তাদের জিততে দেওয়া যাবে না

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:২৭, নভেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪০, নভেম্বর ২০, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন একটি ভিডিও ভাসছে। স্পর্শকাতর যেকোনও মানুষ তা দেখলে ভাববেন, কোন অসভ্য সমাজে বাস করছি আমরা! চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিতে আঘাত করছে একদল উচ্ছৃঙ্খল পরিবহন শ্রমিক। সড়ক খাতে যারা দীর্ঘ সময় ধরে অপশাসন কায়েম করেছে, যারা কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে শ্রমিকদের শোষণ করছে, সেই মাফিয়ারাই আবার শ্রমিকদের মাঠে নামিয়েছে সংসদে পাস হওয়া আইনের বিরুদ্ধে। এই আইন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাওয়ায় হয়েছে। কারণ, দেশব্যাপী ছাত্রসমাজের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সময় তিনি জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংসদে পাস হওয়ার ১৪ মাস পর কার্যকর হওয়া এই আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা রাষ্ট্র ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নেমেছে।  
কিছু প্রশ্ন আজ সামনে আসছে। সড়ক তুমি কার? কার কথায় তুমি চলবে? তোমার ওপর দিয়ে চাকা চালানোর সুযোগ পেয়েছে যে পরিবহন মালিক ও তাদের শ্রমিকরা, কেবল তাদেরই আজ্ঞাবহ তুমি? যে মানুষ সড়ক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার খরচ জোগায়, যাদের করের টাকায় রাষ্ট্র চলে, তারা মরলো কী বাঁচলো, সেই বিবেচনা করবে কেবল পরিবহন মালিক আর শ্রমিকরা? আইন হলে মানা যাবে না, এটাও তাদেরই একমাত্র অধিকার? গণতন্ত্র মতে, নৈরাজ্যের অধিকার কায়েমে এই মালিক-শ্রমিক ভয়ংকর ঐক্যই তবে সেরা পদ্ধতি? সেক্ষেত্রে মানুষ ও সরকারের অস্তিত্বের দরকার কী? তারা নিতান্ত এলেবেলে? বিআরটিএ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু মায়া-মরীচিকা?

দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের সড়কে গণহত্যা চলছে। বাংলাদেশের কালো পিচঢালা পথ আজ  রক্তাক্ত। কোনও আইনের তোয়াক্কা করছে না পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের একটা পক্ষ। তারা কোনও অপরাধকেই অপরাধ মনে করছে না, তারা অপরাধ করলেও ইনডেমনিটি চায়। অথচ নতুন সড়ক পরিবহন আইনে পথচারী ও সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।   

নিরাপদ সড়ক মানুষের অধিকার। গত বছর সারাদেশে একযোগে শিক্ষার্থীদের সড়ক আন্দোলন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল কী অবস্থায় আছি আমরা। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বলেছিলেন, শিশু-কিশোররা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আর এটা তিনি বুঝতে পেরেছেন বলেই আইন করেছেন।  

যে মাফিয়া গোষ্ঠী এই আইনের বিরোধিতা করছে, তারা শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে রাস্তায় নৈরাজ্য করছে। এখন মনে হচ্ছে শ্রমিক আর মালিকদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে সড়ক পরিচালনার ভার। গত কয়েকদিন ধরে সড়কে নৈরাজ্যের আড়ালে এই বন্দোবস্তেরই পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। ভাবটা এমন, পৃথিবী যেদিকে যাক, এই গোষ্ঠীর মত অনুযায়ীই সব আইন হতে হবে। কেন এমনটা হলো? 

প্রথম দুর্বলতা সরকারের দিক থেকে ছিল আইনটা সংসদে পাস হওয়ার পরই কার্যকর না করা। এতদিন লুকোচুরি করে, শেষ পর্যন্ত প্রস্তুতি ছাড়া, বিধি প্রণয়ন ছাড়া এই আইন কার্যকর করা হলো। ফলে একদিকে সড়কে শ্রমিক সন্ত্রাস, অন্যদিকে বিধিমালা না হওয়ায় বেকায়দায় প্রয়োগকারীরা। আইন প্রয়োগ করতে গেলে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, সে বিষয়টি রাষ্ট্রের আগেই ভাবা দরকার ছিল। ২০১০ সালে এই আইন তৈরি হয়েছে। ১৪ মাস আগে পাস হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট ছিল ঠিকই। কিন্তু সেই প্রস্তুতি আমরা দেখিনি। বাংলাদেশে ভারী গাড়ির চালক নেই, চালক তৈরির উদ্যোগ নেই, ফিটনেসবিহীন বাস, লেগুনা, নছিমন সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেই। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যেন চলছে অন্ধভাবে।

রাষ্ট্র নিশ্চয়ই অবারিত এবং অভাবিত সড়ক মাফিয়াতন্ত্রে বিশ্বাস রাখে না। এখন সড়কে যা করছে বা করানো হচ্ছে শ্রমিকদের দিয়ে, তা  শুধু নৈরাজ্য নয়, রীতিমতো জঙ্গি আক্রমণ। এরা এই অধিকার পেতে পারে না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একটি আইন হয়েছে। সেই আইন হঠাৎ করে সন্ত্রাসীদের চাপে পরিবর্তন করা চলে না। এই আইন হয়তো বিশ্বমানের হয়নি, কিন্তু কোনও খুনে-গোষ্ঠীর স্লোগানের স্রোতে এই আইন ভেসে যেতে পারে না। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যখন বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের যতই চাপ থাকুক না কেন, নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন করা হবে, তখন আমরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আশ্বাস রাখতে চাই।

পরিবহন খাতে শাসক দল আর বিরোধী পক্ষ সবারই প্রশ্রয় আছে। রাজনৈতিক প্রশ্রয়েই সড়কে মানুষের ওপর এই নির্যাতন চলছে। বেআইনি, অনৈতিক আন্দোলনে লাগাতার রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের ফল কী হয়, এ দেশের ট্রেড ইউনিয়নের ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষা দিয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। পরিবহন খাতের নৈরাজ্য নতুন আইনটির ভবিষ্যৎ কতখানি প্রভাবিত করবে, তা সেই শিক্ষার ওপরই নির্ভর করছে। 

নতুন সড়ক পরিবহন আইনটি আগের তুলনায় কঠোর, কিন্তু সেই আইন মানাতে যদি বাধ্য করা না যায়, তবে শুধু আইনের কঠোরতায় ফল মিলবে না। দরকার আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া, সেটাই এখন শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ। কোনোভাবেই সন্ত্রাসী ও নৈরাজ্যকারীদের জিততে দেওয়া যায় না। 

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ