গ্যাস নিয়ে খামখেয়ালিপনা মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৪১, অক্টোবর ৩১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৪, অক্টোবর ৩১, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীতরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করে গ্যাস সহজলভ্য করে রাখা যাবে। জাপান তো এখন তরল গ্যাস দিয়ে চলছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তারা তরল গ্যাস আমদানি করে। বাংলাদেশও তরল গ্যাস আমদানি করছে। মহেশখালীতে ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের পর তরল গ্যাসকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে ন্যাশনাল গ্রিডে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস যা মজুত রয়েছে, তা দিয়ে ১০-১২ বছরের ওপর চলবে না। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান করে আবিষ্কার করতে না পারলে বাংলাদেশকেও এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হবে। এলএনজির মূল্য বেশি। জাপান ধনী দেশ। তাদের পক্ষে এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হওয়া সম্ভব, কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে তিতাস, বাখরাবাদ, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, মেঘনা, সিলেট, কৈলাসটিলা-১, কৈলাসটিলা-২, বিয়ানীবাজার, রশিদপুর, জালালাবাদ, সাঙ্গু, মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা, ফেনী ও ভাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবিষ্কৃত। এসব ক্ষেত্র থেকেই আমরা গ্যাস পেয়ে থাকি। অথচ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও গ্যাস অনুসন্ধানের কোনও কাজ হয়নি। ভূতাত্ত্বিকরা আশা করেন, বাংলাদেশ অনুসন্ধান চালালে আরও বহু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হবে।

বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করেছে। সমুদ্রের জলভাগে বাংলাদেশের সমান আরেকটা অংশ আদালতের রায়ে পেয়েছে। ভারত এবং মিয়ানমার তাদের জলসীমার মধ্যে অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাস উত্তোলনের কাজ আরম্ভ করেছে। মিয়ানমার তার গ্যাস ভারতের কাছে বিক্রি করতে চেয়েছিল এবং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ত্রিদেশীয় পাইপলাইন দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিল। সে সময় বাংলাদেশ গ্যাস বিক্রির শর্তে ত্রিদেশীয় পাইপলাইন বসানোর অনুমতির কথা বললে হয়তো মিয়ানমার গ্যাস বিক্রিতে সম্মত হতো। কিন্তু বাংলাদেশ পাইপলাইন বসাতে রাজি হয়নি, আর গ্যাসও বিক্রি করেনি।

পরবর্তীতে মিয়ানমার তার সম্পূর্ণ গ্যাস চীনের কাছে বিক্রি করে দেয়। এখন পাইপলাইন বসিয়ে চীন মিয়ানমার থেকে গ্যাস নিচ্ছে। তখনকার বিএনপি সরকার কোন যুক্তিতে পাইপলাইন বসাতে দিলো না জানি না। তবে তাদের নাকি ধারণা ছিল—গ্যাস পাইপলাইন নিতে দিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর এক লেখায় পড়েছিলাম, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো নাকি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে লাফালাফি করলে তার হাসি পায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি দুইটি রাষ্ট্রকে বলে তোমরা একত্রিত হয়ে যাও এবং তারা উভয় রাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যি চায়, তবে ওই রাষ্ট্র দুটির পক্ষে একত্রিত না হয়ে অন্য পথে পা বাড়ানো সম্ভব নয়। যতটুকু মনে পড়ে তার ‘দ্য মিথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ বইতে আছে কথাগুলো।

খালেদা জিয়ার সরকার সাবমেরিন ক্যাবল বাংলাদেশের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সংযোগ নেয়নি। তারা তখন বিনে পয়সায় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারকে পরবর্তী সময়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নিতে হয়েছে। যারা দেশ চালায় তারা শুধু রাজস্ব খেয়ে ঋণ করে দেশ চালালে চলে না, চোখ-কান খোলা রেখে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এত দ্রুত যে, সে অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে হয়।

যাহোক, বলেছিলাম এলএনজি গ্যাস ক্রয়ের কথা। গ্যাসের মূল্য, পরিবহন খরচ, টার্মিনাল ভাড়াসহ গ্যাসের মূল্য পড়ে ৩২ দশমিক ৩১ টাকা। আর দেশীয় গ্যাসের মূল্য পড়ে প্রতি ঘনমিটার ৭ টাকা ৩৫ পয়সা। ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে অর্থাৎ ১৩ মাসে খরচ হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। আর তা বিক্রি করে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা লোকসান, অর্থাৎ ভর্তুকি।

গ্যাসের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। সরকারের পক্ষে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান বা ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হবে কি-না তা আগেভাগে বিবেচনা করতে হবে, না হয় ভর্তুকি প্রত্যাহার করলে সব জিনিসের মূল্য বেড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। তখন গণঅসন্তোষ এত ব্যাপক হবে যে দেশ চালানো অসম্ভব হয়ে যাবে। দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাসের অনুসন্ধান হয়নি এবং গত ২০ বছরে পেট্রোবাংলা গ্যাস অনুসন্ধানের কোনও উদ্যোগ নেয়নি। অনুসন্ধানের প্রতি সরকারের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

আর বিশ্ব আদালত সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ভারত-মিয়ানমার তা মেনে নিয়ে তাদের স্ব-স্ব এলাকায় গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করে দিয়েছে। অথচ আমরা অনুসন্ধানের কাজ পর্যন্ত করিনি। শুধু সমুদ্র বিজয়ের আহ্লাদে ৩-৪ বছর বগল বাজালাম অথচ নিষ্কণ্টক বাংলাদেশের সমান একটা জায়গা জলভাগে পড়ে আছে, যেখানে গ্যাস পাওয়ার বিষয়টি সুনিশ্চিত।

আমেরিকার এক পত্রিকায় একটি আর্টিক্যাল পড়েছিলাম। তাতে লেখক ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলেছেন, বাংলাদেশের জলসীমায় ২০-২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ আছে। পদ্মা সেতুর প্রয়োজন আছে, তবে পদ্মা সেতুর চেয়ে সম্পদ বাড়ানোর উদ্যোগ আরও বেশি প্রয়োজনীয় ছিল। কয়েক মাস আগে ব্রুনাই সফরে গিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রুনাইয়ের সমুদ্রে তেল-গ্যাস রয়েছে এবং তাদের সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমাদের কিন্তু সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনশক্তি নেই। মনে করেছিলাম আমাদের প্রধানমন্ত্রী ব্রুনাইয়ের সুলতানের কাছে হয়তোবা এদেশের সমুদ্রে তেল-গ্যাস আহরণের ব্যাপারে সাহায্য চাইবেন, কিন্তু এমন কোনও আলোচনা হয়েছে বলে মনে হলো না।

বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় মোট ২৬টি তেল-গ্যাস ব্লক রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি অগভীর অংশে ও ১৫টি গভীর সাগরে। এর ২২টিতে কোনও কার্যক্রম নেই আর চারটি ব্লক যেসব কোম্পানিকে লিজ দেওয়া হয়েছে তারাও তেমন উৎসাহ নিয়ে কাজ করছে না। ভারত আর মিয়ানমার তাদের সীমানায় প্রচুর গ্যাস পেয়েছে। বাংলাদেশের সীমানায়ও প্রচুর গ্যাস পাওয়া যাবে, এটা প্রায় নিশ্চিত।

সহজলভ্য গ্যাস ফেলে রেখে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির দিকে যাওয়া আমাদের উচিত হচ্ছে না। আমাদের প্রবৃদ্ধি যতই বাড়ুক, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তেমন মজবুত নয়। সুতরাং আমরা আশা করব আমাদের সরকার খুব দ্রুত স্থলভাগে ও জলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ আরম্ভ করবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ