পেঁয়াজ নিয়ে মাতম, স্বাস্থ্য-চিকিৎসার খবর নেই

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৭:৩২, নভেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৪, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

আনিস আলমগীরপেঁয়াজ পেঁয়াজ বলে চতুর্দিকে মাতম উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া আর মেইনস্ট্রিম মিডিয়া একযোগে মাতম করছে। বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা মনে হচ্ছে কম দামে পেঁয়াজ পাওয়া। এক মাস ধরে প্রিন্ট মিডিয়ার প্রথম পাতার সংবাদ পেঁয়াজ। রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক সফরে দিল্লি গিয়েও কথা বলেছেন পেঁয়াজ নিয়ে। সেটি খবর হয়েছে দেশে-বিদেশে। আবার দুবাই যাওয়ার প্রাক্কালে ‘শুভ সংবাদ’ দিয়ে গেলেন  পেঁয়াজ প্লেনে উঠেছে। মানে বিদেশ থেকে পেঁয়াজের চালান আসছে উড়োজাহাজে করে। মনে হচ্ছে পেঁয়াজ ছাড়া জীবন অচল।
অথচ পেঁয়াজ না হলে যে জাতীয় সর্বনাশ হয়ে যাবে তেমন কিছুই নয়। এটি বাঙালির প্রধান আকর্ষণ ভাতের চালও নয়। মাত্র ৩০-৪০ বছর আগেও যখন পেঁয়াজের কেজি ১০-১২ আনা ছিল, তখনও গ্রামের ক’জন গৃহস্থের পেঁয়াজ দিয়ে তরকারি রান্না করার সামর্থ্য ছিল মুরুব্বিদের জিজ্ঞেস করুন। প্রধানমন্ত্রী পেঁয়াজ ছাড়াও রান্নার কথা বলেছেন, তা নিয়ে ট্রল হচ্ছে। তিনি যথার্থই বলেছেন, ৭শ’ টাকায় খাসির মাংস খেতে পারেন, ২৭০ টাকায় পেঁয়াজ খেতে কষ্ট কেন!
অথচ দেখুন, সাধারণ মানুষের জীবন ধারণের বহু কিছু আজ নাগালের বাইরে গেছে– তা নিয়ে কারও টুঁ-শব্দটি পর্যন্ত নেই। পেঁয়াজ নিয়ে কথা বলছেন, অথচ কৃষি আর কৃষকের অবস্থা নিয়ে চুপ। সামান্য একটি পেঁয়াজ যেটি এ দেশে প্রচুর চাষ হয় তার জন্য আমাদের বিদেশ-নির্ভর, বিশেষ করে ভারত-নির্ভর হতে হবে কেন! বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা কেন এতদিনেও সারা বছর চাষের উপযোগী পেঁয়াজ বা সারা বছর সংরক্ষণ করা যায় এমন পেঁয়াজের বীজ দেশের কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন না! দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়, কৃষকের দেওয়া নামে ‘রাখি’ পেঁয়াজ তো বাংলাদেশে আছে।

গত মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পায়নি বলে কৃষকরা পেঁয়াজ রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। কৃষকের ধানের মূল্য, পেঁয়াজের মূল্য যদি সরকার নিশ্চিত করতে না পারে কৃষক কেন চাষে আগ্রহী হবেন! এটি দেখার জন্য যথাযথ লোক কি কৃষি মন্ত্রণালয়ে আছেন? আমাদের খাদ্যের কী হাল? চালের আড়তদারকে খাদ্যমন্ত্রী বানিয়ে খাদ্য নিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত? ভেজাল ছাড়া পণ্য আছে? আর এতকিছু খেয়ে খেয়ে যে স্বাস্থ্যখানি বানিয়েছি, তার দুর্দশা হলে কি যথাযথ চিকিৎসা নিতে পারছি? সবকিছুরই তো বেহাল দশা। সেখানে আমরা চুপ। মিডিয়া চুপ। আছি পেঁয়াজ নিয়ে। পেঁয়াজের সিজন এসে গেছে, দামও কমতে শুরু করেছে- তারপর সব মাতম শেষ।

পেঁয়াজ না খেলে তো মারা যাচ্ছি না। ওষুধ না খেলে আমাদের চলে? কোটি মানুষ আছে ওষুধ-নির্ভর। অনেকের একদিনও বাঁচার ভরসা নেই ওষুধ ছাড়া। সেই ওষুধের মূল্য যে গত কয়েক মাসে ৫০% থেকে ১০০% বেড়ে গেলো কারও তো টুঁ-শব্দটি নেই- না মিডিয়ার, না সোশ্যাল মিডিয়ার বিপ্লবীদের।

দেশে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়, বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চবিত্তরা প্রধানত চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক বা আমেরিকা-ব্রিটেন। উচ্চ-মধ্যবিত্তরা যাচ্ছেন ভারত-মালয়েশিয়া। মধ্যবিত্তরা যাচ্ছেন প্রধানত দেশীয় প্রাইভেট হাসপাতাল আর নিম্নবিত্তদের একমাত্র ভরসা সরকারি হাসপাতাল। দেশে উন্নত মানের প্রাইভেট হাসপাতালের সাধারণ বেডের একদিনের ভাড়া দেড় হাজার থেকে তিন হাজার, কেবিনের ভাড়া ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার আর আইসিইউতে ঢুকাতে পারলে একদিনের ভাড়াই তুলে নিচ্ছে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার। হাবিজাবি করে দিনে রোগীর কাছ থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে নিচ্ছে।

২০১৬ সালেও ডাক্তার দেখানোর ফি ছিল ৫০০ টাকা। ২০১৭ সালে এসে রাতারাতি হয়ে গেলো ডবল- এক হাজার টাকা। এখন ১২০০ টাকা থেকে ১৫০০  টাকা করে নিচ্ছেন নামি ডাক্তাররা। একটু নাম ফাটলে যার যত বেশি ফি তিনি তত বড় ডাক্তার বুঝাতে চাচ্ছেন রোগীদের।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। নিম্নবিত্তরা বারান্দায়, ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার ফ্লোরে শোয়ার অভ্যাস নেই বলে শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে মধ্যবিত্তদের। হাসপাতাল থেকে আসার সময় গড়ে ৫-১০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষ কোটি টাকাও চলে যাচ্ছে কারও। বেশি বিলের করুণ কাহিনিও মাঝে মধ্যে পত্রিকায় দেখি যখন পরিবার- পরিজন বিল দিতে পারছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর লাশ আটকে রাখে। সব কাহিনি মিডিয়ায় এলে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার নামের ডাকাতির কাহিনিতে পত্রিকার সব পৃষ্ঠা ভরা থাকতো।

প্যাথলজিগুলোর অবস্থা দেখুন; একটি টেস্ট করতে মালিকের কত টাকা ব্যয় হয় আর রোগীর কাছ থেকে কত চার্জ নেয় তারা। যেকোনও ডাক্তারের কাছে যাবেন আপনাকে ধরিয়ে দিবে ২-৫টা টেস্ট। সবটার হয়তো প্রয়োজনও নেই। এসব পরীক্ষা এখন চিকিৎসার ক্ষেত্রে লোভনীয় বাণিজ্য। আপনি হয়তো জানেন না, শহরের নামিদামি ডাক্তারদের অনেককে কোটি টাকায় কিনে নিয়েছে এই প্যাথলজিগুলো। ডাক্তার যদি কোটি টাকায় বিক্রি হয়ে তার সব টেস্ট ওই নির্দিষ্ট প্যাথলজিতে করতে পাঠান, তখন ভাবুন প্যাথলজিকে কত টাকা তুলতে হয় রোগীদের কাছ থেকে। কত কোটি টাকার অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা হয় ওইসব ল্যাবে!

কয়েক বছর আগে ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে এখন অনেকে বড় বড় হাসপাতালের মালিক। প্রতিদিন বাড়ছে তাদের শাখা। ডাক্তারদের কমিশন না দিয়ে কেউ ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালাতে পারছেন না। চালানোর চেষ্টা করে হতাশ অনেকে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আর ডাক্তারের এই নির্লজ্জ কারবার জেনেও ব্যবস্থা নেওয়ার কেউ নেই দেশে।

প্রাইভেট ক্লিনিক-হাসপাতালগুলো যেভাবে লাগামহীনভাবে সেবার মূল্য নির্ধারণ করছে তার লাগাম টেনে ধরতে হবে। মধ্যবিত্তরা জীবন বাঁচানোর আশায় ক্লিনিকে যায় সত্য কিন্তু সব হারিয়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে ফিরে আসে। পরিবারের একজন মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে কত পরিবার পথে বসেছে, কত লোক নীরব কান্না কাঁদছে- সেটি কোনও দিন খবরের পাতায় আসবে না। এই মানুষগুলোর জন্য বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের কোনও দয়ামায়া, মানবতা কিছুই নেই। এর মালিকরা সবাই উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটক ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ এর সেই কুখ্যাত চরিত্র ‘শাইলক’-এর মতো। ডাক্তার-ক্লিনিকের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে মিডিয়া নীরব।

অথচ মামুলি পেঁয়াজ নিয়ে মিডিয়া এক মাসব্যাপী যুদ্ধরত। মিডিয়াগুলো চিকিৎসার ব্যাপারে সচেতন না হলে, সরকার কর্ণপাত না করলে যেই অবস্থা বিরাজ করছে তা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। তাদের অনাচারের কাহিনি অনুসন্ধানী রিপোর্টে উঠে আসা দরকার। সরকারি কর্তৃপক্ষের এদের অত্যাচারের লাগাম টেনে ধরা দরকার।

দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সহজলভ্য আর সাধারণ মানুষের নাগালের ভেতরে আনতে হলে সরকারি পর্যায়ে আরও বহু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকার জনগণের জন্য কোটি কোটি টাকা স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করছে কিন্তু তার সিংহভাগ যাচ্ছে জলে। সরকারি হাসপাতালগুলো আছে একের পর এক নতুন যন্ত্রপাতি কেনার তালে। ডাক্তাররা আছেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে। সরকারি অনেক হাসপাতালে কেনা হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র। আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনলেও সেটি বসানো আর চালানোর লোক না থাকায় বাক্সবন্দি থাকতে থাকতে বাতিল যন্ত্রাংশ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতের টেন্ডার নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। দু-চারটা যা মিডিয়া রিপোর্ট আছে, সঠিক এবং দ্রুত বিচার হলে এই খাতের বড় বড় ডাকাতদের অনেক আগেই ফাঁসি হতো।

ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের প্রসার হয়েছে আমাদের দেশে। এখন বিদেশেও বাংলাদেশ ওষুধ রফতানি হয়। অথচ ওষুধের মূল্য ঊর্ধ্বগামী। ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকেরা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা না করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে বিবেক-বিবেচনার পরিচয় দিচ্ছেন না। সরকারও ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে উদাসীন। এরশাদ সরকার ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাহায্য নিয়ে ওষুধ নীতি প্রণয়ন করে প্রশংসিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

রাষ্ট্র যদি তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয় তবে সেই রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সব বিষয়ে তৎপর হতে হয়। আমরা দীর্ঘদিন একটি বিষয় লক্ষ করছি সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীই তৎপর। সেটি আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। কিন্তু অন্য কোনও মন্ত্রীকে দেখি না তার মন্ত্রণালয় নিয়ে তৎপর হতে। কৃষির উদ্ভাবন আর কৃষকের সমস্যা নিয়ে মতিয়া চৌধুরীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে। তোফায়েল আহমেদের মতো ব্যবসায়ীদের সমস্যার ত্বরিত সমাধান আর তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

গুদামে পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে অথচ ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ বিক্রি করছেন না। এর সোজা অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র ব্যবসায়ীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের মন্ত্রিসভায় রাজনীতিবিদের চেয়ে ব্যবসায়ী বেশি হয়েছে। পার্লামেন্টেও একই অবস্থা। ব্যবসায়ী শাসন উত্তম শাসন হয় না। এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ব্যাপার। সম্ভবত মন্ত্রিসভা দুর্বল হয়েছে। শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ লোকদের মন্ত্রী করা দরকার যেন সর্বত্র কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখে যেন মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস করেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ