প্রিয় ক্রিকেট ভালো আছো!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:১৭, অক্টোবর ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৭, অক্টোবর ২৪, ২০১৯

রেজানুর রহমানভাঙা কলসও জোড়া লাগানো যায়। কিন্তু ভাঙা কলসের দাগ কখনও মিশে না। বরং ভাঙা অংশের দাগ দিনে দিনে আরও দগদগে হয়ে ওঠে। কলসের চেহারা দিনে দিনে এতটাই শ্রীহীন হতে থাকে যে, তখন তাকাতেও মন চায় না। আমাদের ক্রিকেটের অবস্থা অর্থাৎ চেহারাটা কি সে রকমই হয়ে যাচ্ছে? কে না জানে বাংলাদেশে ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, এটি আনন্দ-বেদনার পাশাপাশি ঐতিহ্যেরও প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেট হাসলে বাংলাদেশ হাসে। ক্রিকেটের ব্যর্থতায় বাংলাদেশ আশাহত হয়। সে কারণে ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের নিয়ে দেশের মানুষের আগ্রহ, উদ্দীপনা অনেক বেশি। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে যে ব্যক্তি হয়তো দৈনিক পত্রিকা পড়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন, তিনিও দিনের কোনও না কোনও সময় পত্রিকার খেলার পাতার খোঁজ করবেনই। বিশেষ করে ক্রিকেটের কোনও খবর আছে কিনা, সে ব্যাপারেই তার আগ্রহ থাকে বেশি।

দেশের সাধারণ মানুষের এই আগ্রহকে পুঁজি করেই কি আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা আন্দোলনের নামে একটা চমক দেখালেন? বলা নেই, কওয়া নেই, ধুম করে বলা হলো, আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা আর ক্রিকেট খেলব না। কী মারাত্মক কথা! সামনেই ভারত সফর। তার মানে সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বছর পর ভারত বাংলাদেশকে ক্রিকেট খেলতে ডেকেছে। ক্রিকেট পরাশক্তি ভারতের সঙ্গে লড়াই করতে যাওয়ার আগে যেখানে আমাদের ক্রিকেটের প্রস্তুতিটা আরও বেশি শানিত হওয়া দরকার, যে মুহূর্তে আমাদের ক্রিকেট পরিবারের মধ্যে আরও বেশি ঐক্য ও ভালোবাসার শক্তিটা জোরদার হওয়া দরকার, সেই মুহূর্তে বাজলো ভাঙনের সুর। জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা হঠাৎ করেই খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের ক্রিকেট পরিবারের প্রধান ক্রিকেটারদের প্রতি কটু শব্দের তীর ছুড়ে বললেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নষ্ট করার জন্য এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র। ক্রিকেটারদের দাবি দাওয়া থাকতেই পারে। কিন্তু আন্দোলনে নামার আগে তাদের তো উচিত ছিল ক্রিকেট বোর্ডকে আগাম অবহিত করা। অথচ তারা সেটা না করে খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলো দাবি না মানা পর্যন্ত তারা আর ক্রিকেট খেলবেই না। তার মানে অবস্থা কী দাঁড়ালো? আমরা আমাদের ক্রিকেটারদের কি কোনও টাকা-পয়সা দেই না? ক্রিকেট দুনিয়ায় এই ধরনের একটা অশুভ বার্তাই তো ছড়িয়ে গেলো। এর দায় কে নেবে?’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নাজমুল হাসান পাপনের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটারদের সম্পর্কে তার কথা বলার ভঙ্গি নিয়ে। সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হাসান পাপনের কথা বলার ভঙ্গি ছিল বেশ আক্রমণাত্মক। তিনি বলেছেন, ‘ক্রিকেটারদের হঠাৎ আন্দোলনের ঘোষণা একটা গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। আমার ধারণা এই ষড়যন্ত্রে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ খেলোয়াড় জড়িত নয়, অথবা তারা না জেনে, না বুঝে আন্দোলনে শরিক হয়েছে। তবে ষড়যন্ত্রটা কে করছে, সেটা আমি ধরতে পেরেছি। ওয়েট করেন, অচিরেই সবকিছু বেরিয়ে আসবে।’

জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের প্রতি এভাবেই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশের পরদিনই নাজমুল হাসান পাপন ক্রিকেটাদের সঙ্গে নিয়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করলেন। আগেরদিন যার বা যাদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস দিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে নিয়েই বললেন, ক্রিকেটারদের সব দাবি-দাওয়াই মানা হবে। প্রশ্ন হলো, পরেরদিন সব দাবি-দাওয়াই তো মেনে নিলেন, তাহলে আগের দিন কেন এতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আউড়িয়ে ক্রিকেটারদের ভিলেন বানালেন? বোর্ডকে আগাম না জানিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করায় জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের প্রতি অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে প্রচারমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অসন্তোষের চিত্রও ফুটে উঠেছে। কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে অসন্তোষটা বেশি প্রকাশ হচ্ছে ক্রিকেট বোর্ড প্রধান নাজমুল হাসান পাপনের প্রতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই একজন মন্তব্য করেছেন, অসন্তোষ আর অবহেলায় ক্রিকেটের সোনার কলসটা ভেঙে গেছে। হয়তো আবার ভাঙা কলস জোড়া লাগবে। কিন্তু দাগটা তো থেকেই যাবে। দাগ মুছবেন কীভাবে? এমনই মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশ সরব হয়ে উঠেছে। আব্দুল হক নামে একজন তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির বক্তব্য শুনে মনে হলো ক্রিকেটারদের বেতনভাতা যেন তিনিই দেন। তার বক্তব্য শোভন মনে হয়নি। ক্রিকেটের দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হোক।’ মজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘ক্রিকেটাররা তার দলীয় কর্মী নাকি? কথাবার্তায় তো তাই মনে হয়। মর্যাদাসম্পন্ন দায়িত্বে থেকে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা শেখার জন্য তার ট্রেনিং দরকার।’ রুবেল ইসলাম লিখেছেন, ‘পাইপলাইনে খেলোয়াড়দের অভাব নাই। পুরনো বুড়োগুলোর কারণে নতুনরা সুযোগ পাচ্ছে না। খেলার পারফরমেন্সের ভিত্তিতে ক্রিকেটারদের বেতন দেওয়া হোক। যেমন সেঞ্চুরি করলে একলাখ। ৫০ রান করলে ৫০ হাজার, ৩০ রান করলে ৩০ হাজার...’

লালমিয়া লিখেছেন, ‘লিডার (পাপন) আপনি একজন ক্লিন ইমেজের নেতা। ভাই, আপনার সাথে একজন ক্লিন ইমেজের নেতাকে নিয়া ঝামেলাটা শেষ করেন।’ মামুন খন্দকার লিখেছেন, ‘বুড়োকে বাদ দিয়ে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষিত যুবকের উচিত বিসিবির প্রেসিডেন্ট হওয়া।’ সাইফুল ইসলাম সোহেল লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেকে আছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। তাদের ব্যাংক হিসাব নেওয়া হোক। আমাদের ক্রিকেটাররা পাকিস্তান, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটারদের চেয়েও সুযোগ-সুবিধা বেশি পায়। সেই তুলনায় খেলার মাঠে তাদের পারফরমেন্স খুবই খারাপ।’ স্বপন দাস লিখেছেন, ‘একটা পরিবারে কত টাকা দরকার? আমাদের ক্রিকেটারদের কত টাকা দিলে তারা বিলাসী জীবন-যাপন করতে পারবেন? গার্মেন্টকর্মীরা দশ হাজার টাকায় জীবন চালায়। তারাও কিন্তু দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে। ওরা পারলে আমরা কেন পারবো না?’

যুক্তিতর্কের খাতিরে এরকম অনেক কথাই হয়তো বলা যাবে। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে কারও কোনও বেফাঁস কথা অথবা বিরূপ আচরণে ক্রিকেট যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যেমন—জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা হঠাৎ যেভাবে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটা দেশের কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের মনঃপূত হয়নি। ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্রিকেট খেলব না’—ক্রিকেটারদের এই ঘোষণায় দেশের মানুষ যারপরনাই মানসিকভাবে আহত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে খেলতে যাওয়ার আগে যেখানে ঐক্যবদ্ধ শক্তির অনুশীলন প্রয়োজন, সেখানে দাবি আদায়ের নামে অসন্তোষ তৈরির উদ্যোগ অনেকেই পছন্দ করেননি। আবার একইসঙ্গে ক্রিকেটারদের না বুঝিয়ে, তাদের সঙ্গে না বসে শাসানো ভঙিতে কথা বলায় বোর্ড সভাপতির কঠোর সমালোচনা করেছেন অনেকে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, হঠাৎ করে ক্রিকেটারদের আন্দোলন ঘোষণা, বোর্ড সভাপতির তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভঙ্গি মূলত দেশের ক্রিকেটেরই ক্ষতি করেছে। আন্দোলনরত ক্রিকেটাররা ও বোর্ডের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘সবকিছু মিটে গেছে বলে’ একটা আভাস দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ভাঙা কলসের মতো এই অসন্তোষের দাগ সহজেই মুছে যাবে না বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

তার মানে অসন্তোষ নিয়েই যদি আমাদের ক্রিকেট এগোতে থাকে, তাহলে তো ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। দলমত নির্বিশেষে একটাই তো অহংকারের জায়গা আমাদের। তাও যদি নড়বড়ে হয়ে যায় তাহলে হা-হুতাশ ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন, ক্রিকেটের ঝুট ঝামেলা মিটে গেছে। ভুল ধারণা। ক্রিকেটের এই ঝুট ঝামেলা সহজেই মিটবে বলে মনে হয় না। ক্রিকেটাররা হঠাৎ আন্দোলন শুরু করায় বোর্ড সভাপতি উত্তেজিত ভঙ্গিতে একে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ক্রিকেটারদের মধ্যে কারা কারা এই ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারেন, তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন। ক্রিকেটের স্বার্থে তার এই বক্তব্য পরিষ্কার হওয়া দরকার। তিনি যদি বুঝেই থাকেন কে বা কারা ষড়যন্ত্র করছেন, তাহলে সেটা খোলাসা করা জরুরি। অন্যদিকে ক্রিকেটাররা বোর্ডকে আগাম না জানিয়ে হঠাৎ কেন ‘ক্রিকেট খেলবেন না বলে ঘোষণা দিলেন’, তাও আবার ভারত সফরের আগে...এরও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মাশরাফি বিন মুর্তজা রাজনীতির মাঠে পা ফেলেছেন। কিন্তু তিনি ক্রিকেট থেকে অবসর নেননি। এখনও তিনি ওয়ানডে দলের অধিনায়ক। অথচ ক্রিকেটারদের আন্দোলন সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। এই ঘটনা কিসের ইঙ্গিত বহন করে, তা নিয়েও ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

ক্রিকেটারদের এই আন্দোলনমুখর সময়ে হঠাৎ ক্রিকেটারদের সংগঠন ‘কোয়াব’ সরব হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর ক্রিকেট খেলুড়ে অন্যান্য দেশেও এমন সংগঠন আছে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে তাদের কাঠামোগত পার্থক্য অনেক। যেমন আমাদের দেশে যারা কোয়াবের নেতৃত্বে রয়েছেন, তাদেরই কেউ কেউ আবার ক্রিকেট বোর্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অন্যান্য দেশে ক্রিকেট বোর্ডে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তারা ক্রিকেটারদের কোনও সংগঠনের দায়িত্বে থাকতে পারেন না। অথচ আমাদের দেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। মালিকদের মধ্যে কেউ যদি শ্রমিক সংগঠনেরও সদস্য থাকেন, তাহলে তো শ্রমিকদের অনেক ন্যায্য দাবি আদায় হবে না। ক্রিকেটারদের ১১ দফা আন্দোলনে সাধারণ ক্রিকেটারদের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কার্যত তারকা ক্রিকেটারদের বাইরে সাধারণ মানের কোনও ক্রিকেটার কি শেষ পর্যন্ত লাভবান হবেন? এই নিশ্চয়তা দেখি না।

লেখাটি শেষ করার আগে একটি গল্প বলি। ‘একজন যুবক হঠাৎ একটা দ্বৈবশক্তি পেয়েছে। সে যা চায়, তার প্রতিবেশীরা তার চেয়ে দ্বিগুণ পেয়ে যায়। সে হয়তো একটা বাড়ি চাইল। তার একটা বাড়ি হয়ে গেলো ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশীর দুটো বাড়ি হয়ে গেলো। সবাই যুবকের প্রশংসায় মত্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু যুবকের তা মনঃপূত হলো না। ক্ষমতা তার, অথচ সে পাবে একটা, অন্যরা পাবে দুইটা। এটা হতে পারে না। ঈর্ষাপরায়ণ যুবক হঠাৎ একদিন কুবুদ্ধি বের করলো। সে চাইবে তার একটা চোখ অন্ধ হোক। তাহলে প্রতিবেশীদের সবার দুটো করে চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। যেই কথা সেই কাজ। যুবকের এক চোখ অন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবেশীদের সবার দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেলো। যুবক তো মহাখুশি। যেহেতু সবার চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই চারপাশে যা কিছু আছে, সবই এখন তার। কিন্তু যুবকের এই আনন্দ বেশিদিন টিকলো না। কারণ অন্যেরা অন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না, মিশেও না। বন্ধুহীন, পরিবারহীন হয়ে পড়লো সে।’

আমাদের ক্রিকেটও কী সেই পথে হাঁটছে? প্রিয় ক্রিকেট, ভালো আছো তো?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ