প্রমিলা বিশ্বকাপ ফুটবল: কেশছন্দের বল্লরী

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৫:৩৮, জুলাই ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৯, জুলাই ২৩, ২০১৯

দাউদ হায়দারবার্লিনের একটি বিশাল রেস্তরাঁয় নানা দেশের শতাধিক কর্মী। বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-নেপাল-আফগানিস্তানেরও। অধিকাংশই ছাত্রছাত্রী। পাঁচ দেশের কর্মচারী নিয়ে মালিক মহাবিপদে। বিপদ বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে। ছাঁটাই করতে পারেন না, কড়া-ধমক শাসনেও কাজ হয় না, ক্রিকেট চলাকালীন। মোবাইলে ক্রিকেট খেলা দেখেন, কাজও করেন, কাজে কিছুটা ঢিলেমি। কোনও খেলোয়াড় চার/ছয় মারলে বা কেউ আউট হলে চিৎকার। খাদকরা হতবাক। ঘটনা জানতে চায়। শুনে বিস্মিত। ক্রিকেটের নাম শোনেনি। খেলাটা আসলে কী, অজানা।
ঠিক যে, ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ড বাদে (হল্যান্ড শুরু করেছিল, বাদ দিয়েছে) ইউরোপে ক্রিকেট অচল। মিডিয়ায় একটি শব্দেরও খবর নেই। ক্রিকেট বিষয়ে একটু-আধটু জ্ঞান আছে যাদের, বিশেষত যারা বিলেতি ইংরেজি পত্রিকা পড়ে, কণ্ঠস্বরে তাচ্ছিল্য, বলে ‘ওহ! ব্রিটিশ কলোনির খেলা! কলোনিয়ান হ্যাঙওভার এখনও যায়নি।’ ভুলে যায় ফুটবল ইংল্যান্ডেই শুরু।
ক্রিকেট-খেলা বৈশ্বিক ব্যবসায় সুবিধের নয়, ধনী দেশ হুমড়ি খেয়ে (মূলত বড়ো ব্যবসায়ী কোম্পানি বা সংস্থা) পড়ে না। ফুটবলে যতটা। ফুটবল নিয়ে (কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রে ‘সকার’) বিশ্বজুড়ে যে উন্মাদনা, অন্য কোনও খেলায় নেই। ফুটবলের একজন ‘হিরো’র মূল্য শতাধিক মিলিয়নের বেশি। কোনও দেশের কোনও বড় ক্লাবে এক বছর খেললেই নিদেনপক্ষে ২৫ মিলিয়ন আয়। বাকি জীবন পায়ের ওপর পা তুলে খাওয়া, আর কোনও কাজকম্ম নেই। অবশ্য, সব দেশে নয়, ইউরোপের, দক্ষিণ আমেরিকার কথা বলছি। ইউরোপে একসময় ফুটবল নিয়ে রসিকতা ছিল, ‘ফুটবল স্ত্রী লিঙ্গ।’ কেন? কুড়িজন পুরুষ (খেলোয়াড়) ছাড়াও লাইনসম্যান, রেফারি ছুটছে একজনের পেছনে, পুরুষ যেমন নারীর পেছনে ছোটে। নারীকে রক্ষার জন্যে দুই জন আবার পাহারাদার (গোলকিপার)।

—এই রসিকতা বাসি। পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই এখন প্রমিলা ফুটবল রীতিমতন জমজমাট। দর্শক নারী পুরুষ। পরিসংখ্যানে অবশ্য বলা হয় পুরুষ দর্শক বেশি। স্মরণীয়, বহু দেশেই প্রমিলার ফুটবলার ট্রেইনার পুরুষ। প্রমিলা ট্রেইনারও আছে। কিন্তু গাইড পুরুষ। প্রথম দিকে।
প্রমিলা ফুটবলারের ‘স্কিল’ পুরুষের মতো আছে কিনা, এই প্রশ্ন বাতিল আজ। প্যারিস প্রবাসী বহুমানিত চিত্রকর শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘আরে বাপরে! কী স্কিল, কী গতি! ঢাকার আবাহনী, কলকাতার মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ওদের কাছে তুচ্ছ।’ শাহাবুদ্দীনের স্ত্রী, সুলেখিকা আনা ইসলামের কথা: ‘দেখে আমি তাজ্জব, প্রমিলা খেলোয়াড়রা যে-ভাবে সূক্ষ্ম ল্যাং মারে, পুরুষ খেলোয়াড়ের ইয়েটিয়ে বিগড়ে যাবে। আমার মেয়েদেরও ফুটবলে ট্রেনিং দিতে হবে।’

‘সূক্ষ্ম ল্যাং’-এর কথা বলেছেন আনা ইসলাম। নানা দেশের প্রমিলাদের খেলায় দেখলুম, ল্যাঙের বদলে খুব ‘সূক্ষ্মভাবে’ চুল ধরে হ্যাঁচকা টান মারে। পড়ে গেলে, ধরা পড়লে ফাউল। হলুদ কার্ড। লাল কার্ডও। চীনের এক প্রমিলা খেলোয়াড় বলেছেন, জাপানি খেলোয়াড়ের চুল আমার মুখে ঝাঁপটা মারে, ফলে বল বেগতিক, টান দেওয়া যদি ফাউল, লম্বা চুলের ঝাপটাও দোষের, ফাউল নয় কেন?

অধিকাংশ প্রমিলা ফুটবলারের ববছাঁট চুল, এটাই দেখতে অভ্যস্ত দর্শক। এবার উল্টো। আমেরিকা এবং নেদারল্যান্ডসের খেলায় (ফাইনাল) বেশিরভাগ প্রমিলার পিঠ-অবধি ছড়ানো চুল। কবির কথা: ‘কেশছন্দের বল্লরী’।

প্রত্যেক চার বছর পরপর প্রমিলা বিশ্বকাপ ফুটবল (যেমন ‘পুরুষের’)। প্রমিলা বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে প্রমিলা পুরুষের কী উন্মাদনা ইউরোপে, এই নিয়ে শিল্পী শাহাবুদ্দীনের মন্তব্য: ‘আমরা নারীবাদীর কবলে। এখন আর আনাকে বলি না, রান্নায় নুন কম।’

আমরা ক্রিকেট নিয়ে মেতে আছি, যেন দেশীয় খেলা। ইউরোপ প্রমিলা ফুটবলে (বিশ্বকাপে) নিদ্রাহীন। মিডিয়া সরব। জার্মানি বিমর্ষ, কোয়ার্টার ফাইনালেও ঠাঁই নেই। জার্মান মিডিয়া তুলোধুনো করেছে। গত বিশ্বকাপ (২০১৮) ফুটবলে (পুরুষ) কোয়ার্টারেও জায়গা পায়নি।

ফ্রান্সের লিঁও-তে প্রমিলা বিশ্বকাপ ফুটবল। আমেরিকা-নেদারল্যান্ডসের খেলা। দর্শকাসনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, নেদারল্যান্ডসের প্রিন্স। এবং প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। স্টেডিয়াম কানায়-কানায় পূর্ণ।

টানা দুইবার (২০১৫ এবং ২০১৯) আমেরিকা প্রমিলা বিশ্বকাপ ফুটবল জয়ী। এর আগে ১৯৯১ সালে জিতেছিল। এবার ২ শূন্য গোলে ধরাশায়ী করেছে নেদারল্যান্ডসকে। প্রথমার্ধে কোনও দেশই গোল করেনি। দ্বিতীয়ার্ধের পেনাল্টি নিয়ে বিস্তর তর্ক। ‘সূক্ষ্ম ল্যাঙ নয়, ব্রাজিলিয়ান রেফারির ‘সূক্ষ্ম’ আমেরিকান প্রেম।’

তর্ক যাই থাক, আমেরিকার মেগান র‍্যাপিনো এবং অ্যালেক্স মরগান অসাধারণ খেলোয়াড়, সন্দেহ নেই। র‍্যাপিনো ‘গোল্ডেন বুটে’ সম্মানিত। ভয়ংকর স্কিলের খেলোয়াড়।

আপনারা ক্রিকেট, ‘কোপা’ নিয়ে মশগুল, প্রমিলা বিশ্বকাপ ফুটবল দেখলে বলতেন, ‘প্রমিলা ফুটবলে চিত্ত দোলায়িত। দেহছন্দের শিল্প।’ যেমন বলেছেন শিল্পী শাহাবুদ্দীন, ‘প্রমিলা ফুটবলার নিয়ে ছবি আঁকবো’।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ