বিএনপি এখন কী করবে

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৫:২০, অক্টোবর ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫২, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

আনিস আলমগীর‘আওয়ামী লীগকে কঠিন সংকট উত্তরণ করতে হবে’ শিরোনামে সম্প্রতি আমি একটি কলাম লিখেছিলাম। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির কয়েকজন নেতা সেটি পছন্দ করে ব্যক্তিগত অভিমত দিয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা আমাকে বললেন, এই সময়ে তাহলে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপির করণীয় কী? আমি খুব নির্মোহ ভঙ্গিতে বললাম, যতদিন তারেক জিয়া বিএনপির ঘাড়ে আছে, ততদিন বিএনপির কিছুই করতে হবে না। তিনি জানতে চাইলেন, আপনারা কী চান? বললাম, তারেক জিয়া এবং জামায়াতমুক্ত প্রোগ্রেসিভ বিএনপি।
আসলে আমাদের পক্ষে বলা সহজ কিন্তু বিএনপির পক্ষে তারেক জিয়া এবং জামায়াতমুক্ত হওয়া কঠিনের চেয়ে কঠিন। জামায়াতের রয়েছে ‘মাসলম্যান’, যা মাঠ চাঙা রাখতে বিএনপির প্রয়োজন। কেউ কেউ জামায়াতকে নিয়ে ভোটের অঙ্কের ফালতু হিসাব দেখান। জামায়াতকে রাখার কারণে বিএনপির যত ভোট বাড়ে মনে করা হয়, তারচেয়ে বেশি তারা হারায় জামায়াত সঙ্গে রাখার কারণে। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া ছাড়া বিএনপির অস্তিত্ব টিকে কিনা, যেখানে সন্দেহ সেখানে তারেক জিয়াকে দলের বাইরে রাখা অসম্ভব।
বিএনপির চেয়ারপারসন এখন জেলে। বিচারে তার শাস্তি হয়েছে। তিনি কারাগারে দণ্ড ভোগ করছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত অনেকবার তার জামিন চাওয়া হয়েছে। কিন্তু জামিন পাওয়া যায়নি, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার চিকিৎসকরা ২৮ অক্টোবর প্রেস কনফারেন্স করে বলেছেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য আগের চেয়ে ভালো। বিএনপি যদিও চিকিৎসকদের বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছে।
জামিন পাওয়া না পাওয়া আদালতের এখতিয়ার। কিন্তু বিএনপি নেতারা অভিযোগ করছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জামিন দিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন সম্ভব নয়। অবশ্য হাইকোর্টের বিচারপতি এনায়েতুর রহিম তাকে একবার জামিন দিয়েছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট জামিন স্থগিত করে দিয়েছেন। আমার কথা হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে প্রেসার সৃষ্টি করতে না পারলে খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে শেখ হাসিনা কেন চিন্তা করবেন!
খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন দেড় বছরের ওপর। তার দল দেশব্যাপী তার মুক্তি চেয়ে একটা পোস্টার পর্যন্ত লাগায়নি। মাঝে মাঝে বিএনপির আবাসিক নেতা রুহুল কবির রিজভী একশ’-দেড়শ’ লোক নিয়ে একটি মিছিল বের করেন। বিএনপির নয়াপল্টনের সদর দফতর থেকে বিজয় নগরের নাইটিংগেল রেস্তোরাঁ পর্যন্ত এসে আবার বিএনপি কার্যালয়ে ফিরে যায়। বিএনপি নেতারা বলেন, এটা রিজভীর ‘চাকরি রক্ষার’ মিছিল।
গত ৫-৬ দিন আগে দেখলাম সায়েন্স ল্যাবরেটরির শেষ মাথা থেকে ৭০-৮০ জন লোকের একটা মশাল মিছিল এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যালের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বাটার মোড়ের কাছাকাছি আসার পর মিছিলটি টহল পুলিশের সামনে পড়ে। আর তাৎক্ষণিকভাবে মিছিলকারীরা মশাল ফেলে পালিয়ে যায়। ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে তো আন্দোলন-সংগ্রাম হয় না। ওই মিছিলও নাকি অরগানাইজ করেছিলেন ‘আবাসিক নেতা’ রিজভী সাহেব। মিছিলটা দেখে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ করেছি। কিন্তু মিছিলকারীদের কোনও পাত্তা পাওয়া যায়নি পরে।
বিএনপির মূল নেতা বর্তমানে তারেক রহমান। ঢাকা অফিস যেকোনও কর্মসূচি, সিদ্ধান্তের জন্য তারেক জিয়ার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। অবশ্য লন্ডন থেকে ভালো কোনও সিদ্ধান্ত আসে বলা যায় না। অপারগ হয়ে বিএনপি এমপিদের সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং গোপন ব্যালটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়া সম্প্রতি তারেক জিয়ার কোনও ভালো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চোখে পড়েনি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারেক জিয়া বিতর্কিত। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে চীনের ‘এক চীন নীতির’ বিরুদ্ধে ঢাকায় তাইওয়ানের বাণিজ্য মিশন খোলার নেপথ্যে ছিলেন তারেক জিয়া। মাঝখানে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের কাছে তারেক জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা মোটেও নেই। অথচ ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখে। ভারত মনে করে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান উলফার কাছে যাচ্ছিল এবং অস্ত্রের ব্যাপারে উলফাকে সহায়তা করেছিলেন তারেক জিয়া। তারেকের পরামর্শে গত বছর তিন সদস্যের বিএনপির এক প্রতিনিধিদল দিল্লি গিয়েছিল। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা সাক্ষাৎ করেছেন।
সম্ভবত উল্লেখযোগ্য তেমন কোনও সাড়া পাননি। তারেক জিয়া এই তিন জনকে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করার একটা ডায়ালগ ওপেন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের কারণে উৎসাহব্যঞ্জক কোনও অগ্রগতি হয়নি। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনও তৎপরতা নেই। ভারতকে পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নির্মূল করার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। শেখ হাসিনা কখনও ভারতের বিএনপি প্রীতি বা তারেক প্রীতি পছন্দ করবেন না। যে কারণে ভারত কখনও শেখ হাসিনাকে চটাতে চাইবে না—এটাই বাস্তবতা।
খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকার সময় পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে উল্লেখ করেছিলেন। আবার ২০১৩ সালের মার্চে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের সময় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে তার সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিল করেও খালেদা জিয়া ভারতকে অপমানিত করেছেন। এসবই পুরনো খবর। কিন্তু এসবের ক্ষত নিয়ে সহজে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। বলতে গেলে খুবই ক্ষীণ।
যাহোক, বিএনপি দেশের প্রধান দুই দলের মধ্যে একটা। বিএনপি এখন বিরোধী দলে রয়েছে। সংসদে বিএনপি বিরোধী দল না হলেও মানুষের বিবেচনায় বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রকৃত বিরোধী দল। বিএনপির এখন সম্পদ হলো তার জনসমর্থন। নেত্রী হিসেবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জনপ্রিয় নেত্রী। এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু বর্তমানে তিনি জেলে। অবশ্য বাইরে থাকলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে দল পরিচালনায় আগের মতো সক্ষম হতেন না। খালেদা জিয়ার পরেই তার দলে জনপ্রিয় ব্যক্তি তারেক রহমান, কিন্তু দলের কাছে জনপ্রিয় হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে তিনি হাওয়া ভবন প্রতিষ্ঠা করে যেভাবে ‘বিকল্প সরকার’ চালিয়েছিলেন, তাতে মানুষ তার ওপর এখনও অসন্তুষ্ট।
আওয়ামী বিরোধী বিরাট একটা জনগোষ্ঠীর সমর্থন বিএনপির পেছনে রয়েছে। বিএনপি যদি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে নির্বাচন পর্যন্ত যেতে পারে, তবে একটা ভালো ফল প্রত্যাশা করতে পারে। আবার নির্বাচনকে বাণিজ্য মনে করলে সব প্রত্যাশা পুনরায় চুরমার হয়ে যাবে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে উলঙ্গভাবে। এতে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে ব্যাপক। দলের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি একাদশ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে সেটি মানুষ অবিশ্বাস করেনি সত্য, কিন্তু তাদের দাবির প্রতি মানুষের সহানুভূতি ছিল না। মানুষ দেখেছে নির্বাচনকে বিএনপি সিরিয়াসলি নেয়নি। নির্বাচনে অনিয়মের প্রতিবাদে বিএনপি নিজেও মাঠে নামেনি।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অন্য কোনও দল নেই। তাই মনে হয়, আওয়ামী লীগবিরোধী জনগোষ্ঠী তাদের সমর্থন এখনও বিএনপির প্রতি অক্ষুণ্ন রেখেছে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এককভাবে খুবই জনপ্রিয় নেত্রী। এখন তিনি যে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সফলভাবে শেষ করতে পারলে তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে।
আবার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শেখ হাসিনার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। চিরদিন মানুষ কারও পক্ষেও থাকে না, আবার বিপক্ষেও থাকে না। শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযান সফল হলে আওয়ামী লীগবিরোধী জনগোষ্ঠীর মাঝে আবার হতাশা অবধারিত। তখন বিরোধিতাকারীদের একটি গোষ্ঠী অহেতুক বিরোধিতা ত্যাগ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানাতে পারে। কারণ, সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার বিকল্প নেতৃত্ব এখনও দেশে গড়ে ওঠেনি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ