মিয়ানমারের বিচারই কি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান?

Send
রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৭:২৭, নভেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৯, নভেম্বর ২১, ২০১৯

রাহমান নাসির উদ্দিনমিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও কিছু চরমপন্থী রাখাইন মিলে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং জেনোসাইড চালিয়েছে, তার বিচার চেয়ে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে-বিদেশে নানান আহাজারি হয়েছে কিন্তু বিচার কে করবে? কার বিচার করবে, কীভাবে করবে? বিচার করার এখতিয়ার কার আছে? মামলা করবে কে? তথ্য-প্রমাণ কোথায়?—এমন নানা প্রশ্নের গ্যাঁড়াকলে পড়ে মিয়ানমারকে কোনোভাবেই বিচার ও জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি। আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনার জন্য নানা আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনও আলোচনার স্রোতই সুনির্দিষ্ট মোহনায় পৌঁছাতে পারেনি।
অবশেষে, নানা ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে গত সপ্তাহে মিয়ানমারের বিচার চেয়ে মোটা দাগে তিনটি মামলা হয়েছে। একটি হয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস বা আইসিজি), দ্বিতীয়টি হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট-আইসিসি) এবং তৃতীয় হয়েছে আর্জেন্টিনার আদালতে। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময়  পার হওয়ার পরও কোথাও যখন কোনও মামলার খবর নেই, তখই হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিন তিনটি মামলা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। অত্যন্ত বোধগম্য ও স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশেও এসব মামলা খবরে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। সনাতন মিডিয়া, সামাজিক মিডিয়া ও বিকল্প মিডিয়ায়ও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা-প্রশংসিত হচ্ছে। যেকোনও কিছুকে আনক্রিটিক্যালি ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ হিসেবে গ্রহণ করে বেহুদা লাফাতে আমি খুব একটা অভ্যস্ত নই। আমার মনে বড় একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, তা দিয়ে যদি মিয়ানমারের সামান্য বিচারও হয়; নিদেনপক্ষে টুকটাক শাস্তিও নিশ্চিত করা যায়; তা দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার কতটুকু সমাধান হবে? বিশেষ করে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিাঞ্চলের বিস্তৃত প্রান্তরজুড়ে বসবাসরত ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে ইজ্জতের সঙ্গে এবং তার আইনি ও মানবিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চিয়তার মাধ্যমে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো কতটুকু সম্ভব হবে? মোটা দাগে এসব মামলার দীর্ঘ ফাঁক-ফোকরে উল্টো প্রত্যাবাসন-প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে কিনা? এসব বিষয় নিয়ে আমার চিন্তাভাবনাগুলো এখানে পেশ করছি।  

আইসিসির তদন্তের নির্দেশ

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি)তে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য এরই মধ্যে নানাভাবে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু মিয়ানমার আইসিসি সদস্য রাষ্ট্র নয় বলে আইসিসি’র এখতিয়ারের মাধ্যমে মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনা যায় কিনা, তা নিয়ে হয়েছে নানা আইনি-বিতর্ক। তবু, গত বছর আইসিসি  স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মিয়ানমারকে চিঠি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যে গণহত্যা, জেনোসাইড, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আছে, তার ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। মিয়ানমার তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে। পাশাপাশি, আইসিসি’র এ ধরনের চিঠি দেওয়ার এবং ব্যাখ্যা চাওয়ার এখতিয়ার আছে কিনা, তা নিয়ে মিয়ানমান পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

প্রসঙ্গত, আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হয় প্রধানত ১৯৯৮ সালের রোম স্টেটিউটস-এর ওপর ভিত্তি করে, কিন্তু সেটা সেট-আপ করে কার্যক্রম শুরু করে ২০০১ সালের জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে। বিশ্বব্যাপী ১ জুলাই ২০০১ সালে বা তার পরে সংঘটিত (১) জেনোসাইড, (২) মানবতাবিরোধী অপরাধ, (৩) যুদ্ধাপরাধ ও (৪) আগ্রাসনের অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার নিয়ে আইসিসি গঠিত হয়। বর্তমানের আইসিসি’র সদস্য রাষ্ট্র  ১২২টি। কিন্তু গ্যাঁড়াকল হচ্ছে বাংলাদেশ আইসিসি’র সদস্য রাষ্ট্র হলেও মিয়ানমার নয়। ফলে, মিয়ানমারের বিচার করতে পারে কিনা আইসিসি, সেটা যেমন একটি প্রশ্ন, আবার আইসিসি’র সিদ্ধান্ত বা রায় মানতে মিয়ানমারও বাধ্য নয়। তবু আইসিসি’র একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে  ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে জোর করে পাঠানোর জন্য মিয়ানমারকে দায়ী করা যায় কিনা, তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আইনজ্ঞরা বহু বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। এসব বিচার-বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায় আইসিসি’র প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোয়া বেনসুদা একটি আবেদন করেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন, মিয়ানমার জোর করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করে। মিয়ানমারে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করে, যেন তারা দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যায়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। অবশেষে নভেম্বরের ১৪ তারিখ আইসিসি’র একটি একটি জুডিশিয়াল প্যানেল মিয়ানমার যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তার তদন্তের নির্দেষ দেয়। ফলে, চতুর্দিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। আইসিসি’র নির্দেশ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যে লেভেলের উচ্ছ্বাস আমরা প্রকাশ করছি, সে লেভেলের উচ্ছ্বাস প্রকাশের মতো তেমন কিছু এখানে নেই। কেননা এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমার হয়তো আরও বেশি আন্তর্জাতিক সমালোচনার সম্মুখীন হবে এবং নতুন করে একটা আন্তর্জাতিক চাপ অনুভব করবে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তা কতটুকু ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার আমি কিছু দেখি না। বিস্তারিত আলোচনা প্রবন্ধের শেষান্তে।   

আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলা

২০১৭ সালের মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত জেনোসাইডের বিচার চেয়ে ৫৭টি ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে আফ্রিকার একটি ছোট্ট মুসলিম প্রধান দেশ গাম্বিয়া  আইসিজেতে মামলা করেছে। এ মামলা নিয়েও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা চলছে এবং সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর ১৯৯৪ সালে রোয়ান্ডায় সংঘটিত জেনোসাইডের বিচার-কার্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেন যে, ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যা রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একইভাবে দুই দশকেরও বেশি সময় পরে এসেও ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের চোখের সামনে মিয়ানমারে যে জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে, তা রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমি পত্রিকায় লিখেছি, ‘এরকম একটি তাড়না এবং প্রেরণা থেকে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী জাতিসংঘের অধীনে ১৯৪৮ সালে স্বাক্ষরিত জেনোসাইড কনভেশনের আওতায় প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারে সংঘটিত জেনোসাইডের বিচার চেয়ে এ-মামলাটি করেন। যেহেতু গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয় রাষ্ট্রই জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এবং ১৯৪৮-এর জেনোসাইড কনভেশনের অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারিক শর্তের আওতাভুক্ত এবং অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু এ-মামলায় মিয়ানমারও যথাযথভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আসতে বাধ্য; অন্তত আন্তর্জাতিক বিধি-বিধানের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী সেটাই হওয়ার কথা।’ কিন্তু এখানে আইসিজের আইনি ক্ষমতা, পরিধি ও এখতিয়ারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। কেননা, আইসিজে’র এখতিয়ার হচ্ছে প্রধানত দু’টি বিষয়।   এক. যদি জাতিসংঘের সদস্য দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে কোনও আইনগত বিরোধ থাকে, তার মিমাংসা করা; দুই. কোনও বিষয়ের কোনও আইনগত জটিলতা তৈরি হলে কোনও সদস্য রাষ্ট্রের অনুরোধে আইনগত অভিমত দেওয়া। যেহেতু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তেমন কোনও আইনি জটিলতা ও আইনি কোনও বিরোধ নেই, সেহেতু আইসিজে’র ক্ষমতা ও এখতিয়ার সেখানে মিয়ানমারে সংঘটিত জেনোসাইডের বিচার সত্যিকার অর্থে কোন ধারায় এবং কোন কাঠামোয় সম্ভব, সেটি একেবারেই পরিষ্কার নয়। ফলে, মিয়ানমারে সংঘটিত জেনোসাইডের বিচার চেয়ে আইসিজে’তে গাম্বিয়ার করা মামলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিডিয়ার সাময়িক উত্তেজনা নিয়ে খুব বেশি বিগলিত হওয়ার আমি কিছু দেখি না। তবে, হ্যাঁ। এ মামলা দায়ের করার সঙ্গে সঙ্গে একটি মামলা নিষ্পত্তি না-হওয়ার আগ পর্যন্ত সব ধরনের জেনোসাইডাল অ্যাক্টিভিটিজ বন্ধ রাখার জন্য একটি প্রভিশনার আদেশ জারির অনুরোধ এখানে করা হয়েছে। যা করার এখতিয়ার আইসিজে’র আছে। সে বিবেচনায় এ-মামলার একটি গুরুত্ব আছে বৈকি। আইসিজে বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় আগামী ১০, ১১ এবং ১২ ডিসেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেছেন। আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে, প্রাথমিক শুনানি শেষে একটি প্রভিশনাল রায় হিসেবে মিয়ানমারে জেনোসাইডাল কার্যক্রম বন্ধের একটা আদেশ দেওয়া হবে, তাতে আখেরে খুব একটা লাভের কিছু নেই। কারণ, জেনোসাইড যা ঘটানোর, তা ঘটে গেছে বা ঘটানো হয়ে গেছে ২০১৭ সালে। সুতরাং এখন তা বন্ধের প্রভিশনাল রায় দেওয়ার মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনে যে তেমন কোনও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, তার কোনও আলামত আমি দেখি না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এ রোহিঙ্গা সমস্যার সবচেয়ে বড় ভিকটিম বাংলাদেশের পক্ষে থেকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কোনও ইতিহাচক সুযোগ তৈরি হবে বলেও আমার মনে হচ্ছে না।

আর্জেন্টাইন কোর্টে সু চির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা 

যখন আইসিসি’তে মিয়ানমারের মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলো এবং আইসিজে’তে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জেনোসাইড সংঘটনের মামলা হলো, ঠিক তখনই আর্জেন্টিনার আদালতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলের উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সাং সু চি এবং মিয়ানমারের শীর্ষ স্থানীয় সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিটি ঘটনা প্রায় একই সময়ে হওয়ায় বিশ্বব্যাপী আর্জেন্টিনায় হওয়া মামলাও বিশ্বব্যাপী বেশ আলোড়ন তুলেছে এবং বহুলভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। যেসব যুক্তিতে এ মামলা করা হয়েছে, সেগুলো হলো, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার পৃথিবীর যেকোনও দেশে বা জায়গায় হতে পারে। যাকে বলা হয় ‘সর্বজনীন এখতিয়ারনীতি’। এ-নীতির আওতায় কিছু ডাইয়াসপোরা রোহিঙ্গা ও ল্যাটিন আমেরিকার কিছু মানবাধিকার সংগঠন আর্জেন্টিনার আদালতে এ-মামলা করেন। আর্জেন্টিনার আদালতে এ-মামলা করার কারণ হচ্ছে, এ-ধরনের ফৌজদারি অপরাধের মামলা অন্য কোথাও করার কোনও সম্ভাবনা নাই। তবে, এর পেছনে কিছু ঐতিহাসিক উদাহরণও আছে। কারণ, এর আগে স্পেনের সাবেক স্বৈরশাসক ফান্সিসকো ফ্রেঞ্চো ও চীনের ফালুন আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আদালতের মামলাও আর্জেইন্টান আদালত গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং এ-মামলার মাধ্যমেও সু চি ও মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে এবং প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা যাবে। ফলে, এ মামলাও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

মামলা ও মামলার রায় কি সমাধান?

এ কথা অনস্বীকার্য যে, আইসিসি’র তদন্তের নির্দেশ, আইসিজে’তে ওআইসি’র পক্ষে গাম্বিয়ার মামলা এবং আর্জেন্টাইন আদালতে সু চি ও সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার চেয়ে মামলা করার ঘটনা মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে। একইসঙ্গে বিশ্বপরিমণ্ডলে মিয়ানমারের অবস্থান একটি জেনোসাইড সংঘটনকারী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী ও যুদ্ধাপরাধকারী রাষ্ট্র হিসাবে নতুন করে উপস্থাপন করবে। চীন, রাশিয়া, জাপান ও ভারতের প্রায় একতরফা এবং নিঃশর্ত সমর্থন পাওয়ার কারণে মিয়ানামরের যে ‘ড্যাম কেয়ার’ ভাব, সেটি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়বে। ফলে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এসব মামলার গুরুত্ব একেবারেই কম নয়। কিন্তু এসব মামলা দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার কী সমাধান হবে? যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা, অন্যদেশে শরণার্থী হয়ে জীবন-যাপন করছে, তাদের জীবনের সংকট উত্তরণে এসব মামলা কী ভূমিকা রাখবে? বাংলাদেশই বা এর মাধ্যমে কীভাবে লাভবান হবে? এসবই এখন বড় প্রশ্ন। আমার নিজের ব্যক্তিগত ধারণা হচ্ছে, এসব মামলা দিয়ে বিশ্বব্যাপী কিছু মানবাধিকার সংগঠন বাহবা পাবে, আইসিসি এবং আইসিজে কিছু প্রশংসা পাবে এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে সমালোচনার ডিসকোর্স বিশ্বব্যাপী জারি আছে, সেখানে নতুন কিছু ‘ঘি’ যুক্ত হবে। কিন্তু মিয়ানমারে বসবাসরত প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা, মিয়ানমারের সেনানিয়ন্ত্রিত গুচ্ছগ্রামে অবস্থিত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় এগারো লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জীবনের গুণগত পরিবর্তনে এবং তাদের বিদ্যমান অবস্থার রূপান্তরে কোনও বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে, এটা বিশ্বাস করা কষ্টকর। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ যে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা-প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য বারবার চেষ্টা করছে, সেখানেও কোনও ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমার মনে হয় না।

অতএব, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার জিকির তুলে অর্থহীন উল্লাস করার চেয়ে অধিকতর জরুরি হচ্ছে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কার্যকর ও ফলপ্রসূ পলিসি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং তা বাস্তবায়নের দিকে জোর নজর দেওয়া। রোহিঙ্গাদের কীভাবে তাদের মান-ইজ্জত-নাগরিকত্ব-বসতভিটাসহ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়, তার উপায় বের করা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, রোহিঙ্গদের নিয়ে বাংলাদেশ যে একটা বড় ধরনের ট্রেপে পড়েছে, সেখান থেকে কীভাবে উদ্ধার হওয়া যায়, সেদিকে নজর দেওয়া।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।   

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ