ইউরোপ: দারুণ অগ্নিবাণে রে

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৬:১০, জুলাই ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১২, জুলাই ২৭, ২০১৯

দাউদ হায়দারভারতের দক্ষিণ বা উত্তরের রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার কথা বলছি না। প্রত্যেকে জানেন গ্রীষ্মকালে কী ভয়ঙ্কর তাপদাহ। জানেন উত্তর আমেরিকার কোনও-কোনও রাজ্যে, অস্ট্রেলিয়ার কোনও-কোনও প্রদেশে বনবাদাড় আগুনে পুড়ে ছারখার, গ্রীষ্মকালে। কেউ আগুন লাগায় না, ঝরে-পড়া পাতায় প্রচণ্ড গরমে আচমকা খাণ্ডবদাহ। রক্ষে নেই বনপ্রাণী এমনকি মানুষেরও। মাসখানেক আগে ইউরোপের পর্তুগালের একটি বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, গরমের ‘অগ্নিদাহে’ পুড়ে নিঃশেষ। ইউরোপের জলহাওয়া বিশেষজ্ঞরা হতবাক, ‘এত চটজলদি হওয়ার পূর্বাভাস ছিল না।’ তার মানে, বিশ্ব জলবায়ুর (ক্লাইমেট) চরিত্রে যে পরিবর্তন দ্রুত, কূলকিনারা ঠাওর করা প্রায় মুশকিল। তাতে কী!! আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গোঁ ধরেছেন, আমরা কিয়োটো বা প্যারিসের গৃহীত প্রস্তাবমালায় স্বাক্ষর করবো না, “মাঝেমধ্যে আবহাওয়া ওলোটপালট হতেই পারে। তাই বলে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ করতে হবে? কয়লা, গ্যাস, কারখানা, বিদ্যুৎ চুল্লি বন্ধ করতে হবে? আকাশে ‘ওজোন’ ছিদ্র হয়েছে, আমরা কী করবো? আমরা করিনি।” ট্রাম্প তো বলেই দিয়েছেন, ‘আমেরিকা বিশ্ব থেকে আলাদা।’—অতএব দায় নেই দুনিয়ার আর কোনও দেশের হালচাল, দুরবস্থা কী। কেবল ইসরায়েল বাদে।

ইউরোপে তিন দশকের বেশি আছি। গরমে কখনও গা জ্বলেনি, গা পোড়েনি। এবার শুধু জ্বালাপোড়া নয়, হাড্ডিও কাবাব হচ্ছে। ভাবা যায় কী ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ইউরোপে, গত চারদিন? চারদিকে আর্তনাদ। গরমে মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, পর্তুগালে। বলা হচ্ছে (ইউরোপের আবহাওয়া অফিস বলছে) গত ১৭০ বছরে এমন গরম কখনও পড়েনি, জনজীবন অতিষ্ঠ, মৃতপ্রায়। নানা রোগও ছড়িয়ে পড়ছে। জলেরও অভাব বহু অঞ্চলে। বহু নদীনালা, মাঠ শুকিয়ে চৌচির। ফলমূল তথা আনাজপাতির সমূহ ক্ষতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দামও একলহমায় চড়া, নাগালের বাইরে।

বাংলাদেশে মশা, ডেঙ্গু নিয়ে মহাকাণ্ড, মশা থেকে বিস্তর বিপদ, সামাল দেওয়া এখন রীতিমতন রাজনৈতিক সওয়াল। উত্তর ইউরোপেও মশার দাপট, ক্রমশ বাড়ন্ত, সরকার দিশেহারা। ডেঙ্গুর খবর মিডিয়ায় ফলাও। জার্মান সরকার অনুরোধ জানাচ্ছেন, দরোজা জানালা বন্ধ রাখুন, যত্রতত্র ময়লা ফেলবেন না। কীটনাশক ওষুধ (স্প্রে) ব্যবহার করুন।

বললে কী হবে, যাদের ঘরবাড়ি নেই, রাস্তায় থাকে (সংখ্যা প্রায় হাফ মিলিয়ন), মশা কেন তাদের রক্তচোষণে নিষেধাজ্ঞা শুনবে। এক শরীর থেকে আরেক শরীরের রক্ত কম সুস্বাদু নয়। ছড়িয়ে দিচ্ছে রোগ।

বার্লিনের শ্যারিটে হাসপাতালের এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, গত এক সপ্তাহে মশার কামড়ে আক্রান্ত তিন হাজারের বেশি রোগী। জার্মানির অন্যান্য শহরের হাসপাতাল থেকেও একই খবর।

ইউরোপ মূলত শীতের দেশ। গরমের সঙ্গে মোকাবিলা করার কালচার নেই। জুন থেকেই গরমের বাড়ন্ত, দাপট। গত সপ্তাহ থেকে প্রকট। মাঝেমধ্যে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হলেও প্রবল ধারাবর্ষণ নেই। ফলে, এগ্রিকালচারের হরেক বিপদ, সমস্যা। এমনিতেই জলের সংকট দেখা দিচ্ছে, কৃষির মাঠে জল ব্যবহারও সীমিত।

গ্রীষ্মের সময়কালে আনাজপাতির দাম (ইউরোপে যা উৎপাদিত) কম, কিন্তু এবার উল্টো। প্রায় তিনগুণ। উৎপাদন আশাতুল্য নয়। এই সুযোগ নিয়েছে তুরস্ক। এক কেজি (এক কিলোগ্রাম) পিঁয়াজের দাম ছিল (মে মাসে) ১ ইউরো ২৯ সেন্ট, দাম এখন সাড়ে তিন ইউরো। অন্যান্য আনাজপাতির দামও দুই গুণের বেশি। এমনকি জার্মানির প্রধান খাদ্য আলুরও।

মে’র শেষ সপ্তাহে জার্মানির আবহাওয়া দফতর জানিয়েছিল, ‘এ বছর গ্রীষ্মের তাপমাত্রা রেকর্ড ছড়াবে।’ খবর মিডিয়ায় প্রচারের পরদিনই দেখা গেল, এক ঘণ্টার মধ্যে সব ইলেক্ট্রনিকস দোকান থেকে ফ্যান উধাও। বিদেশ থেকে (বিশেষত ভারত থেকে) এনেও কূল পায়নি। যা এনেছিল নিমেষে শেষ, চড়া দামেও মেলেনি।

ইউরোপে এসি (এয়ারকন্ডিশন) কালচার নেই। সরকারি অফিসেও নেই। জার্মান সরকার জানিয়েছে, ‘আগামী গ্রীষ্মের আগে বাজারে এসি সুলভ হবে।’ কিন্তু প্রশ্ন, জার্মানির অফিসঘরে, আবাসলয়ে ইসি স্থাপনের কোনও বাস্তুগত ব্যবস্থা নেই। তা হলে? এও বাহ্য। ইসি ব্যবহারে প্রকৃতি, পরিবেশ ধ্বংস হবে। পরিবেশবাদী সংঘটন, রাজনৈতিক দল কী মৌনী থাকবে। আরেক রাজনীতির গ্যাঁড়া।

বলছিলুম, ভারতের নানা রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন তাপ, দাহের কথা। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম-বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরে গ্রীষ্মতাপ ব্রহ্মতালুও পুড়িয়ে দেয়, ছারখার করে। কতটা করে, রবীন্দ্রনাথ হাড়েমজ্জায় টের পেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনেই।

লিখেছেন: ‘দারুণ অগ্নিবাণে রে # হৃদয় তৃষায় হানে রে।।

রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন

আরাম নাহি যে জানে রে।’

ইউরোপ অগ্নিবাণে কাতর, ব্যবসায় মন্দা, ইউরোপের টুরিস্ট ঘরবন্দি, তবে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারতের পর্যটকে সয়লাব, কলকাতার নূপুর বিশ্বাস এবং তাঁর স্বামী দীপক, ঢাকার মহুয়া ইসলাম, স্বামী হাসান বলেছেন, ‘ধ্যেৎ, গরম কোথায়, আমাদের দেশে আসুক ঠ্যালা বুঝবে। ইয়েটিয়ে শুষে সব আমচুর হয়ে যাবে।’ জার্মানরা বলছেন, ‘এই গরমে তার আগেই মারা যাবো’।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ