নয়নরা কেন ‘বন্ড’ হয়?

Send
মাসুদ আনোয়ার
প্রকাশিত : ১৮:৫৯, জুলাই ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৭, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

মাসুদ আনোয়ারবরগুনায় রিফাত হত্যার মূল আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। অন্তত এমনটাই বলা হয়েছে পুলিশের তরফ থেকে। ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’—এসব শব্দ এত বেশি ব্যবহার করা হয়েছে যে, এগুলো শুনে আর আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এসব নিয়ে কথা তোলারও কোনও মানে নেই। এত এত ‘ক্রসফায়ার’ আর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এত এত লোক মারা যাওয়ার পরও যে কেন অপরাধীরা বারবার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ লিপ্ত হয়, কে জানে!
রূপকথার গল্প বারবার শোনা যায়। শিশু বয়সে তো বটে, যৌবনে এমনকি বুড়োকালেও রূপকথা শুনতে বিরক্ত হয়েছে, এমন কোনও নজির নেই। বুড়োকালে রূপকথা শোনার মধ্যে শৈশবের বিস্ময় কিংবা মুগ্ধতা না থাকলেও সময় থাকলে বারবার শোনা সে রূপকথায় ক্ষণিকের জন্যে হলেও কান পাতা যায়। ‍কিন্তু ‘ক্রসফায়ার’ কিংবা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ গল্প শুনতে শুনতে এখন মানুষ বিরক্ত হওয়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।
‘বন্দুকযুদ্ধ’ আর পুলিশের গল্প বরং বাদ দেই। সেসব দারোগা-পুলিশ আর উকিল-মোক্তারের ব্যাপার। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ আর কতদিন চলবে কিংবা আদৌ তা চলা উচিত কিনা, সেটা ভাবার লোক আছে। আমরা বরং কেন বরগুনার  সাব্বির আহমেদ নয়নরা  ‘জেমস বন্ড’ সেজে বসে তা নিয়ে চিন্তা করতে পারি।

জেমস বন্ড একটা কাল্পনিক চরিত্র। ইংরেজ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিং এ চরিত্রের স্রষ্টা। ইয়ান ফ্লেমিং চেয়েছিলেন তার উপন্যাসের নায়ক হবে দুর্ধর্ষ চরিত্রের কেউ। সাহসী, বুদ্ধিমান ও নারীদের কাছে যৌন আবেদনময় পুরুষ। এই চরিত্রটি যখন সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছিলেন, নৌবাহিনীর গুপ্তচর হিসেবে তখন ব্রিটিশ গুপ্তচর ছিলেন ‘দুস্কো পোপোভ’। দুস্কো পোপোভ খুব বিপজ্জনক কিন্তু রাজকীয় জীবন যাপন করতেন। তার কর্মদক্ষতা ছিল অসাধারণেরও অসাধারণ। আশ্চর্যরকম দক্ষতায় তিনি সব বাধা দূর করতেন। ইয়ান ফ্লেমিং তার  ‘জেমস বন্ড’ চরিত্রে ফুটিয়ে তোলেন সার্বিয়ান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ গুপ্তচর সে দুস্কো পোপোভকে। জেমস বন্ডের কোড হচ্ছে ০০৭। ‘০০’ দিয়ে শুরু কোড শুধু তাদেরই দেওয়া হয়, যারা প্রয়োজনে হত্যা করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত। 

সাব্বির আহমেদ নয়ন সম্ভবত এই জেমস বন্ডের গল্প থেকেই উৎসাহিত হয়েছিল। নিজেকে দুর্ধর্ষ চরিত্রের একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রণোদনা পেয়েছিল বন্ডের বিভিন্ন দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড থেকে। ০০৭ নামের একটি দলও তৈরি করেছিল সে। এদের কাজ ছিল নানারকম অসামাজিক কর্মকাণ্ড করা। কাল্পনিক জেমস বন্ডের নামের শেষাংশ নিয়ে নিজেরও নতুন নাম দিয়েছিল নয়ন বন্ড। এটা এক অদ্ভুত বেপরোয়া মানসিকতা।  প্রায় কিশোর একজন মানুষ কী করে জেমস বন্ডের মতো এক আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত (হোক না কাল্পনিক চরিত্র) মানুষকে নিজের ভেতর ধারণ করার স্পর্ধা পেলো? তারপর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের গোপন আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে নিজেকে দুর্ধর্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল। জেমস বন্ডকে নিয়ে দুই ডজন ছবি নির্মিত হয়েছিল। বিদেশি চ্যানেলের অবাধ প্রদর্শনীর ফলে সেসব ছবি দেখেছিল নয়ন।

কিন্তু মাত্র বিশোর্ধ্ব একটা তরুণ কী করে এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। যে তরুণ স্বপ্ন দেখবে সুন্দরের তার মধ্যে কী করে বাসা বাঁধলো এমন অশুভ অসুন্দর! একজন রিফাতের প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হয়ে যাওয়া কিংবা একজন অপরাধীর ভোররাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার চেয়ে এটা আরও বেশি দুশ্চিন্তার, আরও বেশি আতঙ্কের।

কিছু মানুষ নাকি অপরাধপ্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অপরাধের বৈশিষ্ট্য বহন করে সে তার জিনের মধ্যেই। কিন্তু এরকম খুব কদাচিৎ ঘটে থাকে। অবশ্য এসব অপরাধপ্রবণতা একজন মানুষের মধ্যে আজীবন সুপ্তও থেকে যেতে পারে, কিংবা তার প্রকাশ ঘটলেও তা সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে না। সুস্থ একটা সমাজ কিংবা রাজনৈতিক পরিবেশ ওই ধরনের মানুষকে নিয়মে আবদ্ধ রাখতে পারে। অন্তত তার জন্যে অপরাধপ্রবণতা প্রকাশ এবং তার বিকাশের পথ খুলে দেয় না। সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যক্তিমানসের অব্যবস্থিত অবস্থাকে একটা নিয়মে থাকতে বাধ্য করে। কিন্তু মানুষের সহজাত অপরাধপ্রবণতা তখনই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যখন সমাজ-রাষ্ট্র একটা দিশাহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। স্বীকার না করে উপায় নেই, আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র দিশাহীন সময়ের যাত্রী। 

সমাজ-রাষ্ট্রের দিশেহারা ভাব তখনই দেখা দেয়, যখন তা সৃষ্টিশীলতা হারায়। আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে এখন সৃষ্টিশীলতা নেই, সৃজনবেদনা নেই। সমাজের মানুষ এখন স্বপ্ন দেখে না, নগদ যা পায়, তা হাতিয়ে নিতে চায়। আমাদের নাটকে সিনেমায় জীবনমুখিতা নেই, শিল্পসাহিত্যে জীবনদর্শন নেই, সংগীতে মর্মস্পর্শিতার অভাব। সব কিছুই এখন কৃত্রিম, বাণিজ্যিক। মানুষকে ভাবনার খোরাক জোগায় না কিছুই। আর সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা, তা হয়ে গেছে পণ্য। শেখানোর নয়, টাকা কামানোর মাধ্যম। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বৈষয়িক মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষকদের মেরুদণ্ডহীন লেজুড়বৃত্তি। আমাদের রাজনৈতিক বক্তৃতায় অসহিষ্ণুতা, মিথ্যাচার, বিকৃতি। ধর্মীয় ওয়াজ নসিহতে সহিংসতা উসকে দেওয়া, জাগতিক রূপরেখার বয়ান নেই, আছে পারলৌকিক ভয়-ভীতি আর লোভ-লালসার ইতিবৃত্ত শুধু। সুস্থ সমাজ এভাবে গড়ে ওঠে না। 

গত শতকের ৮০-এ দশকের শেষ দিকেও সমাজে সংস্কৃতির চর্চা ছিল। খেলাঘর, শাপলা শালুকের আসরসহ বিভিন্ন নামে শিশুকিশোর তরুণদের সংগঠন ছিল। এসব সংগঠন শিশু-কিশোর-তরুণদের মানসিক ভিত গড়ে তুলতো। দেশপ্রেমের বীজ উপ্ত করতো মনে ভেতর। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ করে তুলত তাদের মন ও মেধা। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে তার বিলোপ ঘটলো। দৃশ্যমান এক অস্থিরতায় আক্রান্ত হলো মানুষ। তরুণদের চোখ থেকে স্বপ্ন চলে গেলো। সেখানে এসে বাসা বাঁধলো ক্লিষ্ট বাস্তবতা।

নয়ন বন্ডের কথাই বলি। সাব্বির আহমেদ নয়ন নামের ছেলেটা নিজের নামের সাথে ‘বন্ড’ শব্দটা যোগ করলো কেন? কাল্পনিক এক বন্ডের হিরোইজমে প্রভাবিত হলো কেন সে? তার শৈশবে কৈশোরে আকৃষ্ট হওয়ার মতো কোনও চরিত্র কি আমাদের দেশে ছিল না? ছিল। কিন্তু আমরা সেসব চরিত্রের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো পরিবেশ রাখিনি। রাজনৈতিক মিথ্যাচার, হানাহানি, সামাজিক অস্থিরতা, জীবনযাত্রার দুঃসহ ভার বিরূপভাব সৃষ্টি করলো সাধারণ জনজীবনেও।  বইপড়া, সংস্কৃতিচর্চা, শিল্পানুরাগের স্থান দখল করল পাড়ায় পাড়ায় অস্ত্রের ঝনঝনানি, সন্ত্রাস আর সহিংসতা। সত্যিকার জ্ঞানার্জনের চেয়ে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ গ্রেড লাভের প্রাণান্তকর প্রতিযোগিতা। মোট কথা, একটা দশকের মধ্যেই যেন ঘটে গেলো এক অশুভ সামাজিক অন্তর্বিপ্লব। এমনকি রাতারাতি ফুটপাত থেকে উধাও হয়ে গেলো বই-পত্রপত্রিকা। তার স্থান দখল করলো ক্যাসেট-ভিডিওসহ নানা সংক্ষিপ্ত বিনোদন সামগ্রী। বিয়েতে জন্মদিনে একসময়ের অভিজাত উপহার বইয়ের স্থান দখল করেছে বৈষয়িক ব্যবহার্য দ্রব্য। সুবোধ তরুণরা পিছিয়ে পড়তে লাগলো আর দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে শুরু করলো অবোধরা। তাই নয়ন ‘মাসুদ রানা’কে তার আদর্শ হিসেবে না নিয়ে বেছে নিল বিদেশি জেমস বন্ডকে। আশির দশকেও পাড়ার লাইব্রেরিগেুলোতে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি বিক্রি হতো হ‌ুমায়ূন আহমেদের বই, সেবার মাসুদ রানা। ভাড়াতেও পাওয়া যেতো। আর এখন সেসবের স্থান দখল করেছে নোট গাইড আর সাজেশন্স কপি। নয়নরা কীভাবে মাসুদ রানা হবে? বন্ডই তো হবে তারা।

আসলে নয়ন বন্ডরা একদিনে তৈরি হয়নি। এদের তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে সামাজিক অসঙ্গতি, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও বিচারহীনতা কিংবা বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বহীনতা ও ক্ষমতালিপ্সা। 

আমরা আমাদের নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি জীবনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে। যা সত্য ও সুন্দর, তাতে আমরা আকৃষ্ট হই না। সৃজনশীল মানুষদের অপমান ও অবহেলা করি। সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেও অনুপ্রেরণা জোগাই না। ফলে আমরা নিজেরাই পিছিয়ে পড়ি, নিজেদের কর্মফল হিসেবে নিজেরাই ভোগ করি নানা অবিচার অনাচার ও অযাচারের বিষাক্ত ফল।

নয়ন বন্ডরা যেমন একদিনে হয়ে ওঠেনি, তেমনি একদিনেই এদের উচ্ছেদ করাও সম্ভব হবে না। এর জন্যে সবাইকে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক,সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানুষের শুভ কাজগুলোকে প্রশংসা করতে হবে,বিকাশের সুযোগ দিতে হবে, তেমনি অশুভ কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। বয়কট করতে হবে নয়ন বন্ডদের। আর সবচেয়ে বড় কথা,আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে নিজেদের সংশোধিত হতে হবে। সবার আগে।

লেখক: সাংবাদিক

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ