আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তা

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:৩৪, জুলাই ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৬, জুলাই ১৪, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামবেশ কয়েক দিন আগে মেয়েকে স্কুল থেকে বাসায় আনতে গিয়েছি। স্কুল ছুটি হয়েছে। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট করে সময় পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মেয়ের আর দেখা নেই। বেশ কিছুক্ষণ পরে মেয়ে তার বান্ধবীদের সঙ্গে বের হয়ে এলো। বকাঝকা দিয়ে আমি দেরির কারণ জানতে চাইলাম।
উত্তর শুনে আমি তো রীতিমতো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। তার এক বান্ধবীকে স্কুলেরই প্রেমপ্রত্যাশী ছেলেরা রাস্তায় চরম বিরক্ত করে। তাই তারা অপেক্ষা করছিল ছেলেরা যাতে দূরে সরে যায়। এরপর তারা নিরাপদে তাকে বের করে এনেছে। 
এ ঘটনার পর থেকে আমি আশেপাশের দুয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে কিশোরদের আচরণ ঘনিষ্ঠভাবে দেখার চেষ্টা করেছি। তাদের অনেকের আচার আচরণ বা মেয়েদের প্রতি অঙ্গভঙ্গি আমার কাছে মোটেও স্বাভাবিক মনে হয়নি। অনেক স্কুলের সামনে তাদের মাস্তানির প্রচেষ্টা বেশ লক্ষণীয়।
গত ৮ জুলাই এক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ দেখলাম আমার এই পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে। এই সংবাদ অনুসারে বিগত ১৬ বছরে তিন শতাধিক কিশোরের হাতে খুন হয়েছে ৯৯ জন। এরমধ্যে ত্রিশটি খুন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৬টি প্রেমসংক্রান্ত।    

তবে দেশের সাম্প্রতিক ধর্ষণের মহামারী আর মেয়েদের হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে উল্লিখিত ঘটনা সম্পূর্ণ পরিস্থিতির একটি খণ্ডিত চিত্র মাত্র। স্কুল, কলেজে, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাস্তঘাটে এমনকি নিজের বাসায় মেয়েদের নিরাপত্তা এখন  হুমকির মুখে। মেয়েদের অভিভাবকরা আজ  চরম উদ্বিগ্ন। এসব নিয়ে অনেকের লেখাই পড়ছি বা বক্তব্য শুনছি। কেউ দায়ী করছেন ইন্টারনেটের পর্নোগ্রাফিকে, কেউবা আবার আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাকে। কিন্তু কীভাবে এর প্রতিকার সম্ভব, তা কেউ জানেন না। 

একজন পুরুষ হিসেবে বিগত কয়েক মাস ধরে আমি দেখছি, মেয়েদের ব্যাপারে এদেশে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। অত্যাচার বা ধর্ষণের ঘটনা তো আগেও ঘটেছে। কিন্তু ধর্ষণের পর হত্যা বা অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়া—মেয়েদের প্রতি নৃশংসতায় এক নতুন মাত্রা এনেছে। অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার পর মেয়েদের আত্মহননের ঘটনাও বেশ ঘটছে।      

সমাজের কোথাও কিছু তো একটা গড়বড় হয়েছে বৈকি! আমি অনেক দিন ধরেই ফেসবুক ব্যবহার করি। তবে মোবাইলে ফেসবুকে সার্চ অপশনের নিচে ভিডিওর যে একটা আলাদা আইকন আছে, তা আগে কখনও খেয়াল করিনি। কেউ একজন সম্প্রতি আমাকে দেখালো, ভিডিও আইকন ক্লিক করলে আপলোডকৃত সব ভিডিও একসঙ্গে দেখা যায়। সেখানে কিছু ভিডিও দেখার পর আমি বুঝলাম বাংলাদেশের নারী পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে, যে সম্পর্কে আমি ওয়াকিফহাল নই। 

ঢাকা শহরের হাজার হাজার রিকশা, সিএনজি, ট্রাক বা গাড়িতে ‘মা’ বা ‘মায়ের দোয়া’ লেখার সংস্কৃতি, যেখানে একজন নারী মা হিসেবে পেয়েছেন চরম সম্মান বা হুমায়ূন আহমেদের প্লেটোনিক লাভের উপন্যাসে বুঁদ হয়ে থাকা প্রজন্ম, যারা নারীকে মায়াবতী হিসেবে দেখে এসেছেন তাদের কাছে এসব ভিডিওর বিষয়বস্তু অবাস্তব ও অসম্ভব ঠেকবে।  

সিনেমা, নাটক বা আপলোডকৃত কিছু ভিডিওর অংশ থেকে আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের সামাজিক অশ্লীলতা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মেয়েদের আমাদের পুরুষ প্রজাতি পণ্য বা ভোগের বিষয়বস্তু হিসেবে দেখছে। ব্যাপক হারে তাদের সরলতার সুযোগ নিচ্ছে। এসব ভিডিও আমাদের নারী-পুরুষের সামাজিক সম্পর্কের সনাতন কাঠামো ভেঙে ফেলছে। কোনও সম্পর্কই যেন আর পবিত্র নেই।  

এর প্রতিফলন আমরা দেখছি বাস্তব জীবনে ধর্ষণ আর খুনের মহামারীতে। যেখানে বয়স আর সম্পর্ক কোনও বাধা নয়। সাধারণ পর্নোগ্রাফির প্রভাব হিসেবে একে দেখা চরম সরলীকরণ হবে। 

বেসরকারিকরণ, নগরায়ন, বিশ্বায়নের প্রভাব আমাদের শত বছরের সামাজিক কাঠামোতে চরম আঘাত হেনেছে। কয়েকজনকে ধরে ফাঁসিতে ঝুলালে এ অবস্থার রাতারাতি পরিবর্তন ঘটবে না। আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে পারস্পরিক সহমর্মিতার সেই সামাজিক অবস্থা যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। নিতে হবে কিছু আউট অব দ্য বক্স পদক্ষেপ। 

আউট অব দ্য বক্স পদক্ষেপের একটা উদাহরণ দেই। বিস্মিত হতে হয় এটা দেখে, দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় মেয়েদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ–শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা রাস্তায় বিপদে পড়লে তারা ৯৯৯ বা বাসায় ফোন করে যে জানাবে তা সম্ভব নয়। অথচ দেখা যাচ্ছে অনেক শিক্ষক ধর্ষণের পরে ছাত্রীর মোবাইলে ছবি তুলে তা ভার্চুয়াল জগতে শেয়ার করছেন। আমার মতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা রাস্তায় বিপদ থেকে রক্ষা পেতে মেয়েদের অন্তত একটা পুশ বাটন ফোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিত। এতে অনেক ক্ষেত্রে নিজেরা বাঁচতে পারবে বা অন্যদের বিপদেও এগিয়ে আসতে পারবে। 

আমি থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। ব্যস্ততার কারণে যদিও আমি শেষ পর্যন্ত পড়াতে পারিনি, তবে চুক্তিপত্রের একটি ধারা আমার এখনও মনে পড়ে। একটি ধারায় পরিষ্কারভাবে লেখা—romantic relationship with any student is strictly prohibited এবং এরকম হলে কেউ চাকরি হারাবেন। কথাটি আমি এজন্য বললাম, থাইল্যান্ড একটি খোলামেলা দেশ, কিন্তু তারা শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠিন। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষকদের হাতেই সম্প্রতি মেয়েরা বেশিমাত্রায় নিগৃহীত হচ্ছে।

এরকম কিছু পদক্ষেপ আমাদের খুব দ্রুত নেওয়া জরুরি। মহিলা মাদ্রাসাসহ আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। মহিলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনও পুরুষ শিক্ষককে প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না—এরকম অসংখ্য পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

আমরা দেখছি জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের অ্যাডভোকেসি কর্মসূচি বেশ সাফল্যের মুখ দেখেছে। রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, থানাসহ সবার এলাকাভিত্তিক কর্মসূচিতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। ধর্ষণও একধরনের জঙ্গিবাদী আচরণ। ধর্ষকদের চিহ্নিতকরণ বা তাদের শাস্তি সম্পর্কে জনগণকে অবহিতকরণ ও পারিবারিক সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। 

যে মানেরই হোক না কেন ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন’ এতদিন আমাদের পপুলার কালচার বা নাটক, সিনেমা আর বিজ্ঞাপনের কাহিনির মোটামুটি মর্মকথা ছিল। কিন্তু ইদানীং এতেও বোধহয় বেশ পরিবর্তন আসছে। অসম প্রেম বা অসম যৌন সম্পর্ককে উৎসাহিত করার প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়। আমি সিনেমাটি দেখিনি, তবে পত্রিকায় পড়লাম, এবারের ঈদে বৃদ্ধের সঙ্গে এক তরুণীর সম্পর্ক নিয়ে একটি ছবি আলোচিত হয়েছে। বোধহয় এক নাটকের ক্লিপে দেখলাম অভিজাত এলাকায় এক তরুণী এক তরুণকে ভাড়া করছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মোটেও সাধারণ জনগণের মধ্যে ভালো বার্তা দেয় না। তারা যা শিখে তা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মেয়েরা এ সমাজে অত্যাচারিত, এটা সত্ত্বেও মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্কের পবিত্রতার ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। মেয়েদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাচ্যের মূল্যবোধের আশ্রয় নিতে হবে, পারিবারিক আর সামাজিক বন্ধনকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আর এর মাধ্যমেই আমরা সুরক্ষিত করতে পারি আমাদের মা, বোন আর কন্যা সন্তানদের।      

লেখক: কলামিস্ট

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ