আবারও র‍্যাংকিং বিতর্ক

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:৫৬, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৭, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামআবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুপস্থিতি দেশের সবাইকে শোকাহত করেছে। যুক্তরাজ্যের গবেষণা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের ২০২০ সালের র‍্যাংকিংয়ে ভারতের ৩৬টি ও পাকিস্তানের ৭টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বিশ্বের ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পায়নি বাংলাদেশের কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম। বিশ্বের সেরা ১ হাজার ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এসেছে। তাও ১০০০-এর পরের তালিকায়। এছাড়া, দেশের আর কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হয়নি এই র‍্যাংকিংয়ে। র‍্যাংকিংয়ের প্রথম স্থানটি দখল করেছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো—২০১৬ সাল থেকে র‍্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমাবনতি ঘটছে। তালিকায় যেহেতু দেশের আর কোনও বিশ্ববিদ্যালয় নেই, তাই অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিংয়ে আগের বছরের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনাও অর্থহীন।
যারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মোটামুটি খবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, যেসব সূচকের মাধ্যমে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং করছে—শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণা, সাইটেশন বা গবেষণার উদ্ধৃতি, গবেষণা ও শিল্পখাত থেকে আয়, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি, এসব ক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাতারাতি উন্নয়ন ঘটা সম্ভব নয়। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিংয়ে উন্নয়ন মোটামুটি অসম্ভব একটি ব্যাপার। এই সূচকগুলো কীভাবে পরিমাপ হয়, সেটা পড়লে বোঝা যায়, এসবে ভালো করে ওপরের দিকে উঠে আসা বেশ কঠিন। গবেষণা, গবেষণা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। 

এমনকী শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে গবেষণার—এই এক সূচকেই দেখা হচ্ছে ভাবমূর্তি জরিপ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, ডক্টরেট ও আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের অনুপাত, শিক্ষক ও কতজন শিক্ষার্থী ডক্টরেট পাচ্ছেন, সেই অনুপাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক আয়। এই সূচকেই বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই অনেক পেছনে পড়বে। বাকি সূচকগুলোর কথা আর নাইবা বললাম।           

গত ১ সেপ্টেম্বর অন্য একটি পত্রিকায় আমি দেশে উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ বিষয়ক একটি লেখায় বলেছিলাম যে, আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ চাই, তাহলে আমাদের আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুনই মেনে চলতে হবে। পৃথিবীব্যাপী উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক প্রবণতা হচ্ছে বহুত্ববাদ, বহু সংস্কৃতির ওপর জোর দেওয়া এবং বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা। সেইসঙ্গে সর্বক্ষেত্রে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপরে পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগাযোগ। মোদ্দা কথা হলো—যদি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করতে চাই, র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি চাই, তাহলে পৃথিবীর ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে চলছে, সেই রীতিনীতি মেনে চলতে হবে। আর যদি মনে করি, না আমরা নিজেদের মতো করে চলবো, তাহলে প্রতিবছর র‍্যাংকিং নিয়ে হা-হুতাশ বন্ধ করতে হবে! 

আমরা যদি চাই, প্রাইভেট, পাবলিকসহ  সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষা ও গবেষণার সংস্কৃতির উন্নয়ন, তাহলে প্রথমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আরও দুয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোর পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরেট গবেষকদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। একটি বিভাগে যদি এরকম কয়েকজন গবেষক থাকেন, তাহলে নিয়মিত সেমিনার বা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারিত হবে। তারাও পড়ালেখা ও গবেষণায় আকৃষ্ট হবেন।

আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রয়োজনীয় সংখ্যক পিএইচডি শিক্ষক নেই। আসলে শিক্ষকতা বা গবেষণা পেশায় এসে অনেকেই পিএইচডি করা নিয়ে বিপদে পড়েন। বিদেশে সব বিভাগের সবার পক্ষে ফান্ড জোগাড় করা কঠিন। আবার অনেকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে বিদেশে থাকতেও চান না। তারা যে দেশে পিএইচডি করবেন, তাও সম্ভব হয় না। কারণ, দেশের অনেক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।                 

শিক্ষকদের মধ্যে প্রায়শই একটি ক্ষোভ দেখি তাহলো আমলারা বিদেশে পিএইচডি গবেষণার ফান্ড পেলেও তারা পান না। অথচ একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি সরকারি টাকায় বিদেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান, তাহলে তিনি দেশে আরও কয়েকজন পিএইচডি গবেষক সুপারভাইজ করতে পারবেন। অন্তত এই শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরকারি ফান্ড দেওয়া যেতে পারে।

সম্প্রতি একটি পত্রিকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকেন্দ্রগুলোর করুণ চিত্রের কথা আমরা জেনেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০টি গবেষণাকেন্দ্রের মধ্যে মাত্র পাঁচটি নাকি ভালোভাবে চলছে। বাকিগুলোর বেশিরভাগই শুধু নামেই আছে। অনেক কেন্দ্রের গবেষক নেই, অনেকের গবেষণা নেই। কোনোটির নাকি ঠিকানাও নেই। ফান্ডের সংকটের কথা সবাই বলেছেন। তবে এটি নিয়েও বিতর্কও হচ্ছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর বিবিসি বাংলা অনলাইনে প্রচারিত এক সংবাদে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বার্ষিক বরাদ্দ ১০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ কোটি টাকা করেছেন। কিন্তু তার অভিযোগ, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই টাকা সঠিকভাবে ব্যয় করা হচ্ছে না।

আমরা এর সঠিক কারণ না জানলেও ধারণা করতে পারি, সম্ভবত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য আর দশটি প্রতিষ্ঠানের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অর্থ ছাড়ের ব্যাপারে একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কিন্ত এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বহুল প্রত্যাশিত র‍্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

একই কথা বলা যেতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে। গবেষণা ফান্ডগুলো যেন বাইরের প্রতিষ্ঠান বা দাতা সংস্থা থেকে সহজে অর্থ এনে গবেষণা করতে পারে বা গবেষক নিয়োগ দিতে পারে, সেই নিয়মনীতিগুলো শিথিল করা উচিত—আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেন এসব ক্ষেত্র প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় কিন্তু র‍্যাংকিংয়ের অন্যতম সূচক। সুতরাং ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। 

আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশালত্ব বা শিক্ষকদের মানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক এগিয়ে থাকলেও বিআইডিএস-এর এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়—দেশের চাকরির বাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এগিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা। এর একটি অন্যতম কারণ হিসাবে তারা জানাচ্ছেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানাভাবে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। জব ফেয়ার বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তাদের গেস্ট স্পিকার হিসেবে নিয়ে আসে। ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থাও করে। সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় না হলেও বড় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন ব্যবস্থা করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ ধরনের তৎপরতা কম বলে তারা জানান। গ্রাজুয়েটদের চাকরিপ্রাপ্তি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির অন্যতম উপায় যা র‍্যাংকিংকে অনেকাংশেই প্রভাবিত করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এদিকে নজর দিতে হবে।

তবে যে কথাটি না বললেই নয় বা যেটি আগেই বলা উচিত ছিল, তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, প্রমোশন, উন্নয়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। র‍্যাংকিংয়ের উন্নয়ন চাইলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত অযোগ্যদের বাদ দিয়ে শীর্ষপদগুলোয় মেধাবিদের নিয়োগ দিতে হবে। অভিন্ন নিয়োগের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত তরুণ শিক্ষকরা যা বলছেন, তা সরকারের শোনা উচিত। বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় গত এক দশকে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে এবং আগামী দশকগুলোয় আরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। এ পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে যেসব শিক্ষক অবহিত তাদের শিক্ষার নীতিনির্ধারণে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ