স্থলসীমানা চুক্তির মাধ্যমে কী পেয়েছে বাংলাদেশ?

Send
ড. সেলিম মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৪:০৪, অক্টোবর ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৮, অক্টোবর ২৬, ২০১৯

ড. সেলিম মাহমুদবাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত কয়েকটি  চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক নিয়ে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। জাতীয় স্বার্থ, উভয় দেশের সম্পর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিমতগুলো বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। এ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে যত চুক্তি হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারতের সঙ্গে মোট ৮৮টি চুক্তি করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই চুক্তিগুলোর সবই বাংলাদেশের স্বার্থে করা হয়েছিল। আর জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার মোট দীর্ঘ ৩১ বছর ক্ষমতায় থাকলেও বাংলাদেশের স্বার্থে মৌলিক কোনও বিষয়ে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তিও করতে পারেনি। এই ৩১ বছরে তারা মোট ৩টি চুক্তি করতে পেরেছিল। ভারতের কাছ থেকে আজ পর্যন্ত দেশের যতটুকু অর্জন, তার সবটুকুই এনেছেন বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা। তবে, এই লেখায় শুধু স্থলসীমানা চুক্তি ও এর বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করবো।  
ভৌগলিক বিবেচনায় বাংলাদেশ পুরোপুরি তিন দিক থেকে ভারত-পরিবেষ্টিত।  বাংলাদেশ-ভারতের মোট সীমানা ৪ হাজার ১৫৬  কিলোমিটার, যা কোনও একক রাষ্ট্রের সঙ্গে পৃথিবীর পঞ্চম দীর্ঘ স্থল সীমানা। এই দীর্ঘ সীমানা সংবলিত নিকটতম প্রতিবেশী হওয়ার কারণে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ ধরনের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে আমাদের অনেক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই স্বার্থ আদায়ের একমাত্র পথই হচ্ছে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদন। পৃথিবীর সব সভ্য ও উন্নত দেশ তাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে অসংখ্য চুক্তি করেছে।
একটি রাষ্ট্রের জন্য সীমানা একটি মৌলিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরসঙ্গে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা নির্ভর করছে। পৃথিবীর অনেক দেশের সীমানাবিরোধ নিয়ে পরিস্থিতি শেষপর্যন্ত যুদ্ধেও গড়িয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা নিষ্কণ্টক ও টেকসই করার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে ভারতের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তি স্বাক্ষর করেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী এই চুক্তি সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় অনুসমর্থন করা হয়। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬৮ অনুযায়ী এই ধরনের চুক্তি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে অনুসমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে। পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের সরকারগুলোর আন্তরিকতার অভাব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তাদের উদাসীনতার কারণে পরবর্তী সময়ে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
শেখ হাসিনার সরকার ২০০১ সালের ২৯ জুন বহু বছরের অনিষ্পন্ন দুই দেশের স্থলসীমানা নির্ধারণ সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট বর্ডার ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অসহযোগিতার কারণে জয়েন্ট বর্ডার ওয়ার্কিং গ্রুপের কর্মকাণ্ড এগোয়নি। ১৯৭৪ সালের Land Boundary Agrement (LAB)-এর বিধান অনুযায়ী ছিটমহলগুলোয় দুই দেশের সরকারের আদমশুমারি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সরকার এ কাজটি করতে দেয়নি। শেখ হাসিনার সরকারের সময় ২০১০ সালের নভেম্বরে ওয়ার্কিং গ্রুপ আদমশুমারির সিদ্ধান্ত নেয়। যা ২০১১  সালের জুলাইতে সম্পন্ন হয়। এ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করা হয়।
ভারতের কংগ্রেস সরকার স্থলসীমানা চুক্তি সংসদে অনুসমর্থন  করতে পারেনি মূলত আসামের আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে এই ইস্যুতে বিজেপি কংগ্রেস সরকারকে সমর্থন করতে চাইলেও বিজেপি’র আসাম ইউনিট ও অসম গণসংগ্রাম পরিষদ এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। বিজেপি তার আঞ্চলিক রাজনৈতিক কারণে ওই সময়ে এই চুক্তি অনুসমর্থনের পক্ষে ছিল না। এই অবস্থা অনেকটা তিস্তা চুক্তির মতোই ছিল। তাই তিস্তা নিয়ে আমাদের আশার আলো রয়েছে।
ভারত তাদের সংসদে ২০১৫ সালের  ৭ মে  এই সীমানা চুক্তি অনুসমর্থনের জন্য সংবিধানের ১০০তম সংশোধনী আনে। ১৯৭৪ সালে সীমানা চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ছিটমহল বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সীমানার সহজীকরণ। ২০১৫ সালের ৬ জুন অনুসমর্থনকৃত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারত গ্রহণ করেছে। যার মোট আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর। অন্যদিকে, ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশ পেয়েছে, যার মোট আয়তন ১৭ হাজার ১৬০ একর। এর ফলে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ ১০ হাজার ৫০ একর  (৪০.৬৭ বর্গ কি. মি.) ভূমি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর চুক্তি সম্পাদন ও শেখ হাসিনার চুক্তি বাস্তবায়নের কারণে আজ ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ এই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমি পায়। ভারতের কাছ থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেভাবে ৪০.৬৭ বর্গ কি. মি. ভূমি আদায় করে নিলো, এটি বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই ৪০.৬৭ বর্গ কি. মি. ভূমি পৃথিবীর ৪টি দেশের চেয়ে বড়। দেশগুলো হলো—ভ্যাটিক্যান সিটি (.৪৪ বর্গ কি. মি.), ফ্রান্সের পাশে অবস্থিত মোনাকো (২ বর্গ কি. মি.), অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব দিকে অবস্থিত দ্বীপ রাষ্ট্র নাগুরু (২১ বর্গ কি. মি.), অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত দ্বীপ রাষ্ট্র টুভালু (২৬ বর্গ কি. মি.)। পৃথিবীর পঞ্চম ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র স্যান ম্যারিনোর (ইতালির পাশে অবস্থিত)।  আয়তনও মাত্র ৬১ বর্গ কি.মি.।
এখানে, একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাকিস্তান সরকার ২৪ বছরে, জিয়া এরশাদ ও খালেদা জিয়ার মোট ৩১ বছর শাসনামলে এই স্থলসীমানা সমস্যার সমাধান করতে পারেনি; ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খানের সঙ্গে ভারত সরকার এই বিষয়ে একটি চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তি কোনোদিন বাস্তবায়ন করা হয়নি।
লেখক: আওয়ামী লীগ নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ের সমন্বয়কারী; বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও অধ্যাপক, আইন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ