রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ভিজিবিলিটি ক্রাইসিস

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৭:৪৭, আগস্ট ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫২, আগস্ট ২৮, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবাংলাদেশ থেকে একদল রোহিঙ্গার গত ২২ আগস্ট নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার খবরে সরকারের ভেতরে এক ধরনের চাঞ্চল্য লক্ষ করি আমরা। ভাবটা এমন ছিল যে, এখানে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছরের মাথায় এসে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া শুরু হচ্ছে। কিন্তু আমরা জানতাম, একজন রোহিঙ্গাও যেতে রাজি হবে না। তা হয়নি। যে সংস্থাগুলো ক্যাম্পগুলোয় কাজ করে, তাদের দিক থেকেও আমরা আভাস পাচ্ছিলাম যে, এই উদ্যোগ সফল হবে না। 
তাহলে বাংলাদেশ সরকার কেন এতটা উৎসাহী হয়ে গেলো বা নিশ্চিত হলো যে, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরত যাবে? প্রশ্ন হলো, রোহিঙ্গাদের এই দ্বিতীয় দফা যাওয়ার তারিখই বা কে ঘোষণা করেছিল? উত্তর পাওয়া গেলো এই তারিখ এসেছে মিয়ানমারের দিক থেকে এবং সেটি প্রচার করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অর্থাৎ এই তারিখ নির্ধারণে বাংলাদেশের ভূমিকা ছিল কেবল গ্রহণ করা। মিয়ানমার শুরু থেকেই এই কাজটা করছে। তারা বলটি বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়ে ফায়দা লুটছে। 
২৫ আগস্ট, এবারের রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর পূর্তির দিন রোহিঙ্গারা এক বিশাল সমাবেশ করেছে। যে বাংলাদেশ তাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে, সেই বাংলাদেশকেই হুমকি দিয়ে বলেছে, একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ছাড়া তারা কখনোই ফিরবে না। মিয়ানমার বাহিনীর হামলার বিরুদ্ধে যারা টু-শব্দটি উচ্চারণ না করে পালিয়ে এসেছিল, তারা আজ সংগঠিত হয়ে আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞসূচক একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। সাড়ে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার কারণে উখিয়া-টেকনাফের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ স্থানীয় বাসিন্দা বেশ আগেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। তাদের জীবন-জীবিকা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও পর্যটনশিল্প—সবই আজ হুমকিতে। এমন প্রেক্ষাপটে দাবি-দাওয়া নিয়ে এ দেশেই রোহিঙ্গাদের সংগঠিত হয়ে ওঠা দুশ্চিন্তার বিষয়। 

শিক্ষা নেই, দীক্ষা নেই, অথচ এই রোহিঙ্গাদের ইংরেজিতে লেখা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার আর টি-শার্ট কারা দিলো? রোহিঙ্গা সমাবেশটি কীভাবে এবং কার ইশারায় আয়োজন করা হয়েছে—সবার আগে সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এত এত রোহিঙ্গা বাংলাদেশের নাগরিক না হয়েও কী করে সিম কার্ড পেলো—সেটিও এক বড় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাজনিত ব্যর্থতা ও দুর্নীতিকে নির্দেশ করে।  

দু’বছরের মাথায় এসে বাংলাদেশের বডি ল্যাংগুয়েজে একটা পরিবর্তন লক্ষণীয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, বাংলাদেশ এবার কঠোর হবে। এই কঠোরতার বার্তা দেওয়া মানেই হলো এতদিন বাংলাদেশ তাহলে নরম ছিল? কূটনীতির পরিসরে বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে কতটুকু সাড়া পাচ্ছে বা পেয়েছে আমরা জানি না, তবে এসময় সবচেয়ে উষ্ণ সম্পর্ক রেখেও চীন বা ভারত থেকে কাঙ্ক্ষিত সমর্থন বলতে গেলে মিয়ানমারের দিকেই গেছে। 

অনেকেই বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক অ্যারেঞ্জেমেন্টের নামে যে চুক্তিটি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ বিশ্ব সম্প্রদায়কে বিস্মিত করেছে। এখন যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, সমস্যাটি বৈশ্বিক, তখন বলতেই হয়, যেকোনও ধরনের চুক্তি বহুপাক্ষিক হওয়াই দরকার ছিল। 

রোহিঙ্গারা রাখাইনের আশ্রয়কেন্দ্রে নয়, নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে চায়। ভারত আর চীন রাখাইনে বানিয়েছে ক্যাম্প আশ্রয়কেন্দ্র। তাই তাদের ভয়, আশ্রয়কেন্দ্র নামের বন্দিখানায় তাদের নিয়ে যাওয়া হবে। ফিরে যাওয়ার পর নিজেদের দেশে চলাফেরার স্বাধীনতা আর জাতিসত্তার স্বীকৃতিসহ নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা চায় তারা। পাঁচটি দাবির একটি তালিকা সংবলিত লিফলেট গত দু’দিন ধরে ক্যাম্পগুলোতে প্রচার করছে ‘ভয়েস অব রোহিঙ্গা’ নামের একটি সংগঠন। তাদের দাবিগুলো হলো– 

১. রোহিঙ্গারা আরাকানের স্থানীয় আদিবাসী এবং সে জন্য তাদের ন্যাটিভ স্ট্যাটাস বা স্থানীয় মর্যাদা সংসদে আইন করে পুনর্বহাল করতে হবে যার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি থাকতে হবে। 

২. নাগরিকত্ব: অর্থাৎ আরাকান রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ‘সিটিজেন কার্ড’ দিতে হবে।

৩. প্রত্যাবাসন: রোহিঙ্গাদের তাদের নিজস্ব গ্রামে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমিজমা যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দিতে হবে। 

৪. নিরাপত্তা: আরাকানে রোহিঙ্গাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য রোহিঙ্গা পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। 

৫. জবাবদিহিতা: মিয়ানমারের স্থানীয় আদালতের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির মতো কোনও ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালে অপরাধীদের বিচার করতে হবে। নাগরিকত্ব ও স্থানীয় হিসেবে মর্যাদা না পেলে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরলে সেই আগের মতোই নির্যাতন নিপীড়নের মুখে পড়তে হবে।

এই যদি হয় বাস্তবিক অবস্থা তাহলে প্রত্যাবাসন আসলে দূরের শোনা গল্প। তারা মিয়ানমারে ছিল এবং সেখানে তারা ফেরত যাবে। তারা কোন মর্যাদায় ফেরত যাবে সেটা কি বাংলাদেশের মাথাব্যথা হতে পারে? অথচ সেটাই রোহিঙ্গারা বলছে। সঙ্গে বলছে কিছু সংস্থাও।  

বাংলাদেশ গত দুই বছরে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দিকটিতে ভালো ভূমিকা রেখেছে। বিপন্ন বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সংকটের ভূ-রাজনৈতিক বিষয়টিতে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান দেখা যায়নি। আর এ সংকটের স্থায়ী সমাধানও নিহিত আছে ভূ-রাজনৈতিক দিকটিতে জোরালো অবস্থানের মধ্য দিয়েই। কমিউনিকেশনের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে বাংলাদেশের অবস্থানের একটা ‘ভিজিবিলিটি’ ক্রাইসিস আছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ তার মূল বক্তব্য খুব সহজ করে, সমন্বয়ের সঙ্গে তুলে ধরতে পেরেছি কি? আমরা যে এত করছি, আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো যে আজ রোহিঙ্গাদের কারণে ঝুঁকির মুখে, তা কি একসুরে বলতে পেরেছি বিশ্ববাসীর কাছে?  

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের অভিমত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা সবাই বলছে। কিন্তু সেই অভিমতটা কেন দাতা সংস্থা বা এনজিও কেন সাক্ষাৎকার নেওয়ার নামে নেবে বা নিতে দেওয়া হবে? সময় এসেছে একটা সমন্বয়ের মাধমে কাজ করা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর পররাষ্ট্র দফতরের বক্তব্য যেন একই রকম হয়। একটা টাস্কফোর্স গঠনের কথা চিন্তা করা হোক যেন সমন্বয় সমন্বয়ের মতোই হয়। প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রোহিঙ্গা ডেস্ক চালু করা হোক। 

আমরা দেখছি আশ্রিতদের নিয়ে কাজ করা কিছু এনজিও ও সংস্থার ব্যাপারে একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে সরকারের ভেতর-বাইরেসহ সামাজিক পরিসরে। নানা ধরনের কড়া সমালোচনাও হচ্ছে, দোষারোপ চলছে। নিজেদের ভেতরকার এই অবস্থার ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে সুবিধা নেবে রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম দেওয়া মিয়ানমারই। সংকট সমাধানে একটি জাতীয় সংহত অবস্থান তৈরি করাই এখন আমাদের কাজ। সুসংহত জাতীয় অবস্থানের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে সক্রিয় করা সম্ভব হবে। 

বাংলাদেশের মানুষ আর বিশ্ববাসী যেন একই বার্তা পায় এই সংকটে। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম মাঝে মাঝে টুইট করেন নানা ইস্যুতে। সেগুলো তার ব্যক্তিগত টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে যায়। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব টুইট কোথায়? বাংলাদেশের একটা ফেস লিফটিং প্রয়োজন। বিশ্ববাসীকে বোঝানো হোক, মিয়ানমারকে বোঝানো হোক–এতদিন যে মুখ দেখেছে সবাই বাংলাদেশের তার বাইরে অন্য চেহারাও আছে যদি সবাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সক্রিয় সহযোগিতা না করে।  

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ