ইমপিচমেন্ট দিয়ে কি ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে?

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৫:৪২, নভেম্বর ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৪, নভেম্বর ২৬, ২০১৯

আনিস আলমগীরপ্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য জলবায়ুর সংকটে এখন গোটা বিশ্ব বিপন্ন হওয়ার পথে। অথচ ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন। গত ৪ নভেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন প্যারিস চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগামী বছরের ৪ নভেম্বর চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার অনুমতি দিতে বলেছে। মানে আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একদিন পরই তারা যাতে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
২০১৫ সালে প্যারিসে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করার জাতীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র দেশ এবং বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে তার ভূমিকা দ্বিতীয়। এই লোকটি কোনোভাবেই মানতে নারাজ, মনুষ্যসৃষ্ট কোনও কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হতে পারে।
সারা বিশ্বের জন্য আপদ এই ট্রাম্প তার দেশের ইতিহাসেও কলংকযুক্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর বুধবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটাল হিলে শুরু হয়েছে ট্রাম্পের অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট বিষয়ে প্রথম উন্মুক্ত শুনানি। সেখানে প্রতারক, বর্ণবাদী, লম্পট থেকে শুরু করে এমন কোনও খারাপ বিশেষণ বাদ যাচ্ছে না তার নাম উচ্চারণ করার সময়। জনগণের অবগতির জন্য টেলিভিশনে তা প্রচার করা হয়েছে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি তার হাতে থাকা ইউক্রেনের চারশ’ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সাহায্য অবমুক্ত করার বিনিময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির একটি আনুকূল্য চেয়েছেন। আনুকূল্যটা হচ্ছে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডেমোক্র্যাট দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ যেন তদন্ত করেন।

জো বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার পুত্র হান্টার বাইডেন ইউক্রেনের একটি প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ওই কোম্পানির কিছু কাজ আইনত সিদ্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে জুনিয়র বাইডেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে পারে বলে সিনিয়র বাইডেন তার রাষ্ট্রীয় প্রভাব খাটিয়ে ইউক্রেনের এক প্রসিকিউটরকে বরখাস্ত করতে চেয়েছিলেন। এখন এসব অভিযোগের একটি তদন্ত শুরু করতে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেছেন। ইশারা-ইঙ্গিতে ট্রাম্প এটিও বুঝিয়েছেন, নতুবা আমেরিকার সামরিক খাতে প্রদত্ত ৪০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য পাওয়া যাবে না।

সম্ভবত জো বাইডেন এবং হান্টার বাইডেনকে তদন্তের সম্মুখীন করতে পারলে ট্রাম্প আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অস্ত্র হাতে পাবেন। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই দুরভিসন্ধিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে অভিশংসনের জন্য ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করে প্রকাশ্যে শুনানির আয়োজন করেছেন। কারণ তারা প্রতিনিধি পরিষদে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। অভিশংসনের শুনানিতে এখন সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

প্রতিনিধি পরিষদের ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রধান অ্যাডাম শিফ বলেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে ফোন আলাপ মুছে ফেলতে ট্রাম্প যা করেছেন তা রিপাবলিকান দলীয় সাবেক ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির চেয়েও গুরুতর। গত ২৫ জুলাই হোয়াইট হাউস থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে এই টেলিফোন করেছিলেন। টেলিফোনের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর অভিশংসনের বিষয়টি গতি লাভ করেছে।

অভিশংসনের প্রস্তাব পাস করতে নিম্নকক্ষে কোনও অসুবিধা হবে না। সেখানে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যায় বেশি আছে। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে শুনানির পর অভিশংসনের প্রস্তাব পাস হতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট, প্রস্তাবের পক্ষে পড়তে হবে মোট ২১৮টি ভোট। কিন্তু ১০০ সদস্যের সিনেটে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে হলে লাগবে দু-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অর্থাৎ অন্তত ৬৭ জন সিনেটরের সমর্থন। সিনেটে রিপাবলিকান পার্টি ৫৩ আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে প্রয়োজনীয় ভোট পেতে হলে রিপাবলিকান সিনেটরদেরও সমর্থনের প্রয়োজন। এখানে ট্রাম্পকে কাবু করা যাবে কিনা সে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর রিপাবলিকান সিনেটররাও নড়েচড়ে বসেছেন। এখন বিষয়টি তারা তদন্ত করছে। কারণ সাধারণত আমেরিকার সিনেটররা যদি বুঝে, প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের কারণে বিপন্ন করেছেন, তাহলে স্বদলীয় প্রেসিডেন্ট হলেও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মতো সুবিবেচনা আমেরিকা সিনেটরদের রয়েছে। ট্রাম্পের ব্যাপারে কী হয় জানি না।

বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবির এই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও বিচার কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনে অভিশংসনের প্রস্তাব তৈরির কাজ করছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের পক্ষে কিছু রিপাবলিকান সিনেটর হোয়াইট হাউসের সঙ্গে মিলে সিনেটে অভিশংসন ঠেকাতে একসঙ্গে কাজ করছেন। কাগজপত্র তৈরি হলে আমেরিকার ইতিহাসে তিনি হবেন তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, যার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে আনা হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মাত্র দু’বার দু’জন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়েছেন। অ্যান্ড্রু জনসন ১৮৬৮ সালে এবং বিল ক্লিনটন ১৯৯৮ সালে। তবে তাদের পদ ছাড়তে হয়নি। সিনেটের বিচার প্রক্রিয়ায় দু’জনেই খালাস পান। তবে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে অভিশংসন প্রস্তাব আনার প্রক্রিয়া চলার সময় তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব এখনও গৃহীত হয়নি। প্রস্তাব গৃহীত হলে প্রস্তাবের বিষয়টি পুনরায় তদন্ত হবে। তখন ট্রাম্প পদত্যাগ করবেন কী করবেন না, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

অবশ্য মানুষে মানুষে তফাৎ থাকে। নিক্সন ছিলেন শিক্ষক মানুষ। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর ট্রাম্প হচ্ছেন ব্যবসায়ী মানুষ। ব্যবসায়ীদের নৈতিকতাবোধ কম। ট্রাম্পের আরও কম। মিথ্যা বলতেও তার বিবেকে বাধা দেয় না। ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রধান অ্যাডাম শিফের সাক্ষ্য দেওয়ার আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গর্ডেন সল্টল্যান্ড তার সাক্ষ্যে বলেছেন, জো বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে চাপ দেওয়ার নির্দেশ ছিল ট্রাম্পের। সল্টল্যান্ড বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বন্টন বিষয়টি জানতেন। সল্টল্যান্ড আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চেয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত আইনজীবী ও নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র রুডি গিউলিয়ানি ইউক্রেনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের নেতৃত্বে থাকেন।

রাষ্ট্রদূত সল্টল্যান্ড বলেন, ট্রাম্পের নির্দেশে তিনি ইউক্রেন ইস্যুতে রুডি গিউলিয়ানির সঙ্গে কাজ করেছেন। তার এই সাক্ষ্য ইউক্রেন বিতর্কে ট্রাম্পের সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ দিচ্ছে। সল্টল্যান্ড বলেছেন, তিনি ইউক্রেনকে বলেছেন তারা ট্রাম্প এবং গিউলিয়ানির দাবি মেনে বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্তের একটি সরকারি বিবৃতি না দেওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য নাও পেতে পারেন। সল্টল্যান্ডের কথায় যুক্তরাষ্ট্রের ওই নিরাপত্তা সহায়তা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং তাতে বিলম্ব হওয়া উচিত ছিল না। তদন্তের উদ্বোধনীতে সল্টল্যান্ড একটা সাক্ষ্য দিয়ে বোমা ফাটিয়েছেন।

নিক্সনের অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। ক্লিনটনের অভিশংসনের কারণ ছিল নারীঘটিত বিষয়। আর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর—সংবিধান লঙ্ঘন, আইন ভঙ্গ করা, নিজের স্বার্থে দেশের নিরাপত্তাকে জিম্মি করা। এই অভিশংসন দ্বারা রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হওয়ার মতো সুবিধা পাওয়া যাবে কিনা, এ নিয়ে অবশ্য ডেমোক্র্যাট শিবিরের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে।

দেখা যাক এই অভিশংসন প্রক্রিয়া ট্রাম্পকে কতটুকু অসহায় করতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ