বাবরি মসজিদ পবিত্র নগরী নয় যে অব্যাহত জান দিতে হবে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৪৩, নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৫, নভেম্বর ১৪, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীদীর্ঘ ১৩৪ বছর আইনি লড়াই চালানোর পর গত শনিবার ৯ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে বাবরি মসজিদের ২ দশমিক ৭৭ একর জমির মালিকানা স্বত্ব হিন্দুদের ভগবান শ্রী রামকে দিয়েছেন। এখন সেখানে রামমন্দির প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ শাসনের সময় ফৈজাবাদের জেলা আদালতের শরণাপন্ন হয়ে বাবরি মসজিদের বিতর্কিত কাঠামোর বাইরে শামিয়ানা তুলে রামের মূর্তি স্থাপনের আবেদন জানান মহন্ত রঘুবীর দাস। ফৈজাবাদ আদালত আবেদন খারিজ করে দেন।
সেই ১৮৮৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই মসজিদের ২ দশমিক ৭৭ একর জমি নিয়ে দীর্ঘ ১৩৪ বছর মামলা চলেছে। ১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাবরি মসজিদে নিয়মিত নামাজের জামাত হওয়ার কথা বিচারকরা স্বীকার করেছেন। ১৮৮৫ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত বিতর্কিত জায়গায় ওপর নামাজ কায়েম রাখা ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কিনা, তার এই ব্যাখ্যা দেওয়ার মালিক উচ্চপর্যায়ের শরিয়া জানা আলেমদের। 
নিষ্কণ্টক জমির ওপর জমি ওয়াকফ করে মসজিদ প্রতিষ্ঠার নিয়ম আছে বলে জানি। দিল্লির কুতুব মিনারের পাশে একটি পরিত্যক্ত মসজিদ আছে, তার নাম ‘কুয়াতুল ইসলাম মসজিদ’। এটা নাকি পৃথ্বীরাজের মন্দির ছিল। কুতুবউদ্দিন আইবেক দিল্লি দখল করার পর এই মন্দিরটার পশ্চিম অংশে একটা মেহরাব তৈরি করে মসজিদে রূপান্তর করেছিলেন। অন্যান্য কাঠামোর কোনও পরিবর্তন না করায় এটি যে মন্দির ছিল, তা এখনও বোঝা যায়। পর্যটকদের জন্য নিয়োজিত লোকদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এই মসজিদে নামাজ হয় না কতদিন? তারা বলেছেন, মুঘল আমল থেকে এই মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ আছে।

ধারণা করছি, আওরঙ্গজেবের আমল থেকে এই মসজিদে নামাজ বন্ধ হতে পারে, কারণ তিনি শরিয়ত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং তার শাসনামলেই ফতোয়ায়ে আলমগিরি রচিত হয়েছিল। ভারতে বহু জায়গায় আলমগিরি মসজিদ দেখেছি, কিন্তু কোনও মসজিদ নিয়ে বিতর্ক নেই। শুধু মথুরার মসজিদ নিয়ে হিন্দুদের মনে দুঃখ আছে। কারণ এই মসজিদটি কৃষ্ণের মন্দিরের নিকটবর্তী। অবশ্য এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশে মসজিদ আর মন্দিরের মাঝখানে বিরাট দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। আমার মনে হয় বাবরি মসজিদটা দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো সুপ্রিম কোর্ট এমন রায় দিতেন না। কোর্ট রায়ে মসজিদ ভেঙে ফেলাকে গুরুতর অন্যায় কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং যারা অন্যায় করে, তাদের পক্ষে রায় যায় কীভাবে!

যাই হোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্ত করে মুসলমানদের জন্য পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অংশ নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে। আর মৌলানা আবুল কালাম আজাদ,  মাওলানা আজাদ সোবহানী, মাওলানা হজরত মোহানি, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদা ছিলেন অখণ্ড ভারতের পক্ষে। ভারত বিভক্ত হওয়ার পর এরা বলেছিলেন জিন্নাহ ভারতে অবস্থানরত মুসলমানদের ‘কয়েদ’ করে গেলেন।

এখন উপমহাদেশের ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ মিলিয়ে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৬৫ কোটি, আর ভারতে হিন্দুর সংখ্যা ৯৫ কোটি। অনুরূপ সংখ্যা নিয়ে অখণ্ড ভারতে উভয় সম্প্রদায় বসবাস করলে পরস্পর পরস্পরকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ থাকতো না, বরং পরস্পর পরস্পরকে মান্য করে চলতো। এখন অখণ্ড ভারতপন্থীদের কথাই সত্য হলো। ভারতে মুসলমানদের অবস্থা অনেকটা মাওলানাদের কথিত কয়েদির মতোই। নরেন্দ্র মোদির জামানায় অবস্থা আরও খারাপ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে প্রকাশ—গরুর মাংস খেয়েছে, রেখেছে, এমন অভিযোগে গোরক্ষক সমিতির পাণ্ডাদের হাতে গত সাড়ে তিন বছরে প্রায় ৫০ জনের বেশি মানুষ হত্যা হয়েছে, ৩০০ মানুষ আহত হয়েছে এবং শতাধিক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। ভুলের মাশুল মুসলমানদেরই দিতে হবে। সুতরাং এখন যে রায় সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছেন, তাই মেনে নেওয়া মুসলমানদের জন্য উত্তম হবে। মুসলমানদের অনুধাবন করা উচিত, এখন সারা বিশ্বে মুসলমানদের সামনে সুবহে কাছেকের অন্ধকার। আবার এই নিয়ে তারা আশান্বিত হতে পারেন যে, সুবহে কাছেকের পর সুবহে সাদিকের আগমন হয়।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ যে রায় দিয়েছেন, তারপর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনও সুযোগ নেই। তাছাড়া আমি বিশ্বাস করি, এই রায় দিতে প্রধান বিচারপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ বাবরি মসজিদ নিয়েই বিজেপির উত্থান। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসনসংখ্যা ছিল মাত্র ২টি। বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির ছিল—প্রচারণা চালিয়ে সেখানে তারা রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা বলে ধীরে ধীরে কট্টর হিন্দুত্ববাদী উন্মাদনা সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। দিল্লির ক্ষমতার দ্বার খুলতে পেরেছে। রাম মন্দির তৈরির প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বিজেপির আর কোনও উপায় ছিল না।

শুধু কোর্টের ভয়ে তারা এতোদিন মন্দির নির্মাণ শুরু করেনি। কর-সেবকরা বহুবার বলেছে তারা জোর করে নির্মাণকাজ শুরু করবে। ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের জাতীয় মোর্চার সঙ্গে হিন্দি বলয়ে আসন সমঝোতা করে বিজেপি একলাফে দুই থেকে ৮৬ আসন পেয়ে বসে। তখনই তারা বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পনা নেয়। এল কে আদভানির রথযাত্রার পরিকল্পনা ছিল বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার জন্য সারাদেশে সাড়া জাগানিয়া কর্মসূচি।

১৯৯০ সালে এল কে আদভানি গুজরাটের সোমনাথ মন্দির থেকে রথযাত্রা শুরু করেন। কথা ছিল এল কে আদভানি রথ নিয়ে বাবরি মসজিদ পৌঁছালে সেখানে হাজার হাজার করসেবক উপস্থিত থাকবে, আর তারা তখন মসজিদ ভাঙা শুরু করবে। তখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন রাষ্ট্রীয় জনতা দলের লালু প্রসাদ যাদব। লালু প্রসাদ যাদবের হুকুমে আদভানিকে গ্রেফতার করা হয়, যখন তিনি রথ নিয়ে বিহারে পৌঁছেন। আদভানির অনুপস্থিতিতে করসেবকরা মসজিদ ভাঙার কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়। সেবার মসজিদ বেঁচে যায়।

১৯৯২ সালে এল কে আদভানি, মুরলী মনোহর যোশী, উমা ভারতীর আহ্বানে হাজার হাজার করসেবক আর সাধু-সন্ন্যাসীরা অযোধ্যায় একত্রিত হয়ে বাবরি মসজিদ ভেঙে দেয়। তখন যে দাঙ্গা হয় তাতে দুই হাজার মুসলমান প্রাণ হারায়। এবার যে মুসলমানরা কোনও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি, তা বিজ্ঞজনোচিত কাজ হয়েছে। একটা মসজিদের জন্য হাজার হাজার মুসলমানের প্রাণ দেওয়া কখনও উচিত হতো না। কারণ সেটি মুসলমানদের পবিত্র নগরীর পবিত্র মসজিদ না।

বাবরি মসজিদ যখন ভেঙে ফেলা হয়, তখন কেন্দ্রে কংগ্রেস ক্ষমতায়। নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী। ফৈজাবাদে সামরিক বাহিনী উপস্থিত ছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক বাহিনীকে মসজিদ রক্ষার কোনও নির্দেশ দেয়নি বলে সামরিক বাহিনী মসজিদ রক্ষায় তৎপর হয়নি। তখন উত্তর প্রদেশে বিজেপি ক্ষমতায় আর কল্যাণ সিং মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য পুলিশ বাহিনীও মসজিদ ভাঙার কাজে তৎপর ছিল। মুসলমানেরা সবসময় কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হতো। সেই যে তারা কংগ্রেসকে পরিত্যাগ করেছে, আর ফিরে তাকায়নি। সেই থেকে এ পর্যন্ত কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশে আর কখনও ক্ষমতায় আসতে পারেনি। এন ডি তিওয়ারি উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের শেষ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মুসলমানেরা সেই থেকে হয়তো সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম সিং যাদব অথবা দলিতদের দল বিএসপি’র মায়াবতীকে সমর্থন করে আসছে। উত্তরপ্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যা ২৭ শতাংশ। মায়াবতী আর মুলায়ম সিং যাদব উত্তরপ্রদেশে বেশ কয়েকবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন।

বাবরি মসজিদের সাম্প্রতিক রায়ে বলা হয়েছে—সরকার বাবরি মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্যত্র পাঁচ একর ভূমি মুসলিম ওয়াকফ্‌ বোর্ডকে দেবে। অল ইন্ডিয়া মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের প্রেসিডেন্ট আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এমপি বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট যে পাঁচ একর জমি দিতে বলেছে, তা মুসলমানেরা চান না। আমার মনে হয় এই সিদ্ধান্ত ভুল। বরং আমার যতদূর মনে পড়ে, অযোধ্যা থেকে ফৈজাবাদগামী রাস্তার পাশে বাবরের যে সেনাপতি মির বাকি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন, তার সমাধি রয়েছে। তার সমাধির পাশে মুসলমানদের একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করা উচিত।

একইসঙ্গে দুই দশমিক ৭৭ একর ভূমি হিন্দুদের দেওয়ার পরও বাবরি মসজিদ সংলগ্ন যে ৬৭ একর জমি রয়েছে, রায়ের রিভিউ করে এই ৬৭ একর ভূমির ফয়সালাও দাবি করা উচিত মুসলমানদের। সব যদি মির বাকির সমাধির আশেপাশে পাওয়া যায়, তবে একটা এডুকেশনাল কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে পারবে মুসলমানরা। ভারতে মুসলমানদের উচিত, আপাতত যুদ্ধ করার চেয়ে সন্ধি করার অভ্যাস করার। কারণ ভারতে এখন মুসলমানদের কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ