আ. লীগে 'শুদ্ধি অভিযান' ও বিএনপিতে দলত্যাগের শঙ্কা

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৯:২৫, নভেম্বর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৮, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় একদিকে দল যেমন অনেকটাই সরকারের মধ্যে ঢুকে গেছে, অন্যদিকে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আখের গোছানোর বেপরোয়া মনোভাব। দেশে যেমন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে, তেমনি সরকারি দলের অনেকেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করেছে অস্বাভাবিকভাবে। আওয়ামী লীগ দিন দিন একটি জনবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হচ্ছিল। নেতৃত্বের কোন্দল সব জায়গায় তীব্র হয়ে উঠেছে। দলের দিকে মনোযোগ না থাকায় ‘শত্রুপক্ষ' ঢুকে পড়েছে আওয়ামী লীগের ঘরে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নজর এড়ায়নি বিষয়টি। বিরোধী দলের অপরাজনীতি মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় নিজের ঘরে তিনি এতোদিন চোখ ফেলতে পারেননি। তবে দেশের রাজনীতিতে নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার পর এখন তিনি ঘর গোছানোর কাজে হাত দিয়েছেন। দলের মধ্যে যারা এরই মধ্যে বোঝা হয়ে উঠেছে, তাদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই কাজটি খুব কঠিন নয়। যারা দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন-অপকর্মে জড়িত, সংখ্যায় কম হলেও তাদের শেকড় ছড়ানো থাকে নানাভাবে, নানা দিকে। নানা অপশক্তির সঙ্গেও থাকে তাদের সম্পর্ক, যোগসাজশ। প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত অংশের সঙ্গেও থাকে তাদের সখ্য। ফলে ‘আগাছা' পরিষ্কারের কাজটি সহজ হয় না। কিন্তু নিরাপদ রাখতে হলে জমিতে আগাছা রাখা চলে না। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থাকতে নিজের ঘরে কোনও সমস্যা দেখে না। ময়লা পরিষ্কার না করে কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে রাখে।

শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, তিনি গতানুগতিক ধারায় রাজনীতি করেন না। তিনি তার একটি নিজস্ব স্টাইল তৈরি করেছেন। রাজনীতিকে তিনি একটি সৃজনশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে যখন যে উদ্যোগ বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, তখন সেটা করছেন। তাকে নির্বান্ধব  বা একা কিংবা বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করতে গিয়ে তার বিরোধীরা নাকানিচুবানি খেয়েছে। বিএনপি-জামায়াত দোর্দণ্ডপ্রতাপে বেড়ে উঠছিল। তাদের মোকাবিলা করা অসম্ভব বলে যখন অনেকের কাছে মনে হয়েছে, তখন শেখ হাসিনা ধৈর্য ও সহনশীলতার পথ অনুসরণ করে সুফল পেয়েছেন। বিরোধীরা যখন কোণঠাসা, তখন শেখ হাসিনা নিজের দলের দুর্বলতা দূর করতে মনোযোগী হয়েছেন। তিনি যেহেতু ভয় করেন না, তিনি যেহেতু সাহসী, সেহেতু দল পরিচ্ছন্ন করার কাজেও তিনি সফল হবেন বলেই আশা করা যায়।

আওয়ামী লীগ এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের বার্তা সবাই পেয়ে গেছে। রাতারাতি সব সাফসুতরো হয়ে যাবে বলে যারা মনে করেন, তারা বুঝতে চান না, রাজনীতির মাঠটা ফুটবল খেলার মাঠের মতো মসৃণ নয়। অমসৃণ পথে হাঁটতে হাঁটতেই তাকে মসৃণ করতে হয়। এপর্যন্ত এটা আমরা দেখেছি, শেখ হাসিনা যা করতে চেয়েছেন তা করেছেন। তিনি অঙ্গীকার রক্ষায় দৃঢ়। তাই যারা তার সরকারের সুনাম নষ্টের কারণ হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছেন।  যারা বিতর্কিত, যাদের কারণে দল ও সরকারের সুনাম নষ্ট হয়েছে, তাদের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। দল পুনর্গঠনের প্রশ্নে শেখ হাসিনা কঠোর মনোভাব নিয়েই অগ্রসর হচ্ছেন। আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নেও তিনি অনমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছেন।

ডিসেম্বরে জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নতুন নেতৃত্ব নিয়ে নতুন শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। দলের ভেতরের বিরোধ-অনৈক্য দূর করে দলের অবস্থান সংহত করার সর্বাত্মক চেষ্টা নেওয়ার কথাই শোনা যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালনের সময় ঘর থেকে যাতে বিব্রত হতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পরিকল্পনা সাজিয়েছেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগেই ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন শেষ হবে। কৃষক লীগ এবং শ্রমিক লীগের সম্মেলন শেষ হয়েছে। যাদের নাম সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় ছিল, তারা বাদ পড়েছেন। যারা ছিলেন অনালোচিত, তারা দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্য সংগঠনের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটবে। যুবলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগ নিয়ে বদনাম বেশি। এই সংগঠন দুটির নেতৃত্বে ব্যাপক অদলবদলের কথাই শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেও চোখে পড়ার মতো পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে।

দলের সাধারণ সম্পাদক পদেও পরিবর্তন হতে পারে বলে আলোচনা আছে। বিশেষ করে এবার যিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাবেন, তাকে মন্ত্রিসভায় না রাখার সম্ভাবনা বেশি। সরকার এবং দলকে আলাদা করার জন্যও দলের একজন সার্বক্ষণিক সাধারণ সম্পাদক প্রয়োজন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

আওয়ামী লীগের পরিবর্তন দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা যায়। সরকারি দলে যখন শুদ্ধির আয়োজন, তখন তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিতে চলছে স্থবিরতা এবং অস্বস্তি। বিএনপি এখন সাংগঠনিকভাবে দুর্যোগকাল অতিক্রম করছে। দলের চেয়ারপারসন  খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে অনেকদিন ধরে জেলে আছেন। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থও হয়ে পড়েছেন। তাকে কীভাবে কারামুক্ত করা হবে, সেটা বিএনপির অজানা। দলের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তার ঐক্য নেই। নীতিনির্ধারকরা বিভক্ত। দলের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আইনের ভাষায় ‘পলাতক'। তারেক রহমান লন্ডন বসে যেভাবে দল চালান তাতে দলের সিনিয়র নেতারা অনেকেই অসন্তুষ্ট। কেউ কেউ দল ছাড়ছেন, কেউ বা ছাড়ার কথা ভাবছেন। দলের প্রধান দুই নেতার অবর্তমানে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে যেখানে বুঝপরামর্শে এককাট্টা থাকা দরকার ছিল, তখন দলের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস চরমে। দলের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে চলেন বলে দলের ভেতরেই অভিযোগ আছে। কেউ সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করার পক্ষে। কেউ মনে করেন, বিএনপির ডাকে আর মানুষ রাস্তায় নামবে না।  এখন সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া বিএনপির সামনে কোনও বিকল্প আছে বলে অনেকেই মনে করেন না। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কর্মীদের রাস্তায় নেমে সরকারের সঙ্গে ফয়সালা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানও ফেসবুকে উসকানিমূলক আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু এসব নেতার ডাকে কেউ রাজপথ দখলের চেষ্টা করবে বলে মনে হয় না। বরং এদের হঠকারিতায় দলকে আবারও বিপদে পড়তে হতে পারে। বিএনপি সরকারের জন্য খাল খুঁড়তে গিয়ে নিজেরাই সে খালে পড়ে খাবি খাচ্ছে।

এরমধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মোরশেদ খান দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। মূলত তারেক রহমানের সঙ্গে বনিবনা না হওয়াই তাদের দলত্যাগের কারণ বলে শোনা যাচ্ছে। সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ চারজন কেন্দ্রীয় নেতাও পপদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। নানা কারণে ক্ষোভ-অসন্তোষ ও বঞ্চনাবোধ আছে—এমন আরও কয়েকজন নেতা দল ছাড়ার কথা ভাবছেন বলে গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে। এরও আগে বিএনপি ছেড়েছেন ইনাম আহমেদ চৌধুরী, শমসের মবিন চৌধুরী এবং মোসাদ্দেক আলী ফালু। অবশ্য এই বয়স্ক নেতাদের দলত্যাগের বিষয়টিকে খুব বড় করে দেখতে চান না বিএনপির তরুণ নেতাদের কেউ কেউ। এদের আর দল এবং রাজনীতিতে দেওয়ার কিছু নেই। এরা কার্যত ‘ঝরা পাতাদের দলে'। এরা সরকারের দিক থেকে কোনও চাপ এড়ানোর জন্য বিএনপি ছেড়েছেন কিনা, সে প্রশ্নও তোলা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দলত্যাগের বিষয়টিকে একেবারে হালকাভাবে উড়িয়ে দিতে রাজি নন। পাড় ভাঙার লক্ষণ দেখা দিলে সেটাকে গুরুত্ব দিতে হয়। চোরাস্রোতে পাড় ভাঙলে তাও একসময় বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিতে পারে।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ