ভারত বিরোধিতা দেশপ্রেম নাকি শুধুই বিদ্বেষ?

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৬:৫৩, নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৫, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

লীনা পারভীনকলকাতায় যাবো ডাক্তারের কাছে ফলোআপ চেকাপে। ভিসার জন্য আবেদন ফরম নিয়ে গেলাম ভারতীয় ভিসা সেন্টারে। মানুষে সয়লাব। তিলধারণের জায়গা নেই। ভেতরে যদিও নতুন ভিসা প্রসেসিং সেন্টারের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত চমৎকার, তাই ভিড় সামলাতে খুব বেগ পেতে হয় না কর্মকর্তাদের। একটা কাগজ ফটোকপি করাতে ভুলে যাওয়ায় পড়ে গেলাম লম্বা লাইনে। দেখলাম কত মানুষ ভারতে যেতে আগ্রহী। চিকিৎসার জন্য যায় প্রায় ৮০-৮৫ ভাগ মানুষ। ছোটবড় সবরকম ডাক্তার দেখানোর জন্য যাওয়ার মানুষের সংখ্যা কম নয়। ইদানীং ভারতীয় দূতাবাস তাদের নিয়মেও এনেছে অনেক নমনীয়তা। শপিংয়ের জন্যও যান অনেকে। শপিং, ভ্রমণ, চিকিৎসা—সব মিলিয়ে কলকাতা বা ভারতের অন্যান্য জায়গা যেন এই বাংলাদেশিদের কাছে এক চরম ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ফেসবুক খুললে মনে হবে, যেন গোটা দেশ ভারত নামের এক চরম ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত।
ভারতকে গালি দেওয়ার জন্য কেবল উছিলা পেলেই চলে। এই তো কিছুদিন আগেই তো ঘটে গেলো কত বড় ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর সফরে ভারতের সঙ্গে এলপিজি ও পানি বিনিময় সমঝোতা চুক্তি নিয়ে ঝড় উঠেছিল। ‘দেশ বিক্রি’র স্লোগান তো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পুরনো আমল থেকেই চলে আসছে। যেকোনও চুক্তি বা সমঝোতা হলেই আওয়াজ ওঠে, দেশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। বুয়েটের আবরার হত্যার পেছনেও এই ভারতবিরোধিতাই কাজ করেছে বলেই জানা যায়।

এয়ারলাইনসের বাসে বসেছি প্লেন থেকে নেমে। যাত্রীদের বেশিরভাগই ফিরেছেন ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে, আবার কেউ ফিরেছেন তিনদিনের ছুটি কাটিয়ে। সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও আছেন। কক্সবাজারের তুলনায় কলকাতা যাওয়ার খরচ কম বলে অনেকেই পরিবারসহ কলকাতায় ছুটে যান। কী পরিমাণ লোক ভারতে যান এবং কেন যান, এর আরেকটি উদাহরণ দিতে চাই এখানে। যাওয়ার দিনে ‘উবারচালক’ আমার লাগেজ হাতে নিয়ে জানতে চাইলো আমি কলকাতা যাচ্ছি কিনা? বিস্ময় আর কিছুটা সন্দেহ নিয়েই জানতে চাইলাম, ‘ভাই কেমন করে জানলেন?’ জানালেন সারাদিন তিনি এয়ারপোর্টে ভারতে যাওয়ার যাত্রীদের নামিয়েছেন এবং কলকাতা যারা যান তাদের লাগেজ হালকা থাকে, তবে ফেরার সময় ভারী থাকে। এই হচ্ছে আমাদের ভারতবিরোধিতার নমুনা।

কলকাতার রাস্তায় গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগে বাংলাদেশিদের সঙ্গে। পরিচিত অনেকের সঙ্গে যখন দেশে দেখা পাওয়া মুশকিল, তাদের সঙ্গেই হয়তো সাক্ষাৎ হয়ে যায় কলকাতার নিউ মার্কেটের রাস্তায়। শপিং সেন্টারগুলোতে, খাবারের দোকানে ভিড়ের অধিকাংশই বাংলাদেশি দিয়ে ভরা।

অথচ গালি দেওয়ার সময়ে আমরা একেকজন হয়ে যাই বীরবিপ্লবী। ভারতকে গালি দেওয়ার মাঝেই যেন অনেকে খুঁজে পান জীবনের চরম তৃপ্তি। অবাক হয়ে যাই আমাদের এই দ্বিচারিতা দেখে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতের অবদানকে ভুলে যাওয়া মানে অকৃতজ্ঞতার প্রমাণ দেওয়া। প্রতিবেশী হিসেবে তাদের ব্যবহারকেও বা অস্বীকার করবো কেন? রাজনীতির জায়গায় রাষ্ট্র ও সরকার অবশ্যই তাদের নিজ নিজ স্বার্থরক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেবেন, আর এটাই যেকোনও রাষ্ট্রের নীতি। কলকাতার মানুষদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি পেয়েছি চরম আত্মীয়তার ছোঁয়া। ঘরের মানুষকে কাছে পেয়ে যেমন ব্যবহার, ঠিক তেমনি আন্তরিক তারা। আমরাও সেই আন্তরিকতাকে আশ্রয় করেই আরামে আয়েশে খেয়ে-পরে আসি সেই দেশ থেকে। অথচ সীমানা না পার হতেই আবারও শুরু করে দেই ভারতবিদ্বেষী কথাবার্তা। আমি জানি আমার এই লেখা পড়ার পর আমাকেও ভারতের দালাল বলে গালি দিতে কার্পণ্য করবেন না আমাদের বিপ্লবী কিছু জনতা। হয়তো দেখা যাবে কেউ কেউ ভারতের মাটিতে বসেই আমার এই লেখা পড়ছেন, আর দালাল বলে গাল দিচ্ছেন। আমি কথাগুলো বলছি, একদম বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই। বাংলাদেশে তিনদিনের লম্বা ছুটি গেলো কিছুদিন আগেই। একই সময়ে ফিরছিলাম কলকাতা থেকে। বিমান থেকে নেমে এয়ারলাইনসের বাসে করে আসছিলাম। পাশেই বসা ভদ্রলোক শুরু করে দিলেন ভারতের লোকদের গালিগালাজ। শুনলাম তিনি অহংকার করে গল্প করছেন কলকাতার ব্যবসা তো টিকিয়ে রেখেছেন আমাদের বাংলাদেশিরাই। ভাতের হোটেলে আজকাল জায়গা পাওয়া যায় না কেবল বাংলাদেশিদের জন্য। অথচ ‘ব্যাটাদের’ (কলকাতাবাসীর) ভাব কমে না। ভদ্রলোকের ভাষায়, ‘আমরা না গেলে তো ব্যাটা তোদের দোকানে মাছিও উড়তো না। ফকিন্নি হয়েই থাকতি।’ এই বক্তব্যে গলা মিলিয়েছেন বসে থাকা আরও কয়েকজন। খেয়াল করে দেখলাম তাদের সবার হাতে বিশাল বিশাল শপিং ব্যাগ, হ্যান্ড লাগেজ। যার প্রতিটির ওজন হবে হয়তো ৭ কেজি। আর যে ভদ্রলোক ‘ফকিন্নি’ বলে গালি দিচ্ছিলেন, তিনি ওখানে চিকিৎসা করে এসেছেন।

আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, ভাই আপনি গেলেন কেন? উত্তর দিলেন, ‘যেতে হয়। বোঝেন না, আমাদের দেশের ডাক্তাররা তো মানুষ না। চিকিৎসায় কোনও ভরসা পাই না।’ আশ্চর্য হয়ে ভাবলাম, তারা আসলে কোথায় ভরসা খোঁজেন? এই ভারতবিরোধিতা কি দেশপ্রেম না কোনও বিদ্বেষ? কী কারণ? ধর্মীয় না রাজনৈতিক? অথচ তারা একবারও ভাবছেন না, গালি দিলেও ভারত তাদের বাণিজ্যটা করে নিচ্ছে ঠিকঠাক, আর আমরা কেবল গালি দিয়েই শান্তি পাই। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে আমাদের সাধারণ নাগরিকদের ভূমিকাটা কতটুকু আছে? কলকাতার পোশাক যা কিনি তার বেশিরভাগই ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। কিন্তু কেবল ভারতে গেলেই সেটা বিদেশি হয়ে যাচ্ছে, আর কদর বেড়ে যাচ্ছে। ভারতকে বাণিজ্যটা কারা দিলো? চিকিৎসা এখন ওদের একটি বড় বাণিজ্যের নাম, কিন্তু আমাদের আস্থা অর্জন করে নিয়েছে তারা। অর্থাৎ, বাণিজ্য করলেই চলে না, এর সঙ্গে লাগে গ্রাহক বা সেবাগ্রহীতাদের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন। এ নিয়ে আমাদের কোনও অবদান আছে?

বাস্তবতা হচ্ছে আমরা যতই ভারতবিরোধিতা করি না কেন, তাদের অর্জনকে অস্বীকার করতে পারছি না বা পারবো না। তাহলে সত্য স্বীকারে বাধা কেন? এই মানসিকতা কি আমাদের দৈন্য হিসেবে প্রমাণ করে না? একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলাম কলকাতার বন্ধুদের কাছেও। তারাও অবাক যে ভারতে না এলে যাদের খাবার হজম হয় না, এত ভারতবিদ্বেষ নিয়ে বেঁচে থাকে কেমন করে?

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ