তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৬:১১, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২২, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯

লীনা পারভীনছাত্ররাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন—এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেই আমাদের মানসপটে যে ছবিটি ভেসে আসে, সেটি হচ্ছে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, শিক্ষা আন্দোলন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর গণ-আন্দোলন। দলে দলে ছাত্ররা মিছিলে মিছিলে চলছে, স্লোগান দিচ্ছে দেশমাতৃকার পক্ষে। শত্রুপক্ষের লাঠি, গুলিকে উপেক্ষা করে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আদায় করে নিচ্ছে নিজেদের দাবি।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতির আলোচনা মানেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, খুন, জঙ্গিবাদ, হুমকি, ধামকি ইত্যাদি। কেন? ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করার মিশন হাতে নিয়েছিল জেনারেল জিয়া, যিনি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পথে কেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ঝান্ডা ধরা রাজনীতিবিদরা হাঁটবে? কেন আজকে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠনটি গোটা দেশের কাছে আলোচ্য বিষয় হয়ে গেলো? এই বাংলাদেশে ছাত্রলীগের নেতা থেকে জাতির জনক হয়েছিলেন, একজন বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন। গোটা স্বাধিকার আন্দোলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অবদানকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তাই পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র আন্দোলন মানেই ছিল ছাত্রলীগের ইতিহাস। সেই ইতিহাস কেন আজকে এমনভাবে কলঙ্কিত? স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে এখনও অনেকেই সক্রিয় আছেন রাজনীতিতে। তাদের ইতিহাস আমরা বইয়ে পড়ি। তবে কেন সেই ছাত্রলীগের উত্তরসূরি হলো শোভন-রাব্বানীর ইতিহাস? বিষয়টাকে কেবল শোভন-রাব্বানীতে কেন্দ্রীভূত রাখলে রাজনীতির যে কালো অধ্যায় শুরু করেছিল ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের খুনিরা, সেটাকে বুঝা যাবে না। আর পরতে পরতে না বুঝলে সমস্যাটার গোড়াতেও যাওয়া যাবে না। এখানে শোভন বা রাব্বানী ‘ভিজিবল’ হলেও সমস্যাটা রয়েছে গোড়াতেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোকে কেউ যদি ফলো করে, তাহলেই বুঝা যাবে তিনি কোনও কিছু থেকেই দূরে নন। তিনি সব অবস্থা সম্পর্কেই অবহিত আছেন। ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে আলোচনায় তিনি উদাহরণ দিয়েছেন যুবলীগের নেতাদেরও। তার জন্মদিন পালনের উৎসব নিয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। চাঁদাবাজির টাকায় তিনি জন্মদিনের মিলাদ চান না বলে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন। এমনকি শোভন-রাব্বানীকে ‘মনস্টার’ বললেও যুবলীগের কিছু নেতাকেও সমমানের বলেছেন তিনি। এখানেই নিহিত রয়েছে ছাত্ররাজনীতির কালিমার ইতিহাস। ছাত্রনেতারা নিজে নিজে কিছু করতে পারে না। কারও না কারও আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তারা সাহস পায়। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা যদি ন্যায় ও নীতির পথে থাকেন, তাহলে ছাত্রনেতারা যারা তাদের অনুসরণ করেন, তারাও একই পথেই থাকবে। এমনটাই দেখে এসেছি আমরা। একজন বঙ্গবন্ধুকে দেখেই আজকের তোফায়েল আহমেদদের জন্ম হয়েছে।

হতাশার মাঝেও একঝলক আলো দেখতে পাই বঙ্গবন্ধু কন্যা যখন অকপটে সত্যকে সামনে নিয়ে আসেন। আবারও মাথা নত হয়ে আসে যখন তিনি প্রমাণ করে দেন কেন তিনি কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের নেতা। ভরসার জায়গাটি ধাক্কা খেতে খেতে তীর খুঁজে পায় যতদিন তিনি আছেন অন্তত অন্যায় করে কেউ পার পেয়ে যাবে না। শোভন-রাব্বানী হয়তো তার পূর্বসূরিদের দেখানো পথেই হাঁটতে চেয়েছিল। হয়তো ভেবেছিল বড় ভাইয়েরা তো আছেন পেছনে। আর আগেরজনদের যখন কোনও সমস্যা হয়নি, তাহলে আমরাও পার পেয়ে যাবো। না তেমনটা হয়নি এবার আর।

শোভন-রাব্বানীর ঘটনা আমাদের রাজনীতিতে হয়তো খুব বড় কোনও ঘটনা না বা এর আগেও ছাত্রলীগের ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির আছে এবং সেখান থেকে বাস্তবে কেউই শিক্ষা নেয়নি। হবে হয়তো। যারা শিক্ষা নেয়নি তারা অন্ধকারেই হারিয়েছে, কিন্তু এই একটি ঘটনা থেকে যদি কেবল আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ নয় অন্যদলের নেতারাও শিক্ষা নেয়, তাহলে হয়তো আমাদের রাজনীতির যে দুর্দিন চলছে সেখান থেকে কিছুটা হলেও উতরে যাওয়া সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি ‘মনস্টার’ হয়ে গেছে, তখন সাধারণ নাগরিকদের চোখে ভাসে এমন আরও কত শত মনস্টারেরা আজকের বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। হয়তো তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় সবসময়, আর ধরা খেয়ে যায় উসকানি পেয়ে নিজেকে মনস্টার ভেবে শান্তি পাওয়া পাতি নেতারা।

আশা করছি এই ঘটনার কেবল বহিষ্কারেই শেষ নয়। আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত হওয়া এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ তদন্তে নামবে আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন। শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম শপথ হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। এই শপথ যাদের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ নেওয়ার কথা, তারাই যখন সেই দুনিয়ায় পা দেয়, তখন সরকারের ভেতরে আরও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়াটাও সময়ের দাবি হয়ে যায়। আশা করছি আমাদের সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনাটিকে এখানেই থামতে দেবেন না, কারণ এমন দু’জন শোভন-রাব্বানীর পেছনে আছে শত বড় বড় শোভন রাব্বানী। এদের ধরতে পারলেই তবে সম্ভব হবে মনস্টারদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করে সচল পথে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ