বাংলাদেশের সংখ্যালঘু এবং আমাদের মন

Send
শ্যামল দাস
প্রকাশিত : ১৪:৫৮, জুলাই ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৪, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯





শ্যামল দাসপ্রিয়া সাহা ট্রাম্পকে কঠিন সব ‘তথ্য’ দিয়েছেন; এসব তথ্য শুনে ট্রাম্প তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তা ভিডিওতে দেখা গেছে। এরপর থেকেই বাংলাদেশে শুরু হয়েছে এক ক্রমাগত আলোচনা-সমালোচনা প্রিয়ার বক্তব্য এবং তার ব্যক্তিগত ডিসগ্রেস নিয়ে। এই ডিসগ্রেসের প্রক্রিয়ায় প্রিয়ার স্বামী বেচারা এবং তাদের দুই মেয়েও জড়িয়ে গেছে। এই ভদ্র মহিলা অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশে মাইনরিটিদের নিয়ে ‘কাজ’ করছেন বলেই জানি। আমার জানা নেই তিনি কীভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছেন। একইসঙ্গে তার এতদূরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটিও পরিষ্কার নয়। আমার সবচেয়ে বড় আপত্তি, তিনি কীভাবে ট্রাম্পের মতো একজন মানুষের কাছে সমাধান চাইলেন! যে মানুষটি খোদ আমেরিকাতেই মাইনরিটির অধিকার সংকোচনের পক্ষে।
দ্বিতীয় আপত্তি হচ্ছে, তার প্রস্তুতিবিহীন মন্তব্য আসল অবস্থাটি তুলে ধরেনি। মনে রাখা দরকার, ‘ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ এবং ‘মাইগ্রেশন’ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের হিন্দুদের ভারতে মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে পুশ ফ্যাক্টর কাজ করে বেশি। এটি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স নয়। এখানে তিনি একটি বড় ঝামেলা পাকিয়েছেন, এবং প্রত্যয়গত অর্থেও তাকে ডিফেন্ড করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আরেকটি ব্যাপার আমি লক্ষ করেছি, তা হলো—ট্রাম্প যখন জানতে চাইলেন কারা এটি করছে, প্রিয়া উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এবং যত দোষ নন্দ ঘোষ স্টাইলে ‘মুসলিম ফান্ডামেন্টালিস্ট’দের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে এ যাত্রা রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মোটামুটি প্রিয়া হিন্দুদের ওপর যে প্রকৃত অত্যাচারটি চলে বাংলাদেশে, সেটি বলতে পারেননি। যদিও তার ইন্টেন্টটি সম্ভবত তাই ছিল; বরং এই কাজটি তাকে তো বটেই, বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে আরেকবার লেবেলিংয়ের সম্মুখীন করেছে।
আমার আজকের লেখাটি প্রিয়া সাহা সঠিক না ‘বেঠিক’ সে বিষয়ে নয়। আমি তার বক্তব্যের এসেন্স বা স্পিরিট নিয়ে আলোচনার পক্ষে। সঙ্গে দুয়েকটি অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোকপাত করবো। প্রিয়ার বক্তব্যের প্রত্যয়গত যে সমস্যা আছে, সেটি বাদ দিয়ে যদি স্পিরিটের কথাটি বিবেচনায় নেই, তাহলেও কি আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে মাইনরিটি অপ্রেশান নেই? আমার মনে হয়েছে আমরা অনেকেই প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে বাংলাদেশের এই অবজেক্টিভ পরিস্থিতিকে অস্বীকার করছি। মানুষ মাত্রেই নিজেকে ‘ভালো’ ভাবতে পছন্দ করে, এবং এ কারণে প্রথম সুযোগেই তার সম্পর্কে যেকোনও নেগেটিভ ধারণাকে সে নস্যাৎ করতে চায়। এ থেকেই অস্বীকার বা ‘ডিনায়ালের সংস্কৃতি’ চালু হয়। এটিই ঘটছে বর্তমান বাংলাদেশে। ভাবটা এরকম, আমরা এদেশে হিন্দু-মুসলমান সবাই পরম শান্তিতে বসবাস করছি; এদেশে রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাতক্ষীরা, ভোলা এসব শুধুই জায়গার নাম, অন্য কিছু নয়।
প্রিয়া সাহার ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আমার সুযোগ হয়েছে এ বিষয়ে আমাদের মন এবং মননকে উপলব্ধি করার। আমি দেখলাম প্রিয়া সাহার কাজের জন্য আক্রান্ত হয়েছেন তার স্বামী মলয় সাহা। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাদের মেয়েরা কীভাবে আমেরিকায় পড়াশোনা করে, সে বিষয়ে কঠিন মতামত এসেছে। ভালো কথা; মলয় যদি দুর্নীতিবাজ হয়েই থাকেন, তবে এ বিষয়ে দুদকে অভিযোগ করাই বাঞ্ছনীয় ছিল না? যারা আজ মলয়ের বিরুদ্ধে বলছেন, তারা প্রিয়ার ট্রাম্পের কাছে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন কেন? এর সঙ্গে আরও মর্মান্তিক হলো, প্রিয়ার দুই মেয়ের ছবিসহ তার পরিবারের সবার ছবি ছাপিয়ে দেওয়া। একইসঙ্গে মলয় এবং প্রিয়াকে একই ফ্রেমে ট্রল করে ‘রাজাকার’ আখ্যায়িত করা। আমি আরও শুনেছি, তার বাড়ির গেট ভেঙে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের পরও এই যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এগুলো থেকে বুঝতে পারি, যেকোনোভাবেই হোক না কেন, মাইনরিটিদের পক্ষে কথা বলার বিপদ অনেক। সেটি ভুল বা সঠিক যাই হোক না কেন। আমার নিজের ধারণা, প্রিয়া এ মুহূর্তে অবশ্যই ঢাকা শহরে নিরাপদ নন।
প্রিয়ার কাছে আমার ব্যক্তিগত একটি ঋণ আছে। সেটি হলো, এই ঘটনাটি না ঘটলে আমি বুঝতে পারতাম না, আমার মাতৃভূমির বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন, বাংলাদেশে সেই অর্থে সংখ্যালঘু নির্যাতন নেই। আমার বন্ধুরা প্রায় সবাই প্রিয়ার সংখ্যাটি (৩.৭ মিলিয়ন) নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। তাতেও আপত্তি ছিল না, কিন্তু আমি একপর্যায়ে দেখলাম, এ বিষয়টির সঙ্গে দেশে এবং বিদেশে বসবাসরত সব হিন্দু এবং ভারত বিষয়টি চলে এসেছে। আমার প্রিয় মানুষেরা যাদের অনেককেই আমি নিজ নিজ ক্ষেত্রে পণ্ডিত মনে করি, তারাও দেখলাম এ ধারার বাইরে নন। সবাই প্রিয়ার কাজটি নিয়ে কথা বলছেন, কিন্তু তার বক্তব্যের এসেন্সটি নিয়ে তারা আলোকপাত করতে নারাজ। আমি আগেই বলেছি, প্রিয়ার দেওয়া সংখ্যাটি মনে হয় অতিরঞ্জন, এবং তার ‘ডিসেঅ্যাপিয়ারেন্স’ শব্দটি সঠিক নির্বাচন নয়। শেষের অংশটুকু প্রিয়া নিজেও স্বীকার করেছেন। আমার ধারণা, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় নিলে হিন্দুদের একটি বিশাল অংশকে খুঁজে পাওয়া যায় না সেন্সাসে। এই অর্থে তিনি ‘ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। প্রিয়া যে সংখ্যা বলেছেন, সেটি সঠিক নয়। কিন্তু সেন্সাসগুলো তুলনা করলে আনুপাতিক যে চিত্রটি পাওয়া যায়, সেখানে হিন্দুদের ক্রমাগত কমে যাওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার।
বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্য ছাড়াও বাংলাদেশের মাইনরিটি বিষয়ক আলোচনায় দেশের বাইরের রিপোর্টগুলো কী বলে, তা একবার দেখা দরকার। পিউজ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিবছর ‘গ্লোবাল রিলিজিয়াস ফিউচার প্রজেক্ট’ নামে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় অবস্থা তুলে ধরে। ২০১৬ সালের অবস্থাটি এখানে আলোচনা করা যায়। এখানে দেখা যাচ্ছে, সারা পৃথিবীর ধর্মভিত্তিক সোশ্যাল হস্টিলিটি ইন্ডেক্সের গড় মিডিয়ান স্কোর যেখানে ১.৮, বাংলাদেশের সেখানে এটি ৭.৬। এ সংখ্যাটি ২০১৪ এবং ২০১৫-তে ছিল ৫.৮ এবং ৫.৬। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, গড়ে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক সামাজিক হিংস্রতা (হস্টিলিটি) অনেক বেশি পৃথিবীর অন্য অনেক দেশ থেকে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে এটি বেড়েছে। এই একই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ধর্মভিত্তিক হেইট ক্রাইম ২০১০-এ সবচেয়ে বেশি ছিল, যা ২০১১-তে বেশ কমে গিয়েছিল, কিন্তু ২০১২-১৪ সাল নাগাদ আবার এটি বেড়ে গিয়েছিল অনেকটাই।
ক্যাটো ইনস্টিটিউট নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর রিপোর্ট দেয় প্রতিবছর। এদের রিপোর্ট থেকে যা জানা যায়, সেটিও খুব ভালো খবর নয় বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা অনেকটাই কমে গেছে ২০১৬, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালের তুলনায়। হ্যারাসমেন্ট এবং ফিজিক্যাল হস্টিলিটি ইনডেক্সের অবস্থাও ভালো নয় সাম্প্রতিক সময়ে। এছাড়া বিবিএসের ২০১১ পর্যন্ত সেন্সাসে যে আনুপাতিক অবস্থা দেখা যায়, তাতেও এ জনগোষ্ঠীটি মোটামুটি কমের দিকে। আমি একটি গবেষণার সঙ্গে জড়িত। সেখান থেকে কিছু প্রাথমিক ফাইন্ডিংস শেয়ার করা যেতে পারে এখানে। ফোরকাস্ট টেকনিক ব্যবহার করে এটি দেখানো সম্ভব, বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রবৃদ্ধি মোটামুটি নেগেটিভ হবে ২০৫১ সাল নাগাদ। আরেকটি ফোরকাস্ট থেকে এ সিদ্ধান্ত করা যায়, ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ হিন্দু (উচ্চতর মানদণ্ডে এটি ১৩শ’র কিছু বেশি) দেশ ত্যাগ করবেন প্রতিদিন। এ ধরনের ফোরকাস্ট যদিও অনেকটাই স্থূল উপাত্ত নিয়ে কাজ করে এবং সব প্রভাবককে বর্তমান সময়ের আঙ্গিকে স্থির ধরে নেয়, তবুও এগুলো আমাদের পলিসি প্রণেতাদের সাহায্য করতে পারে অবস্থা মূল্যায়নের জন্য। প্রিয়ার কাজের এসেন্সটিকে বিবেচনায় নিলে আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষের মঙ্গল হবে মনে করি।
এবার অন্য একটি বিষয়ে আলোকপাত করবো। প্রিয়ার ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আমি ধর্মের ভিত্তিতে আমাদের বিভাজনটি স্পষ্ট হতে দেখেছি। যারাই প্রিয়ার বক্তব্যের স্পিরিটটিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন, তাদের মোটামুটিভাবে আক্রান্ত হতে হয়েছে বিভিন্ন ধরনের কুৎসিত মন্তব্যের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের লেখার কমেন্ট থ্রেডগুলো বিশ্লেষণ করলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। আমি নিজে আক্রান্ত হয়েছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ায়। উদাহরণ দেই। আমার একটি প্রশ্ন ছিল, হিউম্যান রাইটস রিপোর্টগুলো বাংলাদেশে মাইনরিটিদের অবস্থা নিয়ে কী বলে। এই বক্তব্যের সূত্র ধরে একজন মন্তব্য দিলো—‘হিন্দুদের মধ্যে আমার মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষ থেকে আরম্ভ করে নাপিত, ধোপা সবাই নাকি পড়শির (ভারতের) প্রেমে মুগ্ধ থাকি নিজ দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে’। এ মন্তব্যটির কোনও প্রতিবাদ হয়নি। এ ধরনের মন্তব্য আমার দেশ ছেড়ে যেতে অস্বীকার করা পিতামহকে শুনতে হয়েছে; সারা জীবন সৎভাবে সরকারি চাকরি করা আমার পিতাকে শুনতে হয়েছে; অতঃপর আমাকেও শুনতে হয়েছে বিভিন্ন উপলক্ষে। আমার ধারণা আমার মার্কিন দেশে জন্ম নেওয়া পুত্র যদি কখনও তার পূর্বপুরুষের দেশে ফিরে যায়, তবে তাকেও এটি শুনতে হবে। সংখ্যালঘু হয়ে জন্ম নেওয়া আমার আজন্ম পাপ।
ওই যোগাযোগমাধ্যমের কমেন্ট থ্রেডে আমি দুঃখের সঙ্গে অনুভব করলাম, আমাকে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট নিতে হচ্ছে একজন আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক মানুষের কাছ থেকে। বেদনার সঙ্গে আবারো লক্ষ করলাম, আমার আইডেন্টিটি অনেকটাই ‘হিন্দু ভারতের’ সঙ্গে ট্যাগড। আমি যতই বাংলাদেশ এবং বাঙালি আইডেন্টিটি আঁকড়ে ধরতে চাই না কেন, আমি যে হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়েছিলাম, এবং এই কারণেই আমার ‘হিন্দু’ লেবেলটিই এদেশে আমার আসল আইডেন্টিটির ধারক এবং প্রকাশক, এই কঠিন বাস্তবতাটি আমাকে মেনে নিতে হয়েছে। আবারও উদাহরণ দেই। আমার ছোটবেলার এক বন্ধু এখন উত্তরবঙ্গের একটি জেলা শহরে একজন রাজনৈতিক নেতা, যার আদর্শ আমার একেবারেই বিপরীত, কিন্তু আমার কখনও তাকে সাম্প্রদায়িক মনে হয়নি আগে। ওকে আমি এবার আবিষ্কার করলাম ভিন্ন রূপে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই আমাদের যে চিন্তার বিনিময়টি ঘটলো, সেখানেই সে আমাকে যা জানালো তা এরকম—
১. প্রিয়া সাহাকে আমি সমর্থন করবোই, কারণ আমরা দু’জনেই হিন্দু;
২. কোনও রেফারেন্স ছাড়াই সে জানালো, প্রিয়া সাহার ঘটনা আসলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ষড়যন্ত্র; এ ষড়যন্ত্রের পেছনে আছে ভারত, এবং যেহেতু ভারত আছে, কাজেই এ ষড়যন্ত্রটির খবর বাংলাদেশের হিন্দুরা সবাই মোটামুটি অবগত ছিল;
৩. ভারতে মুসলমানদের চেয়ে বাংলাদেশের হিন্দুরা জামাই আদরে আছে;
৪. যেহেতু তারা জামাই আদরে আছে, কাজেই দুই চারটা এদিক সেদিক ঘটনার বা চড় চাপড়ের জন্য এত হাউকাউ করার কী আছে?;
৫. বাংলাদেশে বড় বড় পজিশনে হিন্দুরা আছে, কাজেই তারা খুবই ভালো আছে;
৬. অন্তত ৭০% হিন্দু বাংলাদেশে রোজগার করা টাকা দিয়ে ভারতে বাড়ি করে।
এই যে ধারণাগুলো এখানে দিলাম এর পক্ষে-বিপক্ষে বলার কিছুই নেই আমার। শুধু একটি কথার জবাব জানতে চাই আমি। বাংলাদেশ থেকে রোজগার করা অর্থ দিয়ে আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এসব দেশে বাড়ি করলে তা নিয়ে আমরা এতসব কথা বলি কি? যদি না বলি তাহলে এটি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। মোটা দাগে যা বোঝা গেলো তা হলো, বাংলাদেশের একটি বিরাট সংখ্যার মানুষ হিন্দুদের শুধুই হিন্দু মনে করে, নিজেদের ঘরের মানুষ নয়।
আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য ছিল প্রিয়া সাহার বক্তব্যের সূত্র ধরে সম্পূরক কিছু কথা বলা, যেগুলো নিয়ে একটি সুস্থ আলোচনা হওয়া উচিত। যা যা বলা হয়েছে এখানে সেগুলো কোনোভাবেই আমার মাতৃভূমির সংখ্যাগরিষ্ঠ ভালো মানুষদের ছোট করার জন্য নয়। আমি বেড়ে উঠেছিলাম পুরোপুরি আমার ‘চাচা’, ‘চাচি’, ‘খালা’, ‘খালু’ এদের স্নেহের পরশে, এদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে। এ এক কঠিন ঋণ। আমাদের ছোটবেলায় সরকারি কর্মকর্তা আবাসের সব চাচা, চাচিদের সালাম করে ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষা, ম্যাট্রিক পরীক্ষা, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। তাদের দোয়া আজও আমার সঙ্গে আছে বলেই মনে করি। আমাদের গ্রামের বাড়িতে সদাহাস্যময়ী এক মায়ের কথা মনে পড়ে, যিনি আমার ঠাকুরমার ‘ধর্ম মা’ ছিলেন, এবং আমরা ভাইবোনেরা সে কারণে তাকে মা ডাকতাম। আজো আমার সেই মায়ের কথা মনে পড়ে। এই মার্কিন মুলুকে যে মানুষটি আমার সব সময়ের শুভাকাঙ্ক্ষী, তিনিও নামে তো মুসলমান বটেই। যখন এসব ভাবি, তখন মনে হয়, কিসের সংখ্যালঘু, কিসের হিন্দু, কিসের কী! কিন্তু এ সত্যের সমান্তরাল সত্যটিও যে আছে। এই সমান্তরাল সত্যটির কথাই আজ বললাম, যেগুলো নতুন কোনও কথা নয়; তবুও বললাম, কারণ সত্য কঠিন হলেও পবিত্র। সে কখনো করে না বঞ্চনা।
লেখক: শিক্ষক, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি (নর্থ ক্যারোলিনা)

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ