পেঁয়াজ যখন আলোচিত চরিত্র

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:১২, নভেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১২, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

রেজানুর রহমানআমাদের রফিক সাহেব পরিচিত একজনের বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যাবেন। কিন্তু উপহার হিসেবে কী নিয়ে যাবেন, তাই নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। একবার ভাবলেন ফুল নিয়ে যাবেন। পরক্ষণেই মনে হলো ফুল উপহার হিসেবে মন্দ নয়। তবে ফুল উপহার পেলে সবাই খুশি হন না। ফুল উপহার পেলে অনেকেই হাসিমুখে কথা বলেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হন। কাজেই ফুল বাদ। এবার বইয়ের কথা ভাবলেন। উপহার হিসেবে বইয়ের কোনও বিকল্প নেই। ‘প্রিয়জনকে বই উপহার দিন’—সরকারিভাবেই তো স্লোগানটি নির্ধারণ করা আছে। বই কিনবেন ভাবতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। বাসার আশেপাশে তেমন কোনও বইয়ের দোকান নেই। কাজেই বইও বাদ। তাহলে উপহার হিসেবে কী দেওয়া যায়? শোপিচ, তৈজসপত্র, বেড কভার নাকি প্রাইজবন্ড? স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করলে কেমন হয়? স্ত্রীকে ডাকলেন। রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন রফিক সাহেবের স্ত্রী। তার মেজাজ খারাপ। বিরক্ত মুখে স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, কেন ডেকেছো বলো। রফিক সাহেব পুরো ঘটনা খুলে বলতেই তার স্ত্রী একটি প্রশ্ন করলেন—আচ্ছা বলো তো...দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কী?
রফিক সাহেব স্ত্রীর কথা শুনে একটু অবাক হলেন। কারণ তার স্ত্রী দেশের কোনও বিষয় নিয়ে তেমন একটা ভাবেন না। আগ্রহও দেখান না। তিনি আছেন দিনে ফেসবুক আর রাতে ভিনদেশি টিভি চ্যানেলের আজগুবি সব টিভি সিরিয়াল নিয়ে। তার মুখে হঠাৎ দেশের আলোচিত বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্ন শুনে রফিক সাহেব বিস্মিত কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তুমি দেশ সম্পর্কে ভাবো নাকি? রফিক সাহেবের স্ত্রী বিরক্ত মুখে বললেন, আমার মতো নগণ্য একজন মানুষ দেশ সম্পর্কে ভাবলেই বা কী আবার না ভাবলেই বা কী? আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা কী বলো?

রফিক সাহেব ভেবে নিয়ে বললেন, সড়ক দুর্ঘটনাই তো এই মুহূর্তে আলোচিত খবর

স্ত্রী বললেন, ভেবে বলো?

রফিক সাহেব আবার ভেবে নিয়ে বললেন, বুয়েটের আবরার হত্যাকাণ্ডের কথাই কি বলছ তুমি?

রফিক সাহেবের স্ত্রী বললেন, আরও ভাবো, ভেবে বলো?

রফিক সাহেব এবার হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, পারব না। তুমিই বলো...

রফিক সাহেবের স্ত্রী বিরক্তমুখে বললেন, দেশে এখন পেঁয়াজ হালি হিসেবে বিক্রি হয়, সেটা জানো তো?

রফিক সাহেব লজ্জায় মাথা নুয়ে বললেন, স্যরি, পেঁয়াজ যে একটা আলোচনার বিষয় হতে পারে, তা কখনও ভাবিনি। হঠাৎ পেঁয়াজের কথা তুললে কেন বলো...

রফিক সাহেবের স্ত্রী পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, তোমার যে বন্ধুর বিবাহবার্ষিকী, তিনি কি মধ্যবিত্ত না উচ্চবিত্ত!

রফিক সাহেব বললেন, আরে, তুমি তো তাকে চেনো। আমাদের মিজানের বিবাহবার্ষিকী। কলেজের অধ্যাপক মিজানকে চেনো না তুমি?

রফিক সাহেবের স্ত্রী বললেন, তোমার বাজেট কতো বলো?

বাজেট? কীসের বাজেট?

উপহার কেনার বাজেট।

এই ধরো দেড় থেকে দুই হাজার।

রফিক সাহেবের স্ত্রী এবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, তুমি এককাজ করো, তোমার বাজেটের পুরো টাকায় পেঁয়াজ কেনো! এই মুহূর্তে পেঁয়াজ সংসারের জন্য খুবই দামি পণ্যে পরিণত হয়েছে। পেঁয়াজ উপহার পেলে তোমার বন্ধু খুশি না হলেও তার স্ত্রী খুব খুশি হবেন।

স্ত্রীর কথা শুনে রফিক সাহেব প্রথমে বিরক্ত হলেন। পরক্ষণেই মনে হলো তার স্ত্রী সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজই হতে পারে শ্রেষ্ঠ উপহার। বাসার পাশেই একটা কাঁচাবাজার রয়েছে। পেঁয়াজ কিনতে ছুটলেন তিনি।

কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কাঁচাবাজারের কোনও দোকানেই পেঁয়াজ নেই। পরিচিত একজন বিক্রেতার কাছে প্রায়শই কাঁচা শাক-সবজি কেনেন তিনি। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, পেঁয়াজ কই? আমার যে দশ কেজি পেঁয়াজ লাগবে। দোকানদার বিরক্ত মুখে বললো, স্যার দোকানে এখন আর পেঁয়াজ রাখি না।

কেন, পেঁয়াজ রাখো না কেন? রফিক সাহেবের প্রশ্ন শুনে দোকানদার বলল, ‘দোকানে পিঁয়াজ রাখলে কাস্টমারের অনেক কথা শুনতে হয়। অয় মিয়া পিঁয়াজের এতো দাম কেন? যুক্তি কইর‌্যা তোমরা দাম বাড়াইছ। তোমাদের মিয়া পুলিশে দেওয়া উচিত। চিন্তা কইর‌্যা দেখেন স্যার, এই যে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে, তার জন্য কি আমরা দায়ী? দায়ী তো আড়তদারেরা। সিন্ডিকেট না কী জানি কয়, তারা দায়ী! তাদের কেউই কিছু বলে না। যতো হম্বিতম্বি সব আমাদের ওপর। সেজন্য দোকানে পেঁয়াজ রাখা বন্ধ কইর‌্যা দিচ্ছি।’

রফিক সাহেব পেঁয়াজ না কিনেই বাসায় ফিরে এলেন। সকালে পত্রিকা পড়া হয়নি। তাই মনের ভেতরটা খচখচ করছে। কিন্তু পত্রিকা খুঁজে পাচ্ছেন না। ঘটনা কী? হকার কি আজ পত্রিকা দেয়নি? স্ত্রীকে ডাক দিলেন। পত্রিকা হাতে নিয়েই স্ত্রী তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। অবাক কণ্ঠে বললেন, কালে কালে আর কী দেখব, বলো তো? সামান্য পেঁয়াজও এখন হালি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। এই যে দেখো পত্রিকায় ছবিসহ ছাপা হয়েছে।

পত্রিকা হাতে নিয়ে যারপরনাই অবাক হলেন রফিক সাহেব। প্রথম পাতায় লিড ছবি ছাপা হয়েছে। একটি বাজারে পেঁয়াজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন কিশোর দোকানদার। পেঁয়াজের পাশে সাদা কাগজে লেখা রয়েছে ২০ টাকা ১ হালি! ছবিটা বিশ্বাস হচ্ছে না। ২০ টাকা ১ হালি, মানে একটি পেঁয়াজের দাম ৫ টাকা। ছবিটার দিকে আরও ভালো করে তাকালেন রফিক সাহেব। ঠিকই দেখেছেন। ছবির পাশেই সিঙ্গেল কলাম নিউজ ছাপা হয়েছে। শিরোনাম ছাপা হয়েছে ‘একদিনে কেজিতে পেঁয়াজের দাম বাড়ল ৩০ থেকে ৫০ টাকা’। রিপোর্টের শুরুতে বলা হয়েছে, ‘পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের গোবিন্দ দত্ত লেনের কামাল স্টোর, এই মুদি দোকানে পেঁয়াজের মূল্য তালিকা টানিয়েছেন বিক্রেতা। মাঝারি সাইজের এক হালি দেশি পেঁয়াজ ২০ টাকা। অন্যদিকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি সড়কের আলী স্টোরে ২০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম ওজনের বড় আকারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। কেজি ২০০ টাকা। সেই হিসাবে একটি পেঁয়াজের দাম পড়ছে ৪০ থেকে ৭০ টাকা। খবরটি একবার নয় কয়েকবার পড়লেন রফিক সাহেব। সামান্য পেঁয়াজ নিয়ে এতো ঘটনা ঘটতে পারে, কখনও কল্পনাও করেননি। উপহার হিসেবে পেঁয়াজের ব্যাপারটা তার মনে ধরেছে।

কিন্তু পেঁয়াজ তো বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ পেঁয়াজ কেন এতো দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠলো। বাংলা ট্রিবিউনেই খবর বেরিয়েছে পেঁয়াজ নাকি এবার বিমানে চড়ে বাংলাদেশে আসছে। বাহরে বাহ! পেঁয়াজের কী ভাগ্য! আগে আসতো নদীপথে। এখন আসছে আকাশে ওড়ে। অদূর ভবিষ্যতে আরও কী যে দেখতে হবে, কে জানে!

দেশবাসীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখতে বসলেন রফিক সাহেব। প্রিয় দেশবাসী, সামান্য পেঁয়াজ নিয়ে আমাদের এতো দুঃসহ সংকটের মধ্যে পড়তে হবে, তা ভেবে অবাক হচ্ছি। আমরা কি পেঁয়াজের জন্যও অন্যদেশের ওপর ভরসা করে বসে থাকব? আমাদের দেশের মাটি অনেক উর্বর। শহরে হয়তো খালি জমি পড়ে নেই। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বাড়ির পাশেই কতই না খালি জমি পড়ে থাকে। আসুন না খালি জমিগুলোকে কাজে লাগাই। আমরা যদি একটা সিদ্ধান্ত নেই, ভবিষ্যতে আমাদের রান্নার কাজে পেঁয়াজের চাহিদা আমরাই মেটাবো, তাহলে সেটা সম্ভব। পেঁয়াজের মৌসুমে বাড়ির আশপাশের খালি জমিতে পেঁয়াজ চাষ করার এখনই সিদ্ধান্ত নিন। সংকল্প নিন ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করব না। ইচ্ছেটা যদি সৎ হয়, তাহলে তার বাস্তবায়ন হবেই।

ও হ্যাঁ, শেষে একটি কথা বলি। পরামর্শও বলতে পারেন। আমাদের সুন্দরবন বুঝিয়ে দিয়েছে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় গাছপালার গুরুত্ব কতখানি। আসুন না ১৬ কোটি মানুষের ১৬ কোটি হাতে সারা দেশে ১৬ কোটি গাছ লাগাই। হয়তো ভাবছেন সংখ্যাটা তো অনেক বড়। কিন্তু ভেবেছেন কী, আপনার ভাগে কিন্তু একটাই গাছ পড়েছে। কবে লাগাচ্ছেন সেই গাছটি? ভালো থাকবেন সকলে...

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ