অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করবো কেন?

Send
মো. মাহবুব আলম প্রদীপ
প্রকাশিত : ১১:৩৮, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৪, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

মো. মাহবুব আলম প্রদীপ বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অনুসারে বলা যায়, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নয়ন/পদোন্নতি বিধিমালা ২০১৯’ চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এরইমধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুনরায় স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে অভিন্ন নীতিমালার সংযোজন কিংবা বিয়োজন করে আবার বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি-মহাসচিবের কাছে প্রেরণ করতে ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এরইমধ্যে এই অভিন্ন নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই নীতিমালা প্রত্যাখ্যানের অন্যতম প্রধান যুক্তি হচ্ছে, অভিন্ন নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং স্বায়ত্তশাসনের স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন করবে। ইউজিসি থেকে বলা হয়েছে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত প্রতিনিধি, ফেডারেশনের শিক্ষক নেতা এবং উপাচার্যদের সঙ্গে কথা বলেই এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধি, ফেডারেশনের নেতা ও উপাচার্যরা কি শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সাপেক্ষে তাদের মতামত দিয়েছেন? আমার জানামতে শিক্ষক সমিতিগুলো অভিন্ন নীতিমালার পক্ষে মতামত প্রদান করেনি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালে রাবি শিক্ষক সমিতি চিঠি দিয়ে এই অভিন্ন নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করেছিলো। তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ই যেখানে এই অভিন্ন নীতিমালার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে সেখানে ফেডারেশনের দোহাই দিয়ে কেন অভিন্ন নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এমনকি যাদের জন্য নীতিমালা তাদেরই কেন বিভিন্ন সময়ে আহূত সভায় প্রতিনিধি হিসেবে রাখা হয়নি?

গত ৭ সেপ্টেম্বর ফেডারেশনের সভার পর প্রাপ্ত খসড়া নীতিমালা পাওয়ার পর তা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি চোখে পড়েছে। এই অভিন্ন নীতিমালার ভালোমন্দ দিক বিবেচনা করেই বলা যেতে পারে অভিন্ন নীতিমালা মেনে বা না মেনে নেওয়াটা যুক্তিসঙ্গত কিনা।

এই নীতিমালার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিবন্ধ প্রকাশের যে বাধ্যবাধকতা রেখেছে তা সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকদের মান উন্নয়নে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে যার মতো করে পদোন্নতি নিচ্ছেন। এমনকি কোনও প্রকার ডিগ্রি ও মানসম্মত প্রকাশনা ছাড়াই পদোন্নতি নিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে এই নীতিমালার কারণে পদোন্নতির জন্য হলেও শিক্ষকেরা গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সব বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের জন্য এই অভিন্ন নীতিমালা কীভাবে যুক্তিযুক্ত হয়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক যে নিয়ম-নীতির মাধ্যমে পদোন্নতি পাবেন ঠিক একই নিয়মে কেন নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক পদোন্নতি পাবেন? প্রতিবছর ইউজিসি থেকে যে পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া হয় সেই একই পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের সরবরাহ কি নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় পায়? তাছাড়া সংস্কৃত, আরবি, পালি কিংবা বাংলা বিভাগের প্রকাশিত নিবন্ধগুলোকে কীভাবে স্কোপাস কিংবা ইনডেক্স জার্নালের আওতায় আনা হবে? বিজ্ঞান/প্রকৌশল ও প্রযুক্তি/ মেডিসিন সম্পর্কিত তথা ল্যাবরেটরিভিত্তিক গবেষণার প্রকাশনা এবং সামাজিক/আইন/বিজনেস/কলা ও মানবিক সম্পর্কিত বিষয়ের গবেষণা এক ও অভিন্ন নয়। বাস্তবতা বিবেচনা করে সব বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি সকল বিষয়কেও একই পর্যায়ে বা কাঠামোয় আনা যায় না। এছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনও উল্লেখ নেই। শুধু জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধের কথা বলা হলেও একটি ভালো মানের বই কিংবা বইয়ের অধ্যায় ক’টি নিবন্ধের সমান হবে সেক্ষেত্রেও তেমন কিছু বলা নেই। সুতরাং পদোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রকাশনার যে বিধান রাখা হয়েছে তা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কৃষি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য। ঢাবি, রাবি, চবি ও জাবি, এবং বুয়েট, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল ও বাকৃবির শিক্ষার্থীদের ভর্তি যোগ্যতার সঙ্গে অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যোগ্যতারও তারতম্য লক্ষ করা যায়। তাছাড়া যে জিপিএ নিয়ে একজন শিক্ষার্থী স্নাতকে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখে সেখানে সেই যোগ্যতাই কেন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচিত হবে না? যদি কোনও শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইসএইচসি পরীক্ষায় ন্যূনতম ৪.৫০ না পায় আর সে শিক্ষার্থী যদি ভবিষ্যতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনসহ ভালো মানের প্রবন্ধ/নিবন্ধ প্রকাশের যোগ্যতা প্রমাণ করেন তাহলে কেন তিনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না? অথবা জিপিএ ৪.৫০ না পাওয়া শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নিজ বিভাগে জিপিএ ৩.৮০/৩.৯০/৪.০০ পেয়ে মেধা তালিকায় স্থান করে নেন তাহলে কেন তিনি শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন না? তাছাড়া, কোনও একটি বিভাগে জিপিএ ৩.৫০ এবং ৩.২৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০-এর মতো হতে পারে। তাহলে সেক্ষেত্রে সবাই কি শিক্ষক হওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন?

যদি অভিন্ন নীতিমালাই হবে তবে একই নীতিমালার অধীনে ভিন্ন ভিন্ন শর্ত যুক্ত থাকবে কেন? যেমন বিজ্ঞান/সামাজিক/বিজনেস স্টাডিজ/ আইন অনুষদভুক্ত বিভাগসমূহের ক্ষেত্রে উভয় ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩.৫০-এর কথা বলা হলেও কলা অনুষদের জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের যেকোনও একটিতে ৩.২৫-এর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে? একইভাবে, কৃষি অনুষদভুক্ত বিভাগসমূহের ক্ষেত্রে শীর্ষ ১০% ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীরা প্রভাষক পদে আবেদনের যোগ্যতা অর্জন করবেন। যদি কৃষি অনুষদে এমন শর্ত আরোপ হয় তাহলে অন্য অনুষদের জন্য কেন নয়? একইভাবে মেডিসিনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল দ্বারা স্বীকৃত ডিগ্রি হলেই হবে। এখানেই বা কেন শীর্ষ ৩/৫/৭ জনের কথা বলা হয়নি? একজন শিক্ষার্থী পাস করলেই কেবল শিক্ষক হওয়ার জন্য যোগ্যতা অর্জন করবেন?  

নীতিমালা অনুসারে সক্রিয় শিক্ষকতা বলতে ‘শ্রেণিকক্ষে পাঠদান অথবা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য গৃহীত/কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত পূর্ণ বেতনে/স্ব-বেতনে শিক্ষা ছুটির সময়কালকে বুঝাইবে। যদি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অর্জিত ডিগ্রি সম্পন্ন করিয়া কাজে যোগদান করেন।’ এর যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ডিগ্রি অর্জনের পর যোগদান করলে সমুদয় বেতন পাবেন, না ডিগ্রি চলাকালীন পাবেন তা স্পষ্ট করে বলা নেই। তাছাড়া শুধু পূর্ণ বেতনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পূর্ণ বেতনের সঙ্গে অন্যান্য প্রাপ্ত সুবিধা শিক্ষকেরা পাবেন কিনা তার উল্লেখ নেই। এর ফলে আবারও যেকোনও ভিসি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে এই আইনের বিঘ্ন ঘটিয়ে যেকোনও শিক্ষককেই ক্ষতিগ্রস্ত  করতে পারেন। তাছাড়া শিক্ষাছুটির পরিবর্তে প্রেষণে শব্দ ব্যবহার অধিকতর যৌক্তিক বলে বিবেচিত। শিক্ষাছুটির ফাঁদে পড় অনেকেই পদোন্নতি ও অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্ছিত হবেন।

নীতিমালায় শিক্ষাছুটি সংক্রান্ত সবচেয়ে ভয়াবহ খারাপ দিকটি হলো, ‘কোনও প্রার্থী প্রদেয় সময়কাল পার না করিয়া পরবর্তী ছুটি গ্রহণ করিতে পারবেন না।’ এই নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে একজন শিক্ষক পদোন্নতির ক্ষেত্রে ২ বছর বঞ্চিত হবেন। প্রচলিত বিধান অনুসারে এক বা দুই বছরের মাস্টার্স/এমফিল করে যোগদানের পর উচ্চশিক্ষার জন্য পুনরায় বৃত্তিলাভ করলে বন্ড সময়কালের পরিবর্তে শিক্ষাছুটিতে থাকাকালীন গৃহীত বেতন-ভাতা ফেরত সাপেক্ষে যেতে পারতেন। এখন যেতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এর ফলে শর্তের ফাঁদে আটকে অনেকেই উচ্চতর ডিগ্রি তথা পিএইচডি করতে পারবেন না। কেননা, একটি পিএইচডি ডিগ্রির জন্য স্কলারশিপ জোগাড় করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। এছাড়াও নীতিমালার কোথাও স্যাবাটিক্যাল ছুটির কথা উল্লেখ নেই। প্রতি ছয় বছর অন্তর অন্তর একজন শিক্ষক বই লেখা বা গবেষণা করার জন্য পূর্ণ বেতনে এক বছরের ছুটি পেতেন। এখন সেই সম্পর্কিত কোনও বিধান যুক্ত করা নেই।

শিক্ষকেরা আশঙ্কা করছেন যে, মূলত আমলাদের খুশি করার জন্য এই অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। বেতন, ভাতা ও পদোন্নতির সঙ্গে অভিন্ন নীতিমালার সম্পর্ক ঠিক কোথায়? জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-তে শিক্ষকদের মর্যাদার অবনমন করা হয়েছে। এই অবনমনের সূত্র ধরেই উচ্চশিক্ষা সংস্কারের পরিবর্তে উল্টো অভিন্ন নীতিমালা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের আশঙ্কা যে, অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আমলাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে বসানো হবে। ভবিষ্যতে যদি কোনও কারণে অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজনৈতিক দলগুলোই। তখন এই আইনের অপব্যবহার করে ভিসি পদে আর্মি জেনারেলদের বসানো হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

এখন কথা হচ্ছে, অভিন্ন নীতিমালা আমরা প্রত্যাখ্যান করবো কিনা? প্রশ্ন হচ্ছে, ইউজিসি অভিন্ন নিয়োগ ও নীতিমালা প্রণয়নের এখতিয়ার রাখে কিনা? বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ধরন ও শিক্ষা কার্যক্রম একরকম নয়।  বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধরন একে অন্য থেকে আলাদা ও স্বতন্ত্র। সবক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের ধরন যেখানে এক ও অভিন্ন নয়, সেখানে অভিন্ন নীতিমালা কীভাবে প্রযোজ্য হয়? 

অভিন্ন নীতিমালা যদি প্রত্যাখ্যান করতেই হয় তাহলে পাশাপাশি এটাও বলা জরুরি যে, আমাদের মান উন্নয়নের জন্য আমরা কি পদক্ষেপ নিয়েছি বা নেবো? চার বছর যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়র সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতি কি ঘুমিয়ে ছিলেন? ডিগ্রি ছাড়া নামমাত্র দুটি প্রকাশনা নিয়ে অধ্যাপক হওয়াটাও লজ্জার। আমরা কথায় কথায় বলি, অক্সফোর্ড/ক্যামব্রিজ স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি অক্সফোর্ড/ক্যামব্রিজের শিক্ষকদের মতো পড়াশোনা ও গবেষণা করি? যে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়েছিলো তার মর্যাদা আমরা কতটুকু রাখতে পেরেছি? দলবাজি, শেয়ারবাজার ও বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা উপার্জনের জন্য স্বায়ত্তশাসন নিশ্চয়ই প্রদান করা হয়নি? বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, যিনি সান্ধ্যকালীন কোর্স করে যোগ্যতা অর্জন করেছেন! কেউ কেউ স্বায়ত্তশাসনের দোহাই দিয়ে ডিগ্রি ছাড়াই ১০-১২ বছরে অধ্যাপক হচ্ছেন। কোন কোন শিক্ষক বছরের পর বছর বিভাগে না এসে সব সুবিধা নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বলছেন, সরকার যেহেতু কোনও সুবিধা দিচ্ছে না তাই আমরা পড়াশোনা ও গবেষণা করেবো না।  এটাও ভালো কোনও যুক্তি নয়। সীমিত সম্পদের মধ্যেই অনেক শিক্ষক গবেষণাকর্মে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন। এখন দায় আমাদের। আমাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা শিক্ষক হিসেবে পড়াশোনা ও গবেষণা কাজে নিজেদের অধিকতর নিযুক্ত করবো নাকি স্বায়ত্তশাসনের দোহাই দিয়ে ইচ্ছামতো মানহীন পদোন্নতি নেবো। আরও একটি বিষয়, বিগত চার বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেন পরিবর্তন আনেনি? আমরা কি স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি যুগোপযোগী নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারি না?

অভিন্ন নীতিমালা না মেনে নেওয়ার পাশাপাশি অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা পরিবর্তন করতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকার একটি উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করে দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলো, ফেডারেশন, ইউজিসি ও উচ্চশিক্ষা কমিশন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা পর্যালোচনা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে একটি ভালো নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক সমিতির পাশাপাশি কয়েকজন সদস্যের মাধ্যমে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করে নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করতে পারে। তবে সবকিছুর একটা পূর্বশর্ত হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পায় সেটাও নিশ্চিত করা। 

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু আর্থিকভাবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে উদ্ভূত এ সমস্যা সমাধান সম্ভব। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সরকারি গেজেটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে অস্বীকার করে তাহলে সরকারের একবার নয় বহুবার ভেবে দেখা উচিত এই নীতিমালা ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেবে কিনা?

এই অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকার এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ অনুভব করুক। বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বকীয়তা ফিরে পাক এবং শিক্ষকরাও স্বায়ত্তশাসনের নামে নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করুক।  

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া। সহযোগী অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

 

/এপিএইচ/ওএমএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ