জাহাঙ্গীরনগরের কী খবর?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৬:৪০, নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৭, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

আমীন আল রশীদঘূর্ণিঝড় বুলবুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগে রেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা এবং পেঁয়াজের কেজি দুইশ’ স্পর্শ করার ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ইস্যুটি বোধ হয় আর হালে পানি পাচ্ছে না। আন্দোলনকারীরাও কর্মসূচি থেকে এক সপ্তাহ বিরতি নিয়েছেন। তবে শর্ত হলো, আবাসিক হল খোলা এবং পুরোদমে ক্লাস পরীক্ষা চালু করা। ২১ নভেম্বর পর্যন্ত আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত বলে জানানো হয়েছে। তবে, বিরতির মধ্যে প্রয়োজন হলে তারা আন্দোলন করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।

এর আগে ৮ নভেম্বর রাতে শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিবের কাছে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ হস্তান্তর করেছেন আন্দোলনকারীরা। সুতরাং রেল ও পেঁয়াজ ইস্যুতে জাহাঙ্গীরনগর ইস্যুটি ঢাকা পড়ার সুযোগ নেই। বরং আমাদের এখন এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে উত্থাপন করা দরকার, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে কী এমন মধু, নানা বিতর্কের পরেও তারা এই পদ ছাড়তে চান না।

জাহাঙ্গীরনগর ইস্যুতে যখন আমরা এই কথা বলছি, ঠিক সেই সময়েই জাতির জনকের জন্মস্থান গোপালগঞ্জে তারই নামে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য ‘পালিয়ে যাওয়া’ (আন্দোলনের মুখে তিনি পুলিশি পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়েন) উপাচার্য নাসিরউদ্দিনের অনিয়মের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে বলেও একটি সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। খবরে বলা হচ্ছে, নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য, কেনাকাটায় দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একজন পরিচালককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত কমিটি অধিকাংশ অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে তার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে টানা আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ওই আন্দোলন দমনেও উপাচার্য শেষ পর্যন্ত নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখানো, হল ও ডাইনিং বন্ধ এমনকি হামলাও চালানো হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থেকে শিক্ষার্থীরা সরে যাননি। বরং ভিসি নাসিরউদ্দিনকেই শেষমেশ সরে যেতে হয়।

জাহাঙ্গীরনগরের সঙ্গে গোপালগঞ্জে ভিসিবিরোধী আন্দোলনের একটি বড় পার্থক্য হলো এই, গোপালগঞ্জে ভিসিবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা এককাট্টা ছিলেন। সেখানে ভিসির পক্ষে শিক্ষকদের একটি অংশ এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন থাকলেও তারা সেখানে পাল্টা আন্দোলন বা কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ অভিমত ভিসির বিপক্ষে ছিল। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে পদে বহাল রাখার চেষ্টা হয়নি, যেটি হয়েছে জাহাঙ্গীরনগরে। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগরে ভিসির পক্ষেও শিক্ষকদের একটি বড় অংশ রয়েছেন এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের শুরুর দিকে উপাচার্যের বিপক্ষে থাকলেও সম্ভবত হাইকমান্ডের নির্দেশে তারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালাতেও পিছপা হননি। আন্দোলনকারীদের তরফে বলা হচ্ছে, উপাচার্য ফারজানা ইসলাম তাদের ওপর হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি হাজারো শিক্ষার্থীর দুর্ভোগ উপেক্ষা করে শুধু নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হল বন্ধ করে দিয়েছেন।

তবে গোপালগঞ্জের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগরের একটা জায়গায় মিল রয়েছে। তা হলো, গোপালগঞ্জের ভিসিও বলেছিলেন,তার বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের লোকজন আন্দোলন করছে অথবা তারা উসকানি দিচ্ছে। ঠিক একই কথা বলেছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের উপাচার্য। এই কথা যদি সত্যিও হয়, তাতেও কি ভিসির অনিয়ম ও দুর্নীতি জায়েজ হয়ে যায়? বিষয়টা কি এরকম, উপাচার্য যদি কোনও অন্যায় করেন, তাহলে বিএনপি জামায়াতপন্থীরা এর প্রতিবাদ করতে পারবেন না?

বাস্তবতা হলো, জাহাঙ্গীরনগরে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের প্রধান অংশ প্রগতিশীল শিক্ষকরা। বিএনপি-জামায়াত তো সব সময় চাইবেই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। যেখানেই তারা দেখবে সরকারের সমালোচনামূলক কিছু হচ্ছে, সেখানে গিয়েই তারা ঘি ঢালবে, এটাই তাদের রাজনৈতিক কৌশল। কারণ তাদের নিজেদের কোনও শক্তি এখন আর অবশিষ্ট নেই। তারা এখন অন্যের ডাল ধরেই বাঁচতে চায়। সুতরাং আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াত ইন্ধন দিচ্ছে, এই কথা বলে মূল ঘটনা আড়াল করার সুযোগ নেই। বরং ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব তথ্যপ্রমাণ শিক্ষামন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে বা এরইমধ্যে যেসব অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে—দ্রুত সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে একটা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়াই সরকার তথা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একমাত্র কাজ। অর্থাৎ তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বা আনীত অভিযোগগুলো সত্য নয়, তাহলে তিনি পদে থেকে যাবেন এবং তখন আন্দোলনকারীরাও লজ্জিত হবেন। আর যদি প্রমাণিত হয় অভিযোগ সত্য, তাহলে ভিসিকে সরিয়ে দেওয়া হবে—এর বাইরে কোনও বিকল্প থাকার কথা নয়।

এখন প্রশ্ন হলো ভিসিরা কেন পদ ছাড়তে চান না বা এই পদে কী এমন মধু? বলা হয়, যেখানে অর্থের লেনদেন, সেখানেই দুর্নীতির আশঙ্কা থাকে। যে কারণে বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি বড় থিওরি হচ্ছে ফলো দ্য মানি। অর্থাৎ টাকা কোথায় যায়, সেদিকে নজর রাখুন। জাহাঙ্গীরনগরেও তাই হয়েছে।

দেশের যে আইনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয়, সেখানে উপাচার্যদের ক্ষমতা অপরিসীম। একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক সম্প্রতি একটি টেলিভিশনের টকশোয় বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের এতই ক্ষমতা, তারা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রিও করে দিতে পারেন। কথাটি তিনি প্রতীকী অর্থে বললেও এর মাজেজা হলো, উপাচার্যরা হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বসময় ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং কেউ একবার এ রকম সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলে তিনি যে সহজে এই পদ ছাড়তে চাইবেন না, সেটিই স্বাভাবিক।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই উন্নয়ন কাজের জন্য প্রচুর বরাদ্দ থাকে। এ কথা এখন আর গোপন বিষয় নয়, সরকারি বা জনগণের অর্থে পরিচালিত যেকোনও উন্নয়ন কাজেই বিপুল পরিমাণ টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হয়। বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যখন কোনও উন্নয়ন কাজ শুরু হয়, কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদার টাকার একটি অংশ ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনকে দিয়ে আসেন বলে শোনা যায়। জাহাঙ্গীরনগরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। এখানে গুরুতর যে অভিযোগটি এসেছে তা হলো, খোদ উপাচার্যের বাসায় টাকার ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ কতটুকু সত্য, তা নিশ্চয়ই তদন্তে বেরিয়ে আসবে (যদি সুষ্ঠু তদন্ত হয়)।

একজন উপাচার্য কোটি কোটি টাকার চেকে সই করেন, সবাই যে লোভ সংবরণ করতে পারেন, তাও নয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সব পদে নিয়োগে তার সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে। টাকা-পয়সার লেনদেনও হয়। সুতরাং সবাই যে সৎ থেকে এবং নিজেকে নির্লোভ রেখে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সব নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন বা করতে পারেন—সেটি ভাবার কোনও কারণ নেই। ফলে এই অপার ক্ষমতার মোহ তিনি কী করে ছাড়বেন?

যখন কেউ উপাচার্য হন, সাধারণত প্রভোস্ট থেকে শুরু করে শিক্ষক সমিতির প্রতিটি স্তরে তার পছন্দের বা বলয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ দেন। ফলে যখন কোনও কারণে উপাচার্য বিতর্কিত হন বা তার পদত্যাগ অথবা অপসারণের দাবি ওঠে, তখন এই ক্ষমতার বলয়ে থাকা তার সহকর্মীরা তার এবং তাদের গদি রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কারণ উপাচার্য বদল হয়ে গেলে অন্যান্য পদেও রদবদল হওয়া স্বাভাবিক। কারণ নতুন উপাচার্য এসে আবার তার নিজস্ব লোকজনকে সর্বত্র ক্ষমতায়িত করেন। ফলে উপাচার্যদের পদ আঁকড়ে থাকার এটিও একটি বড় কারণ। এক্ষেত্রে ‘ইগো’ একটি বড় কারণ। অর্থাৎ যখন একজন ভিসি আন্দোলনের মুখে সরে যান, তখন ধরেই নেওয়া হয়, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি সত্য। ফলে উপাচার্যরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেন যেন তাদের সরে যেতে না হয়।

আরেকটি কারণ রাজনৈতিক আস্থা ও ভরসা। অর্থাৎ যেহেতু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ হয় রাজনৈতিক বিবেচনায় (মূলত এটি এখন পলিটিক্যাল পোস্ট), সুতরাং যখন যে দল ক্ষমতায়, তখন সেই দলের আস্থাভাজনরাই যে ভিসি হবেন, এটিই স্বাভাবিক। ফলে, যখন দুর্নীতি বা অনিয়মের কারণে কোনও উপাচার্যকে সরে যেতে হয়, তখন তার দায় সরকার বা ক্ষমতাসীন দল এড়াতে পারে না। ফলে পদে থাকা এবং তাকে পদে রাখার একটা চেষ্টা সর্বোচ্চ মহল থেকেই চলে। এর আগেও যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠেছে, তাদের কেউই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি।

মনে রাখা দরকার, একজন উপাচার্যের প্রথম ও প্রধান পরিচয় তিনি একজন শিক্ষক। উপাচার্য মূলত প্রশাসনিক পদ। ‍সুতরাং শিক্ষক হিসেবে তার কাছ থেকে যে মানুষ যে নীতি-নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক মান প্রত্যাশা করে, সেটি নিশ্চিত হলেই উপাচার্যদের বিতর্কিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যখনই একজন শিক্ষক ভিসি হয়ে যান, তখনই তার আচার আচরণ আর শিক্ষকসুলভ থাকছে না, বরং তিনি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক কর্মী। বিপত্তিটা বাধে এখানেই। ফলে ভিসিদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। সুতরাং গতকাল গোপালগঞ্জ, আজ জাহাঙ্গীরনগর তো পরশু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়—এই পৌনঃপুনিকতা ঠেকাতে গেলে কারা উপাচার্য হবেন, কী তাদের যোগ্যতা এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, এসব বিষয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনার পাশাপাশি ভিসিদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাখা হবে কিনা বা এখানে একটি ভারসাম্য কীভাবে আনা যায়, তা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।  

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ