ভণ্ড ‘বন্ড’ নয়ন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের কঠোরতা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১২:৪৮, জুলাই ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৯, জুলাই ০২, ২০১৯

আনিস আলমগীরহত্যাকাণ্ড প্রত্যেক দিন সংঘটিত হচ্ছে। কিন্তু গত ২৫ জুন বরগুনার হত্যাকাণ্ড পুরো জাতিকে মর্মাহত করেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে দুই তরুণ রাম দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মারছে আরেক তরুণকে। সে তরুণ বাঁচার চেষ্টা করছে। তার স্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করছে খুনিদের প্রতিরাধের। পাশে নির্বিকার জনতা। একজন একটি ভাঙা ইটের টুকরোও মারেনি খুনিদের গায়ে। মোবাইলফোনে ধারণ করা ভিডিওতে না দেখলে হয়তো এমন প্রতিক্রিয়া হতো না দেশজুড়ে।
পত্রিকা খুললেই প্রতিদিন অসংখ্য হত্যার সংবাদ। এমন হচ্ছে কেন? এটাকে কি সরকারের ব্যর্থতা বলবো? কী করে! কারণ সরকারের পুলিশের কি জানার কথা বরগুনার সেই রিফাত শরীফ তার নববিবাহিত স্ত্রীকে কলেজে পৌঁছে দিতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হবে? পুলিশ তো জানার কথা না হত্যাকারী নয়ন বন্ড কখন কোথায় তার সাঙ্গাত রিফাত ফরাজী এবং তার ছোট ভাই রিশান ফরাজীকে নিয়ে  তাকে আক্রমণ করবে। রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করবে। পুলিশ তো জানে না সিদ্ধিরগঞ্জের এক স্কুলের দুই শিক্ষক ২০ জন ছাত্রীকে চার বছর ধরে ধর্ষণসহ শ্লীলতাহানি করবে।
এমন হচ্ছে কেন? এসব প্রতিরোধ করার উপায় কী? রিফাতকে নয়নরা যখন এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল, তখন পাশে দাঁড়িয়ে তো অনেকেই তামাশা দেখছিল। কেউ তো এমন অন্যায়কে প্রতিরোধে এগিয়ে আসেনি! সেই মেয়েটি ছাড়া কেউ একটু চিৎকারও করেনি।

এখানে কি মনোবিজ্ঞানের সূত্র কাজ করেছে? Bystander Effect বা Bystander apathy বলে একটা কথা আছে মনোবিজ্ঞানে। বাইস্টান্ডার ইফেক্টে বলা হয়েছে, একজন লোক যদি অসহায় হয়ে কারও কাছে সাহায্য চায়, ব্যক্তি বিশেষের তাকে সাহায্য করার যে প্রবণতা রয়েছে, সেই সাহায্য যদি অনেকগুলো মানুষের উপস্থিতিতে চাওয়া হয়, সেই প্রবণতা কমে যায়। যত মানুষ বেশি হয়, সাহায্য করার এই প্রবণতা ততই কমতে থাকে। আরও সহজ করে যদি বলি, কেউ যদি অসহায় হয়ে আপনার কাছে সাহায্য চায়, তাহলে আপনি তাকে সাহায্য করার যেটুকু চেষ্টা করেন, জনতার ভিড়ে হুবহু একই অসহায়কে তা করেন না। তখন আপনি ভাবেন আপনি না হলেও কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে।

রিফাতের জন্য এখানে তার স্ত্রী এগিয়ে এসেছিলেন। একজন এগিয়ে এলেই যথেষ্ট ছিল। চোখের সামনে অন্যায় দেখেও যারা চুপ থাকে, তারা তখন মনোবল পেয়ে অন্যায়কে প্রতিরোধ করে। কিন্তু বরগুনার ঘটনায় তা হয়নি। রিফাতের স্ত্রীর সঙ্গে দর্শকদের থেকে কেউ এগিয়ে এসে সাহায্য করেনি। এখানে রিফাতের স্ত্রী নিজেই আরেক ভিকটিম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সে জনতার অংশ ছিল না।

এ ঘটনায় হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর একটা বাণীর কথা মনে পড়ে। তিনি সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, শেষ জামানা হচ্ছে ওই জামানা, যখন প্রকাশ্যে অন্যায় সংঘটিত হবে। মানুষ পাশে দাঁড়িয়ে দেখবে কিন্তু প্রতিরোধ করবে না।

আমরা কি তাহলে শেষ জামানার মানুষ? আসলে রাসূল (স.) এখানে মানুষের আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। মানুষ তো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নিজের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই তো মানুষ হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে।‌ এ আত্মকেন্দ্রিক মানুষের সমাজে কিভাবে সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাবে!

আমরা আপাতত দেখছি সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগহীনতার অভাব।‌ ন্যায় যেমন রাষ্ট্রের ধর্ম, ন্যায় সমাজের আর মানুষেরও ধর্ম। সুতরাং এখানেই রাষ্ট্র ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে সমাজে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে বাধ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে সে রকম ব্যবস্থা বিরাজ করছে। প্রত্যেক দিনের হত্যার হিসাব করলে মনে হয় যেন একটা ছোটখাটো গৃহযুদ্ধ চলছে।

বরগুনার শাসক দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ হচ্ছে সংসদ সদস্য‌ ও সাবেক উপমন্ত্রী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের গ্রুপ। শুনেছি নয়নেরা এই দুই নেতার ইচ্ছার ক্রীড়ানক। রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীরা নাকি দেলোয়ারের ভায়রা ভাইয়ের ছেলে আবার শম্ভুর ছেলেরও কাছের লোক তারা। আমি বলছি না যে রিফাত শরীফের হত্যাকাণ্ডে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু অথবা দেলোয়ারের সংশ্লিষ্টতা আছে। তবে তাদের প্রশ্রয়ে ‘ছিঁচকে’ চোর থেকে নয়নেরা নাকি বীর বিক্রম হয়েছে। পত্রিকায় নয়ন বন্ড কার লোক সে বিচার চলছে। কারণ নয়নের সঙ্গে রাজনৈতিক দুই গ্রুপেরই সম্পর্ক দেখা গেছে। এখন তাকে একে অন্য গ্রুপের সদস্য বলছে। আবার কেউ বলছে, সে পুলিশের লোক। তাদের ইনফরমার ছিল। একজন মাদক কারবারি পুলিশের সোর্স হয় কী করে! মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের কতটা সম্পর্ক, কতটা দহরম মহরম—আঁচ করা যেতে পারে।

লেখক ইয়ান ফ্লিমিংয়ের লেখা ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টের একটি কাল্পনিক চরিত্র ‘জেমস বন্ড’। তাকে নিয়ে নির্মিত জেমস বন্ড সিরিজের  বেশকিছু আলোচিত সিনেমা নির্মিত হয়েছে। সেই বন্ড নাম ধারণ করেছে নয়ন। বরগুনার মতো একটা মফস্বল শহরের এসএসসি পাস এক তরুণের কত আকাঙ্ক্ষা গজালে জেমস বন্ডের ‘বন্ড’ খেতাব ধারণ করে!তাও নায়কের নাম নিয়ে ভিলেনের ভূমিকায়। অবশ্য সপ্তাহ শেষে সেই ভন্ড বন্ড নয়ন নিহত হয়েছে। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে সোমবার (২ জুন ২০১৯) রাতে। বরগুনা সদর থানার ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে এ খবর নিশ্চিত করেছেন। জেলার পুরাকাটা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নানা উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকার দেশটাকে স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে দিলে কী হবে! নিহত রিফাত শরীফের মা বাবার কাছে দেশটাতো বিষের মতো লাগার কথা।

রিফাত শরীফের ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে গেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলমের ফেইসবুক স্ট্যাটাসেও সেই ক্ষোভ ঝরে পড়ে। তিনি লিখেছেন,

"গতকাল (২৬ জুন ২০১৯) মোটামুটি একই সময়ে রাজশাহীর তানোরে বাজারে আম বিক্রি করতে গিয়ে একইভাবে নিহত হয়েছে আর একজন তরুণ। প্রকাশ্য দিবালোকেই হত্যা করেছে পাশের আর এক দোকানদারের ছেলে। নিহতের একটা রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে, সে সেখানকার একটি ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। না কোনও টেন্ডার নিয়ে বা বান্ধবী নিয়ে ফেসাদ নয়। সংসার চালাতে নিজেই বাগানের আম বিক্রি করতে গিয়েছিলো সেই হতভাগা তরুণ।

সব মৃত্যুই আমাকে নাড়া দেয়। তরুণ-তরুণীর মৃত্যু একটু বেশি নাড়া দেয়। শিশুর মৃত্যু আরও বেশি নাড়া দেয়। আমরা বরগুনার মতো সব ভিডিও দেখতে পাই না। গতকাল হয়তো এই দুইয়ের বাইরেও মানুষ খুন হয়েছে বা অপমৃত্যু হয়েছে। আমরা সবগুলোর খোঁজ রাখি না। তবে সচেতনতা সামাজিক সমস্যাগুলোকে কমিয়ে আনবে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যারা দেখছিলেন তারা মনে হয় না সাধারণ পথচারী বা ছাত্র। অবশ্যই তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা নিশ্চিত করবো প্রথমে গ্রেফতার, তারপর ন্যায় বিচার। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।"

তৃতীয়বারের মতো যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখন অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি—কেন্দ্রীয় নেতারা কঠোর না হলে দলকে এবার নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। এখন দেখছি তাই হলো। এমপিরা নিয়ন্ত্রণ করছে থানা। এমপির আশকারায় থানার ওসি হয়ে উঠেছে হর্তা-কর্তা। কাউকে খুনের লাইসেন্স দিচ্ছে, কাউকে অন্যায়ভাবে জেলে ঢোকাচ্ছে। পুলিশদের সঙ্গে গড়ে উঠছে মাদক কারবারিদের সম্পর্ক। সরকারি দলের লোকেরা জড়িত মাদক কারবারে। তাদের কথায় পুলিশ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বানিয়ে দিচ্ছে সন্ত্রাসী। এ আমার নিজেরই চোখে দেখা আছে।

সমাজকে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনা এখন রাষ্ট্রের কর্তব্য হয়ে পড়েছে। পুলিশের পক্ষে সব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনাও কঠিন। আগেই বলেছি পুলিশ জানে না কখন কোন পুরুষ কোন নারীকে ধর্ষণ করবে, ধর্ষণের পর কোন জায়গায় মেরে ফেলে রাখবে। সুতরাং এখন ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পুলিশকেও জবাবদিহিতায় আনতে হবে। কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নয়, আইনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এবং আইনই হবে সমাজের চালিকাশক্তি।

আমার মনে হয় প্রত্যেক জেলায় জেলায় এমন অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল করা দরকার। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো এই ট্রাইব্যুনালের মর্যাদা হবে হাইকোর্টের সমপর্যায়ের, যদিওবা এটাই ট্রায়াল কোর্ট। তাহলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হবে। না হয়, দানবীর আরপি সাহার হত্যাকাণ্ডের বিচারের মতো ৪৮ বছর সময় লাগবে রায় পেতে। সরকার কঠোর না হলে আমাদের সমাজকে রক্ষা করা যাবে না।

ধর্ষণও এক ব্যাপক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এমনও খবর পড়েছি এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর যৌন হয়রানির ভিডিও ধারণ করে ছাত্রীর মাকে পর্যন্ত ধর্ষণ করা হয়েছে। কী নির্মম, জঘন্য অপরাধ! এমন অপরাধে ক্ষমার কোনও জায়গা নেই। ভারতেও ধর্ষণের ব্যাপকতা বেড়েছে। ভারতের সুধীসমাজ ধর্ষকের লিঙ্গচ্ছেদের আইন করার কথা বলছেন। অনেক দেশে ধর্ষককে ইনজেকশন দিয়ে নপুংসক করে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও বয়স অনুসারে ধর্ষণের সাজা ভিন্ন রাখা হচ্ছে, বিশেষ করে শিশু ধর্ষকদের কঠোর সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

আমরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো—ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজকে কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনুন। ন্যায় প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে শাস্তির ব্যবস্থা করুন। শাস্তির ব্যবস্থা হতে হবে কঠোর। না হয় সমাজকে অরাজকতার হাত থেকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত

[email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ