ডায়াবেটিস রোধে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৪:০০, নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০০, নভেম্বর ১৪, ২০১৯

সালেক উদ্দিন১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিশ্বময় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এটি একটি ক্যাম্পেইন মাত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পৃথিবীর ৭টি মারাত্মক মরণব্যাধির মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম একটি।সারা দুনিয়ায় ৪৫কোটির অধিক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশের ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন না থাকায় অধিকাংশ মানুষই ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে না। ফলে এদেশের কত মানুষ যে এই রোগে আক্রান্ত, তা নিরুপণ করা সম্ভব নয়। তবু, এদেশে প্রায় ৮০ লাখ লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের মতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অবস্থা তেমন ভালো না থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। প্রতিবছরে বাড়তে পারে আরও ১ লাখ ডায়াবেটিস রোগী। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখার শুরুতেই বলে নিচ্ছি, ডায়াবেটিস রোগের বিশেষজ্ঞ আমি নই। তবে ভুক্তভোগীদের একজন আমি।সেই সূত্রধরে এ সম্পর্কে আমার যৎসামান্য অভিজ্ঞতা এখানে শেয়ার করার চেষ্টা করছি।

ডায়াবেটিসের প্রতিষেধক ইনসুলিনের আবিষ্কর্তাদের একজন বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেন্টিংয়ের জন্মদিন অনুসারে ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ঘোষণা করে বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ঘোষণা করাহয় ১৯৯১ সালে।

ডায়াবেটিস অবশ্যই একটি বিপজ্জনক রোগ। মানবদেহে ইনসুলিন নামক হরমোনের ঘাটতি হলে ডায়াবেটিস দেখা দেয়। যখন কোনও খাবার খাই, তখন শরীর সেই খাবারের শর্করা ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়।এই গ্লুকোজ শরীরের শক্তি হিসেবে কাজ করে।শরীর যখন রক্তের গ্লুকোজকে ভাঙতে ব্যর্থ হয় অর্থাৎ ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তখনই ডায়াবেটিস হয়।এতে রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর ঘন ঘন প্রস্রাব হয়, দ্রুত ওজন কমে যায়, মুখ শুকিয়ে যায়, চোখে ঝাপসা দেখে এবং খুব সহজেই কিছুদিন পরপরই বিভিন্ন রোগ জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়। হার্ট অ্যাটাক, কিডনি বিকল, অন্ধত্ববরণ, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পচনধরা ডায়াবেটিস রোগের কুফল।

শুধু তাই নয় ডায়াবেটিস এমন একটি বিপজ্জনক রোগ, যা অন্যসব মারাত্নক রোগকে মানবদেহে অনুপ্রবেশের দরজা খুলে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ ডায়াবেটিস। রোগটি এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগের বিষয়।অথচ অসচেতনতার কারণে আমাদের দেশের ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অর্ধেকই জানেন না যে, তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে।

অতিরিক্তি ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দুর্বলতা ও বারবার বিভিন্ন রোগ-জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি মানবদেহে ডায়াবেটিসের উপস্থিতির ইঙ্গিত করে।আমেরিকান ডায়াবেটিস সোসাইটির মতে, প্রতি ২১সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর আশঙ্কা সুস্থ মানুষের চেয়ে ৫০ ভাগ বেশি।

ওপরের তথ্যগুলোর আলোকে যে কথাটি বলা খুব বেশি প্রয়োজন, তা হলো এখনই সময় ডায়বেটিস নিয়ে ভাবার, ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানার, অন্যকে জানানোর এবং সর্বপরি এর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা একবার হলে আর কখনোই ভালো হয় না, সারা জীবনের জন্য বয়ে বেড়াতে হয়। এক্ষেত্রে রোগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ জীবনযাপনের পথ খুঁজে নিতে হয়। সারাবিশ্বে এর কারণে বছরে দশ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।এই রোগটি বংশগত কারণেও হতে পারে অথবা অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, খাদ্যাভাসে অসচেতনতা, কম শারীরিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি কারণেও হতে পারে।

ডায়াবেটিস শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস অশনাক্ত থাকলে মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ। আবার শনাক্ত হলে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করাও সম্ভব। ডায়াবেটিসের থেকে রক্ষা পেতে এমনকি ডায়াবেটিস আক্রান্ত হলেও সুস্থ জীবন যাপন করায় নিচের বিষয়গুলো মেনে চলতে হয়:

১. কতটুকু খাদ্যগ্রহণ নিরাপদ তা জেনে ওই পরিমাণ সুষম খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হওয়া।

২. অতিরিক্ত চিনি অথবা চর্বিজাতীয় খাবার-ফাস্টফুড, জাংক ফুড, মদ্যপান ইত্যাদি পরিহার করে অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন।

৩ নিয়মিত খেলাধুলা অথবা হাঁটা ব্যয়াম ইত্যাদির মাধ্যমে কায়িক পরিশ্রম করা।

আমাদের দেশে এখনো ৭৫ শতাংশের বেশি পরিবারের সদস্যরা ডায়াবেটিসের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ ও তার ভূমিকা নিয়ে সচেতন নয়।ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি ও তার পরিণতির হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি।এজন্য প্রয়োজন সরকারিভাবে ডায়াবেটিস মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট কার্যকর উপায় নির্ধারণ করা।এর কুফলতা এবং প্রতিকার ইত্যাদি নিয়ে সব প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো এবং ডায়াবেটিসের চিকিৎসা সহজলভ্য করে দেওয়া।

প্রসঙ্গত, উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মরণব্যাধি এইডস সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালে বিশ্বময় এর প্রতিকারের জন্য যে প্রচারণা চালানো হয়েছিল তাতে আমরাও পিছিয়ে ছিলাম না।ফলে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এইডস এখনো সেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারেনি।ডায়াবেটিসের অবস্থাটিও তাই।এখনই প্রয়োজন এইডসের মতো ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শুধু সরকারকে কেন এ ব্যাপারে চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক, সমাজকর্মী সাংবাদিকসহ সব প্রচার মাধ্যমকে নিজ দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।তবেই সময়মতো খাদ্যভ্যাস যেমন নিরাপদ সুষম খাদ্য গ্রহণ, চিনি, চর্বিজাতীয় খাবার-ফাস্টফুড, জাংক ফুড, মদ্যপান বর্জন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন যেমন নিয়মিত খেলাধুলা, হাঁটা ব্যায়াম ইত্যাদির মাধ্যমে কায়িক পরিশ্রম করণ, অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন মাধ্যমে ৭০ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে পারবেন এবং যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন তারাও সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।

এখন থেকে আমাদের প্রতিদিনই হোক ১৪ নভেম্বর, প্রতিদিনই হোক ডায়াবেটিস দিবস, ডায়াবেটিস সম্পর্কে দেশময় সচেতনতা বৃদ্ধির প্রত্যয় নিয়ে প্রতিদিনের সূর্য উঠুক, প্রতিটি মানুষ স্ব-স্ব অবস্থান থেকে প্রতিদিন নেমে আসুক ডায়াবেটিস সচেতনতার প্রতিদিনের ক্যাম্পেইনে। সেটাই প্রত্যাশা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ