তাজউদ্দীন আহমদ: নক্ষত্রের গান

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৫:১৭, জুলাই ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৮, জুলাই ২৩, ২০১৯

শুভ কিবরিয়ারবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের সত্তায় দ্বৈধ আছে। তার যে সত্তা জীবসীমার মধ্যে, সেখানে যেটুকু আবশ্যক সেইটুকুতেই তার সুখ। কিন্তু অন্তরে অন্তরে জীবমানব বিশ্বমানবে প্রসারিত; সেই দিকে সে সুখ চায় না, সে সুখের বেশি চায়, সে ভূমাকে চায়। তাই সকল জীবের মধ্যে মানুষই কেবল অমিতাচারী। তাকে পেতে হবে অমিত, তাকে দিতে হবে অমিত, কেননা তার মধ্যে আছে অমিতমানব। সেই অমিতমানব সুখের কাঙাল নয়, দুঃখভীরু নয়। সেই অমিতমানব আরামের দ্বার ভেঙ্গে কেবলই মানুষকে বের করে নিয়ে চলেছে কঠোর অধ্যবসায়ে। আমাদের ভিতরকার ছোটো মানুষটি তাকে নিয়ে বিদ্রূপ ক’রে থাকে; বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। উপায় নেই। বিশ্বের মানুষটি ঘরের মানুষকে পাঠিয়ে দেন বুনো মোষটাকে দাবিয়ে রাখতে, এমন-কি, ঘরের খাওয়া যথেষ্ট না জুটলেও।’
আমাদের এই ভূখণ্ডের রাজনীতিতে এরকম অমিতমানবের দেখা মিলেছে খুবই কম। তাই হয়তো আমাদের রাজনীতি আজও  রুগ্‌ণ দশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এই ভূখণ্ডেও চিন্তা, সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় নিয়ে কিছু কিছু রাজনীতিবিদ তাদের কাজ করে গেছেন, যা জনমনে বড়ভাবেই ছাপ ফেলেছে। এই বিরল রাজনীতিবিদদের একজন ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তাজউদ্দীন আহমদ স্বল্পায়ু জীবনের অধিকারী ছিলেন। মাত্র পঞ্চাশ বছরের জীবন পেয়েছিলেন। কিন্তু এই জীবনেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার মতো বড় কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের জেলখানায় বন্দি, তখন তাজউদ্দীন আহমদ সেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। দেশকে স্বাধীন করা এবং বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে জীবিত ফিরিয়ে আনার মতো সফল ও অসামান্য কাজে যুক্ত ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তার সম্পর্কে তাই শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিমের বয়ান ছিল, ‘তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন আমাদের সমকালীন সাথীদের অন্যতম সেই ব্যক্তি, যিনি ইতিহাসের গতিপথকে সচেতনভাবে অনুসরণ করেছেন। যিনি ইতিহাসের সঙ্গে গেছেন।’

২.

তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) জন্মেছিলেন এখনকার গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পবিত্র কুরআনে হাফেজ ছিলেন। ভালো ছাত্র হিসেবে উন্নততর শিক্ষার আশায় স্কুলের শিক্ষকদের প্রেরণায় ক্রমাগত স্কুল পাল্টেছেন। পড়েছেন গ্রামের মক্তবে, নিজ বাড়ি থেকে দূরে ভুলেশ্বর প্রাইমারি স্কুলে, কাপাসিয়া মাইনর ইংরেজি স্কুলে। পরে গেছেন কালীগঞ্জের মিশনারি স্কুল সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশনে। সেখান থেকে ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাইস্কুল ঘুরে গেছেন সেই সময়ের বিখ্যাত মিশনারি বিদ্যাপীঠ সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুলে। এখান থেকেই কৃতিত্বের সঙ্গেই পাস করেছেন ম্যাট্রিকুলেশন। তৎকালীন কলকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৪৪ সালে সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ১২তম স্থান অধিকার করে ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রি নেন।

স্কুলে থাকতেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। তাজউদ্দীন আহমদ পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের প্রাদেশিক রাজনীতিতে যুক্ত হন স্কুলে থাকা অবস্থাতেই। ১৯৪৩ সালেই ঢাকার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের অফিস ও সংগঠন গড়ার কাজে ব্যাপৃত হন। সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণেই নিয়মিত ছাত্র হিসেবে যথাসময়ে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিতে পারেননি। ১৯৪৮ সালে অনিয়মিত ছাত্র হিসেবে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেন। ইন্টারমিডিয়েটে  তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বোর্ডে মেধা তালিকায় ৪র্থ স্থান লাভ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে এমএলএ নির্বাচিত হন। ক্রমান্বয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পূর্ণ করে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম রাজনৈতিক সহকর্মী হয়ে ওঠেন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফার আন্দোলনের বছরেই দলের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য হন। ১৯৭১ সালে প্রবাসে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অসামান্য দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে স্বাধীন দেশে প্রথম অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে তিনি গ্রেফতার হন। এবং ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনীতি এবং আইনের ছাত্র হলেও বিশ্ব ইতিহাসের পঠন ছিল তার করায়ত্ত। সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে তার সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করতেন এই বলে, ‘আসুন আমরা এমনভাবে কাজ করি ভবিষ্যতে যখন ঐতিহাসিকেরা বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করবে, তখন যেন আমাদের খুঁজে পেতে কষ্ট হয়।’ 

তিনি নির্দ্বিধায় বলতেন, ‘মুছে যাক আমার নাম, তবু বেঁচে থাক বাংলাদেশ।’

৩.

তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি বলেছেন অনেকেই। সেসব স্মৃতিঘন বয়ানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় অমিতমানব এই রাজনৈতিক ব্যক্তিকে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন একসময়ের ডাকসাইটে আমলা ফারুক চৌধুরী। দেশ স্বাধীন হলে সদ্যস্বাধীন দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যাত্রা শুরুর কালে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কাজের কিছু অভিজ্ঞতা লিখেছেন ফারুক চৌধুরী তার ‘দেশ-দেশান্তর’ বইয়ে।

ক.

‘২২শে ডিসেম্বর ১৯৭১ সেই সন্ধ্যার একটি ঘটনা মনে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গভবনে উপস্থিত প্রত্যেকটি কর্মকর্তা আর কর্মচারীর সঙ্গে একে একে করছিলেন দেখা। ভবনটি ঘুরে সবার সঙ্গে করছিলেন করমর্দন। তার সঙ্গে সেটা ছিল আমাদের অনেকেরই প্রথম পরিচয়। তার এই নেতৃত্বসুলভ পদক্ষেপটির তাৎপর্য ছিল যথেষ্ট। বিজয় দিবসের সপ্তম দিনের সেই সন্ধ্যায় সরকারের কর্মকাণ্ডের সেই প্রাণকেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ করলেন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠা। যুদ্ধোত্তর কর্কশ কোনও উগ্রতায় নয়, আমাদের কাছে তার স্বভাবসুলভ নম্র, ধীর, আত্মবিশ্বাসভরা ব্যক্তিত্বের প্রথম এই প্রকাশে। স্বল্পভাষী, জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, কর্মক্ষম এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেই দিনগুলোতে, আমাদের অনেকেরই মনে করেছিলেন গভীর রেখাপাত।’

খ.

‘১ জানুয়ারি ১৯৭২ পররাষ্ট্রমন্ত্রী (আবদুস সামাদ আজাদ) আমাকে বললেন চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই তার ভারত সফরের প্রস্তুতি নিতে। তিন-চার দিন পরিশ্রম করলাম, আমরা সবাই সফরটির ব্রিফ প্রস্তুতিতে। স্বাধীনতার সেই প্রারম্ভিক দিনগুলোতে তথ্য মেলা ছিল মুশকিল। কিন্তু তবুও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হলো ব্রিফ, অর্থাৎ সফরের উদ্দেশ্য এবং আলোচনা সন্বন্ধে  তথ্য ও খসড়া নির্দেশনা। পরিকল্পনা কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আর আসবাবপত্রবিহীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমাদের তিন-চারজনের ওপর বর্তে ছিল সেই দায়িত্ব। ৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সন্ধ্যা নাগাদ ব্রিফ তৈরি শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গেলাম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে। সফরের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য সম্বন্ধে তার অনুমোদন এবং নির্দেশনা লাভের জন্য। ব্রিফটি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পড়লেন তিনি। সেদিন লক্ষ্য করেছিলাম, সমস্যার গভীরে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছার তার অসাধারণ ক্ষমতা এবং তার প্রাঞ্জল, সহজে বোধগম্য বাচনভঙ্গি। 

ব্রিফটির অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলোর ওপর সহজ, সরল ভাষায় তিনি দিলেন স্পষ্ট নির্দেশ। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠক। কোনও অপ্রাসঙ্গিক কথা নেই তার মুখে। বাংলাদেশের বিয়োগান্তক নাটকের অন্যতম এই নায়কের সান্নিধ্যে সেটা ছিল আমার জন্য এক স্মরণীয় ঘটনা।’ (পৃষ্ঠা ৭৭ ও ৯৭-৯৮, দেশ-দেশান্তর, ফারুক চৌধুরী, যায়যায়দিন প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)

৪.

তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েরই আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন ভারতীয় সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত তার ‘মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্র’ বইয়ে। ঘটনাটি এরকম— 

শেষ পর্যন্ত হাজির হলাম প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে। তার তখন নিঃশ্বাস ফেলারও ফুরসত নেই। তবু আমাকে সময় দিলেন। বললেন, লাঞ্চের সময় আসুন। অফিসে জায়গা খুব কম। তার মধ্যেই লাগোয়া একটি কামরায় তিনি থাকেন। আমি গিয়ে দেখি সেখানে বসে আছেন। মেস থেকে খাবার আসবে। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি—আপনি এখানেই খাওয়া-দাওয়া করেন নাকি?
—হ্যাঁ, একটা শপথ পালন করছি।

—শপথ? কিসের শপথ পালন হচ্ছে এখানে খেয়ে?

তাজউদ্দীন আহমদ বললেন—তাহলে শুনুন। আমাদের যে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়, সেখানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব আর আমরা চারজন মন্ত্রী কসম করি, যতদিন বাংলাদেশ স্বাধীন না হয়, ততদিন কেউই আমরা পরিবারের সঙ্গে সংশ্রব রাখবো না। অন্যরা কী করছেন বলতে পারবো না। তবে আমি কসম খেলাপ করতে জানি না। তাই এইখানেই কাজ করি, এখানেই খাই, ঘুমাই।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা ভালোই হয়েছে, কী বলুন? বেশি সময় কাজ করতে পারছি এতে, তাই না?
আমি অবাক বিস্ময়ে তাজউদ্দীন আহমদের কথা শুনছিলাম। বোঝার চেষ্টা করছিলাম।
মনে হলো পলিমাটির দেশের এই মানুষগুলো যেন ইস্পাত হয়ে উঠছেন।
মেস থেকে খাবার এলো। কথা চলল খেতে খেতে। মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার, ঢাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি, আরও অনেক কথা।’

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক। এবং তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ