টর্চার সেল, সে তো একাত্তরে ছিল!

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৯:৪৯, নভেম্বর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৭, নভেম্বর ১০, ২০১৯

শান্তনু চৌধুরীরাজশাহী সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিতের পর পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনার সূত্র ধরে একের পর এক বেরিয়ে আসছে সেখানে টর্চারের নানা তথ্য। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, রাজশাহী সরকারি পলিটেকনিকের সব ধরনের উন্নয়ন কাজের টেন্ডার, মেয়েদের যৌন হয়রানি, নবীনবরণসহ নানা অজুহাতে চাঁদাবাজি, পরীক্ষায় পাস করে দেওয়ার নামেও চাঁদাবাজিতে জড়িত ছাত্রলীগের  নেতাকর্মীরা। তাদের মতের বাইরে কোনও শিক্ষার্থী অবস্থান নিলেই তাকে ‘১১১৯’ নম্বর কক্ষে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়। রাজশাহী পলিটেকনিকে ছাত্রলীগ যেন এক আতঙ্কের নাম। এই ঘটনাটি সাম্প্রতিক বলে শুরুতে উল্লেখ করলাম। তবে একটি বিষয় সত্য যে গেলো এক বছরে হঠাৎ করেই আলোচনায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে, মেডিক্যাল, বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় র‌্যাগিং বা টর্চারের বিষয়টি। তার মানে কি ক্ষমতাসীনদের লেজুড়ে থাকা ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা আগে টর্চার করতো না? করতো, এবং বেশ ভালোভাবেই করতো। কিন্তু সম্প্রতি সেটা একদিকে মাত্রাছাড়া হয়ে পড়া, একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আর যারা এই ঘটনার শিকার হচ্ছেন তারা বা সহপাঠীরা এটা নিয়ে সাহসী হয়ে ওঠার কারণে সেটি আরও বেশি প্রকাশ পাচ্ছে এবং সেই প্রকাশের প্রয়োজনও রয়েছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল পরিদর্শন করে উপাচার্য (তখন তিনি ভারপ্রাপ্ত ছিলেন) অধ্যাপক ড. শিরিন আখতার চবিতে টর্চার সেল থাকার কথা ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। সংবাদটি দেখে একটু হাসি পেলো। তা তিনি ভিত্তিহীন বলতেই পারেন! কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, টর্চার সেলতো আর এভাবে খুঁজে বের করা যায় না, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কোনও একটি রুমকে নির্দিষ্ট করা হয়, সেখানে অনেক সময় লাঠি বা আঘাত করার যন্ত্রপাতি থাকলেও থাকতে পারে আবার সেগুলো ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের রুমেও থাকতে পারে। কাজেই অনুসন্ধানী দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া সাধারণভাবে রুমে রুমে তল্লাশি চালালেও সেখানে যে কিছু মিলবে না সেটা বলাই বাহুল্য। আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম তখন ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরকে দেখেছি। দুটো সংগঠনই ছিল র‌্যাগিং বা টর্চারের জন্য শীর্ষে। ছাত্রশিবির র‌্যাগিংকে প্রায় ‘শৈল্পিক’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল! বিষয়টি কেমন, কাউকে রাতে টর্চার করা হবে ঠিক করা হলে ভোর থেকে তাকে নানাভাবে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে রাখা হতো। যেহেতু হলে থাকতে হবে, ওই শিক্ষার্থীর মেনে নেওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না। আবার এমন এমন অস্ত্র প্রয়োগ করে টর্চার করা হতো যা ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়। এর মধ্যে একটার কথা বলা যেতে পারে, মোজার মধ্যে বালু ঢুকিয়ে রডের মতো বানিয়ে পেটানো। অন্যদিকে ছাত্রলীগের বিষয়টা ছিল ধুপধাপ। এই কাউকে পেলো তো মারলো। আবার রুমে ডেকে নিয়ে আদব-কায়দা শেখানোর নামে নানাভাবে নির্যাতন। র‌্যাগিং বা টর্চারের আচরণ যতই ভয়ানক হোক না কেন, সবচেয়ে অবাক লাগে বুয়েট, মেডিক্যাল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের মতো মেধাবীরাই সেটা বেশি চর্চা করে দেখে। এটাকে তারা ‘মজা’, ‘আদবকায়দা শেখানো’ বা ‘সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কে জানার’ নামে প্রচার করে বেড়ায়। সাধারণ র‌্যাগিংয়ের মধ্যে যেগুলো দেখা যায়, নতুন আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাজে আচরণ করা, নেতাদের নাম মুখস্থ করা, ওই শিক্ষার্থীদের ক্লাসের কোনও বান্ধবীকে নিয়ে অশ্লীল কথা বলা, বাবা মা বা এলাকার নাম নিয়ে অশ্লীল কথা বলা, গোল হয়ে কথিত বড়ভাইয়েরা বসে নগ্ন হয়ে নাচানো, এখন আবার যোগ হয়েছে মোবাইলে সেগুলো ভিডিও করে রাখা, সবার সামনে যৌন অভিনয়ে বাধ্য করা, পেস্ট বা সিগারেট খেতে বাধ্য করা, পর্নো দৃশ্য দেখতে বাধ্য করা বা পর্নো বই পড়ানো, রাতে মশার কামড় খাওয়ানোর জন্য বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে ওঠবোস, বুকডন, মুরগি হয়ে বসিয়ে রাখা, কোনও মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে বাধ্য করা, শীতের মধ্যে পানিতে হাতে ইট দিয়ে নামানো। শীতের রাতে সিনিয়রদের কাজে বাইরে পাঠানো, সিগারেট-গাঁজা-মদপানে বাধ্য করা, ম্যাচের কাঠি দিয়ে রুম বা মাঠের মাপ নেওয়া ইত্যাদি। এসব করার ফাঁকে ফাঁকে চড় মারাসহ নানা ধরনের অত্যাচার চলতে থাকে।

যারা একটু বয়সে সিনিয়র, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন বা সে সময়ের অনেক কাহিনি শুনেছেন, তারা সাধারণত টর্চার সেল কথাটি শুনলে সে সময়ে পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের নির্যাতনের জন্য তৈরি করা বাড়ি বা কক্ষকে বোঝেন। প্রায় প্রতিটি জেলা বা উপশহরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় টর্চার সেল ছিল। তেমন একটি টর্চার সেল চট্টগ্রামের মহামায়া ডালিম হোটেল নিয়ে নিজে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম। যেটি ছিল মূলত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত রাজাকার মীর কাশেম আলীর টর্চার সেল। যেটির নাম শুনলেই এখনও চট্টগ্রামের প্রবীণ লোকজন আঁতকে ওঠেন। তাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের টর্চার সেলের নাম শুনে একটু অবাক হয়েই জানতে চাইলেন, টর্চার সেল তো শুনেছি একাত্তরে ছিল! এখনও আছে?

হলগুলোতে হত্যা বা টর্চারের রাজনীতি অবশ্য বেশ পুরনো। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের এপ্রিলের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিকিৎসার জন্য মস্কো যান। ৪ এপ্রিল রাতে ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য  সেন হলের ৬৩৫ নম্বর রুম থেকে ছাত্রলীগের নেতা কোহিনূরসহ চারজনকে ধরে নিয়ে আসে মহসীন হলের টিভিরুমের সামনে। অস্ত্রধারীদের আরেকটি দল ৬৪৮ নম্বর রুম থেকে আরও তিনজনকে একই কায়দায় সেখানে নিয়ে আসে। রাত ২টা ১১ মিনিটে ওই সাতজন ছাত্রকে লক্ষ করে ‘ব্রাশফায়ার’ করে তারা। এরপর ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঘটনাস্থল ছাড়ে অস্ত্রধারীরা। এখানে কিন্তু দু’পক্ষই ছাত্রলীগ। নিহত শিক্ষার্থীরা আওয়ামী যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির সমর্থক ছিলেন। প্রতিপক্ষের উসকানিতে শফিউল আলম  প্রধান এ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরদিন হত্যার বিচারের দাবিতে যে মিছিল হয়, তাতেও তিনি নেতৃত্ব দেন। তিন দিন পর গ্রেফতার করা হয় প্রধানকে। হত্যাকারীদের মধ্যে যারা রাজসাক্ষী হয়েছিলেন, তাদের বর্ণনায় উঠে আসে খুনের ভয়ঙ্কর বিবরণ। আওয়ামী লীগ শাসনামলেই মহসীন হলের সাত হত্যার বিচার হয়। বিচারে প্রধানের যাবজ্জীবন শাস্তি হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে মুক্তি দেন শফিউল আলম  প্রধানকে। মাঠে নামানো হয় আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিতে। এরপর ক্যাম্পাসে তাণ্ডব শুরু করে ছাত্রদল। মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে জিয়াউর রহমান হিজবুল বাহারে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে এসে গোলাম ফারুক অভির মতো অনেক মেধাবী ছাত্র পরিণত হন সন্ত্রাসীতে।

গত বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলে একটি ক্যালকুলেটরকে কেন্দ্র করে করে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা মারধর করে রক্তাক্ত করেছিল এহসানকে। এহসানকে রড দিয়ে বেদম পেটায় ছাত্রলীগের ওমর ফারুক এবং তার বন্ধুরা। এ সময় এহসান চোখে মারাত্মক আঘাত পান এবং অজ্ঞান হয়ে যান। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রকে হলের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল ছাত্রনেতাদের ‘অবাধ্য’ হওয়ায়।  শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম হলে ‘কেউ হলে লুঙ্গি পরে ঘুরছিলেন’ ‘কেউবা সালাম দিতে দেরি করেছেন’ এমন অপরাধে বেদম মারা হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। চলে মানসিক নির্যাতনও। আবরারকে পিটিয়ে মারার পর আলোচনায় আসে বুয়েটের টর্চার সেলের বিষয়টি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে দু’টি রুম ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতো ছাত্রলীগ। ডিএমপি ডিবি শাখা নির্যাতনে ব্যবহৃত লাঠি, স্ট্যাম্প, রড, চাকু ও দড়ি উদ্ধার করেছে সেখান থেকে। এমন চিত্র বাংলাদেশের কলেজ লেভেল থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র। এর মধ্যে যেখানে একেবারে ছাত্ররাজনীতি নেই বিশেষ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বা গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র আলাদা। টর্চার চলা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খবর হয়তো বাইরে আসে না সংবাদ মাধ্যমের উপযোগিতা না থাকার কারণে। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নাগাল পায় না। এসব টর্চারের কারণে কত শিক্ষার্থীর জীবন যে অকালে ঝরে গেছে তার হিসাবই বা কোথায়। সম্প্রতি যেটা সবচেয়ে বেশি আলোচিত তা হলো, এমন ঘটনায় ওই শিকার শিক্ষার্থীকে ‘শিবির’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা। মতের ভিন্নতা হলেই যে তাকে টর্চার করতে হবে বা মেরে ফেলতে হবে, সেটাই বা কে শেখাচ্ছে কে জানে!

এখন প্রশ্ন এসব ঘটনা কি কখনও বন্ধ হবে না? শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে ঘটনা এলেই আলোচনা হবে? এসব বন্ধ করতে হলে প্রথমেই যেটি দরকার, তা হলো শিক্ষকদের ছাত্র সংগঠনের নতজানু ভূমিকা ছাড়তে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে হতে হবে অনেক কঠোর আর প্রয়োগ করতে হবে তার ওপর দেওয়া ক্ষমতা। বাস্তবতা হলো, হলের প্রভোস্ট বলেন, আর উপাচার্য বলেন এরা যেহেতু নিজেদের পদে থাকতে সচিবালয় থেকে শুরু করে মন্ত্রীদের দফতরে দফতরে গিয়ে লবিং করেন, উপাচার্য হওয়ার জন্য মন্ত্রীর পা ধরে বসে ছিলেন এমন নজিরও রয়েছে, আবার অনেক উপাচার্য তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করা শিক্ষার্থীদের পেটানোর জন্য ছাত্রলীগ বা ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ দেন। তাদের পক্ষে কঠোর হওয়াটা মুশকিল। কারণ যে প্রশাসন এসব বন্ধ করতে কঠোর হবে, তারাই ছাত্র সংগঠনের নেতাদের তোয়াজ করে লাভজনক পদে বসে আছে। তারা কঠোর না হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাগ্য বদলাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  বলেছেন, ‘নামমাত্র টাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারা পড়াশোনা করছে ও আবাসিক হলে কারা থাকছে, কারা মাস্তানি করছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনও অনিয়ম সহ্য করা হবে না। সরকারের খরচে হলে বসে জমিদারি চলবে না, আমি কোনো দল-টল দেখব না।’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান  থেকে অপরাজনীতির মূলোৎপাটনে এ ধরনের কঠোরতাই প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির নামে আধিপত্য বিস্তারের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। শিক্ষক বা ছাত্রদের রাজনীতির চেয়ে পড়ানো বা পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে হবে বেশি। সাময়িক সময়ের জন্য হয়তো যারা এসব মাস্তানির সুযোগ নিচ্ছে, ভাবছে এ দিয়ে বুঝি জীবন চলবে। কিন্তু হল ছাড়ার পরই বুঝবে, এই বিপুলা পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াই কতটা কঠিন।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ