নির্বাচনের পরও কি ব্রেক্সিট প্রশ্নে গণভোট অনিবার্য?

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৫:১৪, নভেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৫, নভেম্বর ১২, ২০১৯

আনিস আলমগীরথেরেসা মে এবং বরিস জনসন প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের ওপর একটি চুক্তির মুসাবিদা ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে দিয়ে পাস করানোর জন্য। কিন্তু সম্ভব হয়নি। থেরেসা মে’র পর বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হয়ে চেষ্টা করেছিলেন প্রয়োজনে চুক্তি ছাড়াই ইউনিয়ন ত্যাগ করার জন্য। কিন্তু পার্লামেন্ট তাও করতে দেয়নি জনসনকে। বরং তারা নতুন একটা নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংসদের নতুন নির্বাচন হবে আগামী ১২ ডিসেম্বর।
নির্বাচনি প্রচারণা আরম্ভ হয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাট এবং গ্রিন পার্টি কিছু আসনে সমঝোতা করে একক প্রার্থী দিয়ে আরও একটা ছোট দলকে নিয়ে নির্বাচন করছে। তারা ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে নয়। তাদের বিপরীতে ব্রিটেনের বৃহত্তর দুই দল লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ দল তো আছেই। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আর লেবার পার্টির নেতা হচ্ছেন জেরেমি করবিন।
অন্যদিকে রাজনীতির মাঠে নতুন চমক দেওয়া ব্রেক্সিট পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০১৭ সালে কনজারভেটিভ যেখানে জিতেছে, সেখানে তারা প্রার্থী দেবে না। তাদের লড়াই লেবার পার্টিকে ঠেকানো। আপাতত জনমত জরিপে লেবার নাকি দশ পারসেন্ট ব্যবধানে পিছিয়ে আছে। অবশ্য ব্রিটেনে এমন গুঞ্জন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নাকি তার নির্বাচনি এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে আসবেন না, কারণ তার নির্বাচনি এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নাকি ইউনিয়ন ত্যাগের বিরুদ্ধে। জেরেমি করবিন তার এলাকা থেকে এ পর্যন্ত সাতবার নির্বাচন করেছেন। তিনি কোনও নির্বাচনে পরাজিত হননি। ব্রিটেনের মানুষ বলছেন, করবিন এবারও নির্বাচিত হবেন, কিন্তু মুশকিল হলো লেবার পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে কিনা সেটা নিয়ে।

কারণ জেরেমি করবিনের বিরুদ্ধে ধনবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু একজোট হয়েছেন তাকে ঠেকানোর জন্য। করবিনের অপরাধ হলো তিনি সত্যকে সত্য বলেন। কারও বন্ধুত্বের প্রত্যাশায় অন্যায়কে কখনও সমর্থন করেন না।

মানুষের পক্ষ অবলম্বন করে ধনবাদীদের অনাচার ঠেকানোর কথা বলেন করবিন। টনি ব্লেয়ারের পরে তিনি কখনও লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হতে পারতেন না, যদি শুধু তাকে লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্যদের ভোটের ওপর নির্ভর করে নেতা নির্বাচিত হতে হতো। নিয়ম অনুসারে সাধারণ সদস্যরাও নেতা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। তাই তিনি লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে লেবার পার্টির কোনও প্রধানমন্ত্রী কখনও মন্ত্রিসভায় নেননি। এমনকি ছায়া মন্ত্রিসভায় পর্যন্ত তাকে কখনও কেউ মন্ত্রী করেননি।

বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর করবিন তার ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কারণ লেবার পার্টির অনেক বিজ্ঞ পার্লামেন্ট সদস্য তার ছায়া মন্ত্রিসভায় যোগদান করতে চাননি। কারণ তাকে দিয়ে কোনও কায়েমি স্বার্থের উদ্দেশ্য সফল করা যাবে না, সম্ভবত এই ভয়ে।

যাক, লিখছিলাম ব্রেক্সিট প্রসঙ্গে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে দ্বিতীয়বার সময় চেয়েছিল। ইউনিয়ন ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমা বর্ধিত করেছে, তবে ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জিতে হয়তোবা কনজারভেটিভ পার্টি সরকার গঠনের মতো সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে, তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেউ পাবে না। আগামী পার্লামেন্টও ব্রেক্সিট সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবে বলে মনে হয় না। অবলুপ্ত হওয়া পার্লামেন্ট দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরেও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। আবার নন ব্রেক্সিট সম্পর্কেও মতৈক্যে উপনীত হতে পারেনি। এখন বিষয়টি জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। নির্বাচনের পর ব্রেক্সিট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোনও দল পাবে বলে মনে হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতি যদি সৃষ্টি হয় তবে কোন পথ খোলা থাকবে, যে পথে হাঁটলে সমাধানে পৌঁছানো যাবে? আবার গণভোটের আয়োজন করা। অবশ্য তখন তৃতীয়বারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনকে সময় নিতে হবে। গণভোটের জন্য আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনকে গণভোট আয়োজনের জন্য ৪-৫ মাস সময় দিতে হবে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপ ফর চেঞ্জ, গ্রিন পার্টি, লেবার পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাট—এরা সবাই গণভোট সমর্থন করবে।

আমার মনে হয় ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পার্লামেন্টে এমন কোনও দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসতে পারবে না যারা একক কোনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে। সুতরাং গণভোটে যাওয়া ছাড়া তখন কোনও বিকল্প থাকবে না। শেষ পর্যন্ত হয়তো গণভোট ব্রেক্সিট সমস্যা সমাধানের জন্য চূড়ান্ত পন্থা হিসেবে গৃহীত হবে।

গতবার গণভোটে সামান্য ভোটের ব্যবধানে ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কিন্তু এবার গণভোট হলে ইউনিয়নে থাকার সিদ্ধান্ত আসবে। আর ইউনিয়নে থাকার সিদ্ধান্ত না নিলে তো যুক্তরাজ্যও ভেঙে যাবে। কারণ স্কটল্যান্ডও বলেছে যুক্তরাজ্য ইউনিয়ন ত্যাগ করলে তারাও যুক্তরাজ্য থেকে বের হয়ে যাবে। সুতরাং ইউনিয়নে থাকার পক্ষে রায় হবে বলে বিশ্বাস।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ