শিক্ষার মান ও মানসিক বৈকল্য

Send
হায়দার মোহাম্মদ জিতু
প্রকাশিত : ১৯:২৯, নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৭, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

হায়দার মোহাম্মদ জিতুবড় নির্বোধ ও নির্লিপ্ত সময় পার করছি আমরা। যে সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে কেউ বলে না—‘আমার একটি প্রশ্ন আছে কিংবা আমি এটা মানি না বা বিশ্বাস করি না’। সবার ‘তলপেট-তলদেশ’ বিশ্বাস ও দাসত্বেপূর্ণ। আর তাই হয়তো এই তল্লাটে আর কোনও শেখ মুজিব, মুনির চৌধুরী, হ‌ুমায়ুন আজাদ জন্মাবেন না। প্রতিবাদহীন সময় ও মরা স্রোতই তার ইঙ্গিত। তবে, প্রশ্ন করার সক্ষমতাই যে সৃষ্টির প্রকৃত তাগিদ, সেটাই ভুলতে বসেছে এই সমাজ।
যদিও পৌরাণিক কাল থেকে শুরু করে ইতিহাস সাক্ষী, ‘ক্ষমতাবানরা বা ক্ষমতাপ্রভুরা’ কখনোই প্রশ্নের উত্থান এবং উত্থাপনকারীকে বরদাশত করে না। আর বর্তমান যেহেতু ইতিহাসেরই ধারাবাহিক প্রবাহ, সেহেতু হিসাবেরই এক ফল ‘গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে’ ঘটে যাওয়া ঘটনা। যেখানে শোনা যায়, একজন শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে প্রতাপশালী ভিসির রাজ্য উজাড়ের হুঙ্কার।
তবে এই ক্ষুদ্র (!) অথচ গভীর ঘটনার একটি মৌলিক দৃশ্যপট আছে। তা হলো উপাচার্য মহোদয় তার কথা ও কাজ দিয়ে স্পষ্ট করেছেন ‘তিনি’ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ‘শিক্ষকরাই’ ক্ষমতা কাঠামোর ‘শীর্ষবিন্দু’ বা ‘উচ্চবর্ণ’। ক্ষমতা কাঠামো তাদের দখলে। কাজেই তাদের অবস্থান, শিক্ষার মান এবং মানসিক বৈকল্য নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারবেন না! তারা অন্যায় করলেও চোখ বুজে থাকতে হবে। যদিও আমি সব শিক্ষকের কথা বলছি না। বলছি, যারা সময়ের স্রোতে অন্ধ হয়ে আছেন। আবার আমাদের অনেক শিক্ষক আছেন, যারা দগ্ধ সময়েও মানুষের কথা বলেন। ন্যায়ের কথা বলেন।

উল্টোদিকে শিক্ষার্থীরা হলেন  নিম্নবর্গ। ‘শিক্ষক’দের দয়া ও ভিক্ষাই তাদের টিকে থাকার স্যালাইন। কাজেই তাদের সব সময় থাকতে হবে তটস্থ এবং প্রশ্নহীন জড়বস্তু হয়ে। এই হচ্ছে অনেক শিক্ষকের ধারণা ও মানসিক লালন। আর এ কারণেই ‘একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী’—এ ধরনের মৌলিক প্রশ্নকারী একজন শিক্ষার্থীকেও হেনস্থার শিকার হতে হয়।

অথচ চারদিকের ‘অসুস্থ অস্ত্র-অর্থ উৎপাদন’ প্রতিযোগিতায়ও যে একজন শিক্ষার্থী এখনও প্রশ্ন করতে পারেন, এটি নিয়েই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব করার কথা ছিল। শুধু তাই নয় এই বিষয়টিকে সেলিব্রেট করলেও অবাক হওয়ার কথা ছিল না। পাশাপাশি বাকিরাও যেন প্রশ্ন করতে শেখেন, সেজন্য সেই পরিবেশ রচনায় চেষ্টা করতেন। তবে, সেটা হতো, যদি তারা সুস্থ থাকতেন কিংবা তাদের মাঝে সুস্থ হওয়ার চিন্তা থাকতো।

তবে, সেই প্রশ্নকারী শিক্ষার্থীর কপালে জুটেছিল গালিসমেত আক্রমণ। তবে, এই অযাচিত আক্রমণকে খুব বেশি অমূলক ভাবারও কারণ নেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া।

অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষক নিয়োগের প্রাথমিক শর্তই  ‘গোলামি’। আমি জানি ‘গোলামি’ শব্দটিতে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। তবে বাস্তবতা তো এটাই। 

যাইহোক, খুঁটিভেদে এর পরিবেশনার ধরন বদলায়। যেমন, কোনও প্রার্থীর স্বামী কিংবা স্ত্রী যদি ওই বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে থাকেন, তাহলে মোটামুটি শিক্ষক হওয়া নিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া যায়।

এছাড়া, বিবেচ্য হয় মেরুদণ্ডহীনতা। অর্থাৎ, যিনি ‘গোলামি’র মাইলফলকে শীর্ষ তিনিই বনে যান শিক্ষক।

আর এতেই ঘটে যোগ্যদের যথাস্থানের বিচ্যুতি। কারণ ‘জানার একটা অহম আছে’। তাই জানাশোনা বা স্পর্ধার শিক্ষার্থীরা কখনোই এই প্রক্রিয়ায় সামিল হন না। তাই তাদের বেশিরভাগই শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা থাকার পরও চলে যান অন্যান্য পেশায় বা কেউ কেউ যান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ‘উপাচার্য’ নির্বাচন করা হয় এক বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। ফলে ওই শিক্ষকরাই বনে যান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উপাচার্য’। আর তাতেই ঘটে দুর্ঘটনা।

আর তাই এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন এসে যায়। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষক হয়ে দুর্নীতি, মেরুদণ্ডহীনতার প্রমাণ দেন, তাদের পেশাদারিত্ব কেমন হবে? এ প্রসঙ্গে আরেক বাস্তবতা হলো নতুন  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যাকেই ‘উপাচার্য’ হিসেবে নিয়োগ দিতে দেখা গেছে, তাদের অনেকেই সেই-ই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো খাত থেকে কমিশন বাণিজ্যসহ দুর্নীতি করে প্রমাণ করেছেন নিজের অযোগ্যতা। যাদের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুর্নীতির তদন্ত চলছে।

অন্যদিকে, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) এক সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু, ফারসি, সংস্কৃত ও পালি এ চারটি বিভাগ নাকি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বিভাগ চলছে, তার মাঝে হঠাৎ চারটি বিভাগ ‘প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে’–এটি জানিয়ে ওই বিভাগের শিক্ষার্থীদের এভাবে খাটো করার যথার্থ যুক্তি আসলে কী–সেটা তিনিই ভালোভাবে জানেন। এছাড়া, তার প্রতিও একটি মৌলিক প্রশ্ন এসে যায়। গণমাধ্যমে মত প্রকাশের আগে তিনি এই চার বিভাগের প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনতে কোনও উদ্যোগ নিয়েছেন? নাকি 'প্রাসঙ্গিক বিভাগ' বলতে তিনি চাকরির বাজার পাওয়া যায়– এ ধরনের বিষয়কে বুঝিয়েছেন? যদি তাই করে থাকেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজেই তো প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ও তার শিক্ষকের মূল কাজ শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে শেখানো, গবেষণায় উদ্বুদ্ধ  করা। যা করাই হয়নি হয়তো।

পাশাপাশি শুধু এই চার বিভাগ নয় ‘ভাষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য’ সৃজন করে এমন প্রত্যেক বিভাগকেও আরও নজরদারির মাধ্যমে পরিচর্যা করা উচিত। কারণ, এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম সাংস্কৃতিক আত্মশক্তিকে অনুভব করে বাকিদেরও সম্মান-সৃজন করা। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ববহ পদে থেকে এর চর্চার পরিধি কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ তিনি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখেন শুধু পেশায় যাওয়ার একটা স্টেশন হিসেবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্নিহিত অর্থ আমাদের বৈশ্বিক জ্ঞানের কথা বলে, চর্চার কথা বলে, গবেষণার কথা বলে, নিজেদের নাগরিক হিসেবে অনুভব করার কথা বলে।

তবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) ‘প্রাসঙ্গিকতা’ হারানোর–এই যুক্তি ভোগাবে দীর্ঘদিন। কারণ যতদিন এই চার বিভাগ বলবৎ থাকবে (তার ভাষায় প্রাসঙ্গিক না হওয়া পর্যন্ত) ততদিন এই বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষার্থীরা নিজেদের অপ্রাসঙ্গিকতার কথা জেনে এবং ভেবে হীনমন্যতায় ভুগবেন। অন্যদিকে, বাকিরাও দেখবেন অপ্রয়োজনীয় কিছু উপাদান ঝুলছে!

কাজেই এসব মিলিয়ে এই বিভাগের কেউ যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে এই দায় উপ-উপাচার্যেরই নিতে হবে বলে আমি মনে করি। কাজেই যিনি ‘অপ্রাসঙ্গিকতার’ কথা বলেছেন, তিনিই নিজ উদ্যোগে প্রাসঙ্গিক পথ বের করবেন। পাশাপাশি মনিব-ভৃত্য কিংবা ঊর্ধ্বতন বা অধঃস্তন—এই চক্র থেকে বেরিয়ে নিশ্চিত করতে হবে নৈতিক গুরু-শিষ্য পরম্পরা। নাহলে যেকোনও সময় ঘটতে পারে চরম বিপর্যয়। কারণ বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন ‘তোমরা যেখানেই অন্যায় দেখবে, সেখানেই চরম আঘাত হানবে।’

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ

[email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ