সাংবাদিকতা শিক্ষার ভবিষ্যৎ

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:২৭, অক্টোবর ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪১, অক্টোবর ০৭, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামসাংবাদিকতা পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে ইদানীং বেশ আলোচনা হচ্ছে। গণমাধ্যম শিল্পে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা, মেধাবী সাংবাদিকদের এ পেশা ত্যাগ ইত্যাদি নিয়ে দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকরা তাদের মতামত দিচ্ছেন। সাংবাদিকতার একজন ছাত্র এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও এ সম্পর্কিত বিষয়ে শিক্ষকতা করার সুবাদে এ পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমিও উদ্বিগ্ন। খারাপ লাগে এটা চিন্তা করে, শিক্ষকতা জীবনে আমি অনেককেই উদ্বুদ্ধ করেছি এ বিষয় পড়তে। কিন্তু গণমাধ্যমে এ পেশার যে সাম্প্রতিক চিত্র দেখছি বা সেই সঙ্গে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত অগণিত ছাত্রছাত্রী, বন্ধু-বান্ধবের কাছে এ পেশার যে বিবরণ নিয়মিত শুনছি, তাতে মনে হলো এ বিষয়ে আমার কিছু লেখা উচিত। তবে আমার এ পর্যবেক্ষণ একান্ত ব্যক্তিগত। এটা নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই, অন্য একজন শিক্ষক হয়তো ব্যাপারগুলো অন্যভাবে দেখবেন।
দেশের অনেক পাবলিক এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন নামে সাংবাদিকতা বা এ সম্পর্কিত বিভাগগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এটা অবশ্যই প্রত্যাশিত ছিল, গণমাধ্যম শিল্পের এই ক্রান্তিকালে অন্তত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বিভাগগুলো উদ্বেগ জানাবে, লেখালেখি করবে, বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়াম আয়োজনের মাধ্যমে এই শিল্পকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে এবং সর্বোপরি এ শিল্পের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু আমি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তরফ থেকে আয়োজিত এ ধরনের উল্লেখযোগ্য কোনও আলোচনা বা গবেষণার কথা সাম্প্রতিককালে পত্রপত্রিকায় খুব একটা দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না।

গণমাধ্যমের এ সংকটের কারণ তো বহুবিধ। রয়েছে রাজনৈতিক, রেগুলেটরি বা আইনগত কারণ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বিজ্ঞাপনের সংকুচিত বাজার, কন্টেন্ট বা আধেয় সংক্রান্ত ব্যাপার ইত্যাদি। আমি এসব নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করতে চাইছি না। আমি শুধু সাংবাদিকতা শিক্ষা নিয়ে কয়েকটি কথা তুলে ধরতে চাই, যা এ পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত। 

যতটুকু শুনেছি দু’চারটা ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে বেশিরভাগ গণমাধ্যমই এখন অলাভজনক, কোনোভাবে টিকে আছে। অনেক জায়গায় সংবাদকর্মীরা দীর্ঘদিন বেতনবিহীন। পত্রিকার পাঠক কমছে। টেলিভিশনের বন্ধুরা বলেন দেশীয় চ্যানেলের দর্শকও কমছে। 

কিন্তু পাঠক, দর্শকের তথ্যের বা বিনোদনের চাহিদা তো কমেনি। অনলাইনে প্রচুর পাঠক বিভিন্ন উপায়ে তাদের তথ্য বা বিনোদনের চাহিদা ঠিকই মেটাচ্ছেন। টিভি যারা দেখছেন, তারা দেখছেন বিদেশি চ্যানেল বা ইউটিউবে দেখছেন ভিনদেশের অনুষ্ঠান। 

সাংবাদিকতার বর্তমান শিক্ষা পাঠক, দর্শক-শ্রোতার এই পরিবর্তনশীল চাহিদাকে কতটুকু মেটাতে পারছে বা ভবিষ্যতে কতটুকু মেটাতে পারবে তা নিয়ে সাংবাদিক বন্ধুরা প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন। সবদেশেই গণমাধ্যমকে এখন গ্লোবাল কন্টেন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে এবং দেশীয় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সবাই চান আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনা। এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। সাংবাদিক বন্ধুরা প্রায়শই অভিযোগ করেন, লেখালেখি, storytelling এবং screenwriting ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের দুর্বলতা নিয়ে। মানসম্মত কন্টেন্ট, ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার যোগ্যতা, আকর্ষণীয় উপস্থাপনার ক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়ার মাধ্যমে পাঠক, দর্শক, শ্রোতাকে কিছুটা ধরে রাখার প্রচেষ্টা তো নেওয়া যায়। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার কারিকুলাম কতটুকু জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার মাধ্যমে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখছে, তা নিয়ে হয়তো বিতর্ক হতে পারে। 

এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে উপযুক্ত, দক্ষ শিক্ষকের অভাব। শিক্ষকরা যে অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগের বিরোধিতা করছেন, তা যে কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং প্রাসঙ্গিক, সেটা সাংবাদিকতায়  শিক্ষক নিয়োগের উদাহরণ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। সাংবাদিকতা একটি সৃজনশীল পেশা। শুধু সাংবাদিকতা বললে ভুল হবে, লেখালেখি, টিভির অনুষ্ঠান প্রযোজনা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, বিজ্ঞাপন তৈরি ইত্যাদি বিষয়ের শিক্ষকতার জন্য শুধু যদি রেজাল্টের ভিত্তিতে শিক্ষক নেওয়া হয়, তা হবে চরম বোকামি। শিক্ষকতায় থেকে আমি নিজেও ব্যাপারটি লক্ষ করেছি। শুধু ফার্স্ট ক্লাস বা সমতুল্য জিপিএ দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে যাদের,তাদের অনেকের নিজের নেই পপুলার রাইটিং, সম্পাদনা বা অনুষ্ঠান নির্মাণের অভিজ্ঞতা। মিডিয়া স্টাডিজসহ তত্ত্বীয় কিছু বিষয়ে রেজাল্ট বা উচ্চতর ডিগ্রির প্রয়োজন হলেও সাংবাদিকতা, টিভি প্রযোজনা বা চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রায়োগিক জ্ঞানে অভিজ্ঞদের আমাদের দেশে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে নেওয়ার রেওয়াজ নেই। কোথাও কোথাও পার্ট টাইম পড়ানোর জন্য নেওয়া হলেও তাদের ভূমিকা থাকে কম, সময় দেওয়াও সম্ভব হয় না। 

শিক্ষক নিয়োগে তথাকথিত রেজাল্টের প্রাধান্য আমাদের দেশে সাংবাদিকতা শিক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যার নিজের গণমাধ্যমে লেখালেখির বা সম্পাদনার অভিজ্ঞতা, টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণের অভিজ্ঞতা বা চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা নেই এবং এ ধরনের শিক্ষক দিয়ে যদি সাংবাদিকতা বিভাগ চালানো হয়, তাহলে তিনি এ শিল্পকে কীভাবে দিকনির্দেশনা দেবেন? 

যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা কলাম্বিয়া জার্নালিজম স্কুলের ডিন এবং অধ্যাপক হচ্ছেন নিউ ইয়র্কার পত্রিকার নিয়মিত লেখক, দুইবার পুলিৎজার বিজয়ী সাংবাদিক, ওয়াশিংটন পোস্টের প্রাক্তন সম্পাদক ও বিশিষ্ট লেখক। তার একাডেমিক যোগ্যতা হচ্ছে একটি কলেজ থেকে ইংরেজি ও ইতিহাসে বিএ ডিগ্রি। একইভাবে বিশ্বখ্যাত মেডিল স্কুল অব জার্নালিজমের ডিন ও অধ্যাপক হচ্ছেন একজন খ্যাতনামা কলামিস্ট, এবোনি ম্যাগাজিনের একজন প্রাক্তন সম্পাদক। তিনি এখনও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী, কিন্তু গণমাধ্যমের একজন জনপ্রিয় লেখক। জার্নালে কয়েকটি আর্টিক্যাল লিখে বা জিপিএ দিয়ে হয়তো আমাদের দেশে সাংবাদিকতার শিক্ষক হওয়া যায়, কিন্তু এতে লাভ হয় না এই শিল্পের বা এই বিষয়ের অগণিত শিক্ষার্থীর। বাংলাদেশের শিক্ষক নিয়োগের নিয়মকানুন বড়ই অদ্ভুত!    

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের চাকরিপ্রাপ্তিকে প্রভাবিত করছে, তা হলো কারিকুলাম। আমাদের দেশে বিভাগের নামেই সাধারণত ডিগ্রি দেওয়া হয়, প্রোগ্রামের নাম পরিবর্তন করে তা যুগোপযোগী করা হয় না। গণমাধ্যম শিল্পের যে অবস্থা তাতে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অন্যান্য সেক্টরে কাজের উপযোগী করে তোলা যায়। উদাহরণস্বরূপ বিভাগের অধীনে যদি মার্কেটিং কমিউনিকেশন, বিজনেস জার্নালিজম, স্ট্রাটেজিক কমিউনিকেশন, মিডিয়া অ্যাডভোকেসি, অ্যাডভার্টাইজিং ইত্যাদি নামে যদি ভিন্ন ভিন্ন প্রোগ্রাম চালু করা যায় এবং এসব নামে ডিগ্রি দেওয়া হয়, তাহলে তা গ্র্যাজুয়েটদের দেশে-বিদেশে চাকরির সুযোগ করে দেবে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো এসব কিছু concentration আছে, তবে আলাদা প্রোগ্রাম চাকরিদাতাকে নিঃসন্দেহে উৎসাহিত করবে।  সমসাময়িক বিভিন্ন প্রাযুক্তিক জ্ঞান আর বাংলা ও ইংরেজিতে অসামান্য দক্ষতা তো গণমাধ্যমের সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। আর এজন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক। 

সাংবাদিকতার হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং দেশীয় গণমাধ্যম শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা এবং এ সংক্রান্ত বিভাগগুলোকে থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের সেমিনার সিম্পোজিয়াম আয়োজন, বিভিন্ন পলিসি, অডিয়েন্স বা মার্কেট রিসার্চ, রেগুলেটরি পরামর্শ, অ্যাডভোকেসি ইত্যাদির মাধ্যমে এ শিল্পের পাশে দাঁড়াতে হবে। মালিক, সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে হবে। সেই সঙ্গে চাকরির নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে হবে। 

যোগাযোগ বিপ্লবের এ যুগে সবাইকে তো গণমাধ্যমের প্রভাব নিয়েও জানতে হবে। আমি যতটুকু জানি, ইংরেজি মিডিয়ামের এ লেভেলে মিডিয়া স্টাডিজ নামে একটি স্বতন্ত্র বিষয় আছে। আমাদের দেশে কলেজ পর্যায়ে মিডিয়া পড়ানোর আন্দোলনের কথা আগে শোনা গেলেও এখন এ বিষয়ে তেমন কিছু শোনা যায় না। এক্ষেত্রে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে।

আগেই বলেছি আমি একটি বিষয়ে নিশ্চিত যে আমাদের পাঠক বা দর্শক কমেনি। জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে আমাদের পাঠক, দর্শক, শ্রোতা। অনেক তরুণ লেখকের বই হাজার হাজার বিক্রি হয়। লোকজন টিভি দেখে। সমস্যা হচ্ছে যে কারণেই হোক দেশীয় গণমাধ্যম তার আবেদন এবং ব্যবসা দ্রুতই হারিয়ে ফেলছে। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে লোকজনের রুচি এবং চাহিদারও পরিবর্তন ঘটছে। এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের এই নতুন প্রবণতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা এই শিল্পে কিছুটা হলেও প্রাণ সঞ্চার করতে পারবে। 

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]             

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ