বিশ্বে শান্তিবাদীদের ভবিষ্যৎ

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:০২, আগস্ট ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৩, আগস্ট ২৭, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, হানাহানির পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে ইদানীং প্রশ্ন জাগছে, পৃথিবীতে শান্তি গবেষক (peace researcher) বা শান্তিবাদীরা কি তাদের গুরুত্ব ও প্রভাব হারাচ্ছেন?  বিগত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি শাখা হিসেবে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব সংঘাত নিরসনে শান্তি গবেষণা আমাদের আলোড়িত করেছিল। শান্তিবাদীরা তাদের লেখার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাষ্ট্রের মধ্যস্থিত বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব নিরসনে জোর দিতেন। এর মাধ্যমে শান্তিকামী মানুষদের প্রভাবিত করতে চাইতেন।
সেসব দিন বোধহয় এখন গত হয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদী রাজনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞদের লেখালেখিকে এখন প্রভাবিত করছে। দেশে দেশে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় বলা যায় বাজপাখি বা hawk-দের উত্থান বিপদে ফেলেছে শান্তিবাদী ঘুঘু বা dove-দের। লেখালেখির রাজনীতিতেও তারা ক্রমান্বয়ে হয়ে পড়ছেন ব্রাত্য!
শান্তি গবেষকদের পুরোধা হিসেবে সম্প্রতি নরওয়েজিয়ান বংশোদ্ভূত সমাজবিজ্ঞানী, গণিতবিদ জোহান গালতুং-এর কথা বলতে হয়। দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নিরসনে তার ধারণা, তত্ত্ব এবং পৃথিবীর  বিভিন্ন স্থানে প্রায় দেড়শ’র বেশি সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার অভিজ্ঞতায় শান্তিকামীরা হয়েছিলেন আশান্বিত। তার ধারণার অনুসারীরা পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন নামে নতুন বিভাগ খুলেছেন। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এই নামে একটি বিভাগ আছে।

দুই দশক আগেও আমরা যখন তরুণ, তখন আমাদের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে শান্তি গবেষণার ব্যাপক জনপ্রিয়তা লক্ষ করেছি। সেসময় দাতাদের সাহায্যে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এরকম একটি প্রতিষ্ঠান হলো শ্রীলংকায় অবস্থিত রিজিওনাল সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (আরসিএসএস)। বিভিন্ন ওয়ার্কশপের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ গবেষকদের সেখানে একত্রিত করা হতো এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

শান্তি গবেষণার এ ধারণা আমাকেও ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করেছিল। এখনও লেখালেখিতে আমি এ পদ্ধতি মেনে চলতে চেষ্টা করি। উদাহরণস্বরূপ অপরকে বিনা কারণে আক্রমণ না করার নীতি বা সমস্যার অতীত নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দেওয়া ইত্যাদি। সম্ভবত ২০০১ সালে আমি এ ধরনের একটি ওয়ার্কশপে শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার বৃত্তি পেয়েছিলাম। যদিও পারিবারিক কারণে যেতে পারিনি। তবে শুনেছি তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য যেসব কর্মসূচি নিতেন, তা এক কথায় অভাবনীয়। যেমন দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীদের হোটেলে রুম শেয়ার করে থাকতে হতো, যাতে বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর গবেষকদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়! 

সংক্ষেপে বলতে গেলে শান্তি গবেষকরা ট্র্যাক টু ডিপ্লোম্যাসি বা জনগণের মধ্যে যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।  শ্রীলঙ্কায় প্রতিষ্ঠানটি এখনও আছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অনেক আগেই যে এ প্রতিষ্ঠানটি তার গুরুত্ব হারিয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমি বর্তমান পৃথিবীর বিভিন্ন দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানতে যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর গ্লোবাল কনফ্লিক্ট ট্র্যাকার দেখছিলাম। এ প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ত্রিশটি কনফ্লিক্ট বা সংঘর্ষ বা দ্বন্দ্বের কথা জানাচ্ছে। বিশ্বে বর্তমানে প্রকৃত দ্বন্দ্বের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হবে। যাহোক যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বগুলোকে জটিল, মোটামুটি আর কম এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। জটিলগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, উত্তর কোরিয়ার সংকট, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি।

মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণের মধ্যে রয়েছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইরাকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন দ্বন্দ্ব, ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপেক্ষাকৃত কম স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইয়েমেনের যুদ্ধ, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট ইতাদি।                      

যদিও এই বিভাজন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ভিত্তিতে, কিন্তু পুরো তালিকা আমাদের এ ধারণা দেয়, বর্তমান বিশ্বের এক বড় অংশই আজ যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, সংঘাতে জর্জরিত।

বিশ্বের যে কোনও অঞ্চলেই হোক না কেন, শান্তির অনুপস্থিতির প্রধান শিকার কিন্তু সাধারণ জনগণ। যুদ্ধ, সীমাহীন অস্ত্রব্যয় কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। গত কয়েক দশকে বিভিন্ন যুদ্ধে মারা গিয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮ সালে এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ৯/১১-এর পরে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাক, পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে মারা গেছেন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ, এর অর্ধেকই সাধারণ নিরীহ মানুষ। সিরিয়ার যুদ্ধে আরও পাঁচ লাখ। তবে সবক্ষেত্রেই প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। আর যদি লিবিয়া, ইয়েমেনসহ সাম্প্রতিক সব যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করা যায় তাহলে এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমেয়।

শান্তিবাদীরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত নিরসনে কথা বলেন এবং সব পক্ষের জন্যই একটি win-win situation তৈরির ওপর জোর দেন।  আমরা দেখছি বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্বের মূল কারণ হচ্ছে জাতিগত, ধর্মীয়, গোষ্ঠীগত বা বর্ণগত বিদ্বেষ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতরণের মূল কারণ স্রেফ তাদের ধর্ম। মাত্র কয়েক বছর আগে আমরা তাই দেখেছি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সংলাপ বা dialogue among civilizations-এর ওপর গুরুত্বারোপ। স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের clash of civilizations তত্ত্বের বিপরীতে—যেখানে তিনি বিভিন্ন সভ্যতার সংঘাতের আশঙ্কা দেখেছিলেন, শান্তিবাদীরা বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সেসব দিনও এখন গত হয়েছে।

যে কথা না বললেই নয়, শান্তিবাদীরা সংঘর্ষের উৎপত্তি খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষের সূচনা হয়, কিন্তু শিশু বয়সের টেক্সট বুক বা পাঠ্যবই থেকে। তাই তারা স্কুলের পাঠ্যবই থেকেই জাতিগত ও সম্প্রদায়গত শান্তি ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিতে বলেন।   

মিডিয়ার কথা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শান্তির বার্তা ছড়ানোর পরিবর্তে মিডিয়া তো এখন স্ব স্ব দেশের extension of foreign ministry বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্ধিতাংশ হিসেবে কাজ করে। আমরা দেখেছি কীভাবে পশ্চিমা মিডিয়া ইরাক যুদ্ধকে বৈধতা দিয়েছিল। এ শিক্ষা থেকে আমরা বলতে পারি, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শান্তি সাংবাদিকতা বা peace journalism এর কোনও বিকল্প নেই।

এতক্ষণ যা বললাম এর অর্থ এই নয়, বিশ্বে শান্তিবাদীদের আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই। অবশ্যই আছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আছে। যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মিডিয়া দেখি বা সোশ্যাল মিডিয়ার সাধারণ মানুষের বক্তব্য দেখি, তখন টের পাই পৃথিবীতে পারস্পরিক ঘৃণার পাহাড় কীভাবে বাড়ছে। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তো এ পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে। গবেষক, সাংবাদিক, লেখকদের তাই শান্তির বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, যা ধীরে ধীরে রাজনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে।

শান্তি গবেষণার একজন অনুরক্ত হিসেবে আমরা এর চেয়ে আর কীই-বা প্রত্যাশা করতে পারি! 

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ