বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৩:০৩, নভেম্বর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৮, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

আহসান কবিরশহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সিসা
নূর হোসেনের বুক নয়, বাংলাদেশের হৃদয়
ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ
বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে
(বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়: শামসুর রাহমান)
শুধু ‘দুই শব্দের’ (ফেনসিডিলখোর, ইয়াবাখোর) জন্য দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনার পর ‘ফেনসিডিলখোর-ইয়াবাখোর’ থেকে নূর হোসেন কি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়েই থাকলেন? জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা তার দম্ভ বা আস্ফালনরাঙানো বক্তব্য থেকে আর বেশিদূর সরে আসেননি, ‘স্লিপ অব টাং’ পর্যন্তই আছেন। শুধু আওয়ামী লীগের নেতারা কবরসম নীরবতা নিয়ে চুপ করে আছেন। তাদের নীরবতা এখনও ভাঙেনি। এরশাদও যা বলতে দ্বিধা করতেন, রাঙা সাহেব নির্দ্বিধায় সেসব বলেছেন। ৯৫-৯৬ সময়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কার পাল্টা বহিষ্কারের এক ঘটনায়  সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর একটি মন্তব্য জনপ্রিয় হয়েছিল, যা আজও  আলোচনায় আছে। প্রয়াত মেয়র মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার উদ্দেশে পুরনো সেই ডায়ালগটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে–‘আগে জানতাম কুকুরে লেজ নাড়ায়, এখন দেখি লেজে কুকুর নাড়ায়!’

জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা। পরিবহন জগতে তার দখলদারিত্ব নিয়ে অনেক কথা আছে, অনেক রিপোর্টও হয়েছে। সেসবের দিকে নজর না দিয়ে নূর হোসেন প্রসঙ্গ ও আগে পরে রাঙা সাহেব যা বলেছেন, তার বিশ্লেষণ করা যাক–

এক. তিনি বলেছেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ  একটানা সাত বছর জেল খেটেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও একটানা খাটেননি। তিনি ভেঙে ভেঙে চৌদ্দ বছরের মতো খেটেছেন। এরশাদের স্ত্রী রওশন ও পুত্র সাদ এরশাদও জেল খেটেছেন।

রাঙ্গা চোখ রাঙিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন? এরশাদ একটানা বেশি জেল ভোগ করেছেন বলতে গিয়ে তিনি কি জাতির পিতাকে ছোট করেননি?

দুই. বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় এলে ২০০২ সালে কথিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সেনাবাহিনী নামানো হয়, নাম দেওয়া হয় অপারেশান ক্লিন হার্ট। রাঙ্গা  বলেছেন, হৃদয় পরিষ্কারের নামে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের হাত-পা বেঁধে গ্রেফতার (তিনি নাসিরউদ্দীন পিন্টু আর হেমায়েতউল্লাহ আওরঙ্গের নাম বলেছেন। দুজন মানুষই মারা গেছেন) কিংবা মানুষকে মেরে ফেলা এসব স্বৈরাচারের কাজ না? খালেদা জিয়া তাহলে স্বৈরাচার নন?

বিএনপির পক্ষ থেকেও রাঙ্গার এই বক্তব্যের কোনও বিরোধিতা করা হয়নি, বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

তিন. রাঙ্গা বলেছেন, আবরার বা বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড না ঘটলে না হয়, বলা যেতো। এসব হত্যাকাণ্ড ঘটা মানে স্বৈরাচার! ছাত্রলীগ-যুবলীগকর্মীদের মতো আচরণ নাকি পুলিশের ওসি আর সাব ইনস্পেক্টরদের। এসব স্বৈরাচার নন? এরশাদ স্বৈরাচার না। খালেদা আর হাসিনাই নাকি স্বৈরাচার।

দম্ভ করে রাঙ্গা এরপর বলেছেন, এরশাদ ক্ষমতা দখল করেননি। বিচারপতি সাত্তার বলেছিলেন,  এছাড়া গত্যন্তর ছিল না। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন এরশাদের আগমনে তিনি অসন্তুষ্ট নন (শেখ হাসিনার উক্তি ছিল, আই অ্যাম নট আনহ্যাপি)। আমাদের কারণে এরশাদের কারণেই ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ। ১১৬টা আসন পেয়েছিল বিএনপি। তারা স্যারের (এরশাদ) সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। স্যার আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে বলেছিলেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠন করতে। ২০০১ সালে এরশাদকে ইলেকশন করতে দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় আসেনি!

আওয়ামী লীগ রাঙ্গার ব্যাপারে বিএনপির মতো আপসহীন নীরব। নীরবতা না ভাঙলে কি ভেবে নেওয়া যাবে যে রাঙা যা বলছেন তার সবটা সত্য?

চার. তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, সততার মূর্ত প্রতীক বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ রাঙ্গা সাহেবের ভাষায় বেঈমান। গণতন্ত্র মাথায় দেয় না গালে দেয় জানতে চেয়েছেন!

কোনও কিছুই সম্ভবত রাঙ্গা সাহেবের জানতে বাকি নেই। হুমায়ুন আজাদ যেমন বলেছিলেন, ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।’ নয় বছর যিনি বাংলাদেশটাকে দখল করে ‘নষ্টামিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন’,  রাঙ্গা সাহেব সেই এরশাদ সাহেবকেই গুরু মেনে রাজনীতিতে এসেছেন। এদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন যিনি, তার অনুসারীরাই এমন বলতে পারেন। এরশাদ সম্পর্কে আর বেশি কিছু বলার নেই। এরশাদকে তিনি আরও বেশি ভালোবাসুন, কে বলেছে স্বৈরাচার, এরশাদ মোদের অহঙ্কার বেশি বেশি বলুন, কোনও দুঃখ নেই। দুঃখ বত্রিশ বছর পর নূর হোসেনকে নিয়ে টানাটানি করার জন্য।

আবারও শামসুর রাহমানের লেখাতে ফিরে যাই:

ওর বর্ষীয়াণ পিতা, যিনি বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে
পা রেখেছিলেন ঢাকার মাটিতে
তিনি নূর নূর বলে ডাকেন, কিন্তু এক থমথমে নিস্তব্ধতা ছাড়া
তিনি কোনও সাড়া পান না। তিনি এই পাথুরে শহরের উপেক্ষিত
দরিদ্রমণ্ডলীর একজন।

কাজী নজরুল লিখেছিলেন, ‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান’, আর হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, ‘গরিবদের হয়তো অনেক কিছইু খারাপ কিন্তু যখন তারা প্রতিবাদ করে, শুধু তখনই তাদের ভালো লাগে।’ এই প্রতিবাদ শিল্প হয়ে যায়। নূর হোসেনের পিতা ১৯৫২ সালে ঢাকা এসেছিলেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ঝাটিবুনিয়া গ্রাম থেকে। কখনও হোটেলে, তেজগাঁওয়ের কয়েকটি ছাত্র হোস্টেলে পেঁয়াজ আদা রসুন বাটার কাজ করতেন। হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়ের কাজও করেছেন। ঢাকায় আট বছর রিকশা চালানোর ফাঁকে বেবিটেক্সি চালানো শিখতেন। এরপর বহু বছর বেবিটেক্সি চালাতেন নূর হোসেনের বাবা। শত কাজের ভিড়ে আওয়ামী লীগের মিছিলে যেতে ভুলতেন না। ‘হাইব্রিড’ বা ‘কাউয়া’ কিংবা অনুপ্রবেশকারী শব্দগুলো তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিল না। আওয়ামী লীগ মানুষের মনে গেঁথে যায় নূর হোসেনের বাবার মতো অসংখ্য সমর্থকের কারণেই।

নূর হোসেন কিছুদিন সাইনবোর্ড লেখার কাজও শিখেছিলেন। বাবার মতো বেবিট্যাক্সি চালানো আর মোটর মেকানিকসের কাজও করতেন তিনি। ১০ নভেম্বর ১৯৮৭ সালে তিনি তার ‘সাইনবোর্ড বন্ধুদের’ দিয়ে বুকে ও পিঠে লিখিয়ে নিয়েছিলেন—‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। এরপর গণতন্ত্রের জন্য কালজয়ী সেই মিছিলে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নূর হোসেন। বুকের দুই পিঠে লিখেছিলেন কবিতা। তাই একবার বুক আর একবার পিঠ দেখিয়ে এগুচ্ছিলেন মিছিলের সঙ্গে। এরপর পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। নূর হোসেনের এমন আত্মাহুতি দেশ বিদেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। কালের বিবর্তনে এই দুই লাইন বাংলার শ্রেষ্ঠ স্লোগান হয়েছে। নূর হোসেন হয়েছেন গণতন্ত্রের জন্য আত্মাহুতি দেওয়া অগণিত মানুষের ‘আইডল’। নূর হোসেনকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন বাংলার কবিরা, তাকে নিয়ে গান গেয়েছেন শিল্পীরা। স্বাধীন বাংলায় নূর হোসেনকে কেউ ভুলবে না। নূর হোসেন আজও মানুষকে প্রতিবাদী করে তোলেন, গণতন্ত্রের মিছিলে নেমে অনেকেই হতে চান নূর হোসেন।

বাংলার মানুষের সবচেয়ে অহঙ্কারের এই জায়গাটাকে বুলেটবিদ্ধ করেছেন রাঙ্গা। গণতন্ত্রের জন্য আত্মাহুতি দেওয়া নূর হোসেনকে ‘ফেনসিডিলখোর’ ও ‘ইয়াবাখোর’ বলার পর এই শব্দ দু’টি ব্যবহার করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন, সঙ্গে নতুন করে যোগ করেছেন–নূর হোসেন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন! নূর হোসেনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রাঙ্গা সাহেব নিজের ভারসাম্য আছে কিনা, সেই প্রশ্নই তুলে দিয়েছেন! রাঙ্গার এই আস্ফালনের পরেও নীরব আছে আওয়ামী লীগ। রাঙ্গা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসাকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ২১ বছর পর জাতীয় পার্টির জন্যই ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল তারা! এরশাদকে নির্বাচন করতে না দেওয়া, ২০০১ এ বিএনপির জেতা, ১৯৯৬ সালে বিএনপিকে ফিরিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মেলানোর কথাও দম্ভ ভরে বলেছেন।

রাঙ্গার এসব কথা সত্য বলেই কি আওয়ামী লীগ নিশ্চুপ? ভোটের রাজনীতিতে সামান্য সক্ষমতার জন্য এরশাদকেই ভাগ-বাঁটোয়ার বস্তুতে পরিণত করেছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। জীবদ্দশায় এরশাদও সেই ভাগকে উপভোগ করছেন চুটিয়ে। তবে শ্রেষ্ঠ স্লোগান বুকে আর পিঠে লিখে যিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন, তার কাছেই জানতে চাই:

নূর হোসেন আপনি কি ক্ষমা করতে পারবেন এরশাদকে কিংবা তার দলের সঙ্গে যারা আঁতাত করে ক্ষমতা ধরে রাখতে চান তাদের?

লেখক: রম্যলেখক

 

 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ