্ছে, কারা পাচ্ছে সেই বিষয়ে তদারকি করার ব্যবস্থা নেই। এই বাজেটে আরও নেই দলিত ও সমতলের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দও। এই বক্তব্যের পেছনে হয়তো পাল্টা বক্তব্য আসতে পারে—তারা যেকোনও ধরনের খাতেই সুবিধা নিতে পারে। এবারের বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। স্লোগানেই আছে, ‘সময় এখন আমাদের’।

এই আমরা কারা? নিশ্চিত করেই বলছি, এই আমরা বা ‘আমাদের’ বোধটিতে  কোনোভাবেই এদেশের শ্রমজীবী মানুষরা নেই। আমরা এখনও তাদের এই ‘আমাদের’ কাতারে আনতে পারিনি। বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আকার বেড়েছে মনে হলেও তা আনুপাতিক হারে কমেছে বলেই মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যান্যবারের মতো এবারও সামাজিক নিরাপত্তার অনেক প্রকল্প রাখা হয়েছে বাজেটে। তবে খাতের কোনও পরিবর্তন হয়নি এবং মূলত চারটিই থেকেছে। সমাজবিজ্ঞানের একজন গবেষক হিসেবে কয়েকটা দিকে আমার নজর দিতে চাই। সমাজে বিরাজমান শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, জাতি বৈষম্য এবং নানা ধরনের লিঙ্গীয় পরিচয় কিংবা বিভিন্ন অঞ্চলভেদে মানুষদের বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকার কারণে এই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে অনেকেই ঢুকতে পারছেন না। এমনকি দাঁড়াতে পারছেন না ন্যায়-বিচারের মতো জায়গাটিতেও। সামাজিক এই বৈষম্য বাড়ার কথা সরকারি দলিল-দস্তাবেজেও স্বীকৃত। দিন দিন চাষাবাদ হচ্ছে বৈষম্যের।

কিন্তু সমাজেরই বিরাজমান নানারকম বৈষম্য, পিছিয়ে থাকা দলিত, সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী ও লিঙ্গীয় বৈচিত্র্যের নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে যরা রয়েছেন, তাদের জন্য আলাদা কোনও কিছু নেই এই বাজেটে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাদ দিলে আর কোথাও কোনও সুস্পষ্ট বরাদ্দ নেই। যেটি আছে সেটি বেদে ও অনগ্রসরদের জন্য। তবে এই অনগ্রসর কারা সেটি খোলাসা করা হয়নি।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, দুগ্ধদানকারী দুস্থ মায়ের জন্য ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ নারীর ভাতা ইত্যাদির পরিসর বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়নি এবং বর্তমানে যে ভাতা প্রচলিত, তা নিতান্তই নগণ্য। ওই সব কর্মসূচিতে দলিত-সমতলের আদিবাসী ও লিঙ্গীয় বৈচিত্র্যের মানুষদের জন্য আলাদা করে কিছু বলা নেই। তাদের বিষয়ে শুধু এক জায়গায় বলা হয়েছে এই নিরাপত্তা বেষ্টনির মানুষদের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ২০ হাজার বাড়িয়ে ৮৪ হাজার করা হয়েছে। সেখানে দলিত-সমতলের আদিবাসী ও লিঙ্গীয় বৈচিত্র্যের মানুষদের কোনও ধরনের অগ্রাধিকার থাকবে কিনা, সেই বিষয়েও কিছু বলা নেই।

নদী ভাঙন কিংবা এবারে কৃষকের ফসলের দাম না পাওয়ার বিষয়কে মাথা রেখেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেই প্রস্তাব করা হয়েছে শস্যবীমার প্রকল্পের। তবে এটি কীভাবে কাজ করবে? টেকসই কতটুকু হবে? কৃষক কতটুকু লাভবান হবে সেই বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এটি কোন অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য হবে? লোকায়ত জ্ঞান এই শস্যবীমায় ভূমিকা রাখবে কিনা?—এগুলোর কোনও কিছুই বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি। অক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার মধ্যে আছেন বিধবা, বয়স্ক বা প্রতিবন্ধীরাও। তবে এখানে মানবসম্পদ বাড়ানোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচিতে রাখা হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে বৃত্তি। তবে বিধবা, বয়স্ক বা প্রতিবন্ধীদের চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রেও চলে নানা ধরনের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক লেনদেন। এগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা প্রয়োজন। এবারের বাজেটে এই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি আরও বড় হতে পারতো। কারণ আমাদের এখনও অনেকেই আছেন, যারা এই কর্মসূচির আওতাধীন নন।

তবে এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে কোনও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেই। চিকিৎসা এখনও ধনীর হাতে। বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা এখনও দরিদ্রের কাছে স্বপ্ন। আরও কিছু জায়গায় সাবসিডি দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিকে বড় এবং টেকসই করা যেতো। স্বাস্থ্য খাতে বিরাজমান বৈষম্যের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় থাকলেও বাজেটে অনুপস্থিত থেকেছে।

বাজেটে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দ থাকলেও সেটি যে সেখানকার ‘আদিবাসী’দের উন্নয়নের জন্য সেটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

তাই কাদের জন্য এই বাজেট তা হয়তো অনুমেয়, কিন্তু সবাই-ই চেয়েছিল বাজেটের অংশ হতে। ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ স্লোগানে মুড়ে এবারের বাজেট পেশ হয়েছে, কিন্তু আসলেই কি বাজেট ‘আমাদের’ হয়ে উঠেছে?

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ