অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ার আগেই পদক্ষেপ জরুরি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:২৫, নভেম্বর ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৬, নভেম্বর ২৮, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবিশ্বব্যাপী মন্দার পদধ্বনি। চীন ও ভারতের মতো দেশের অর্থনীতিও মন্দাকবলিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মুখে পড়েছে এখন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আগে একবার মন্দা খুবই যোগ্যতার সঙ্গে সামাল দিয়েছিলেন। এবারও বর্তমান অর্থমন্ত্রীকে যোগ্যতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। বিদেশিদের রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অন্য সব সূচক নিম্নগামী দেখা যাচ্ছে। পণ্ডিতেরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি মোটেই ভালো নয়। তাদের অভিমত, দেশের অর্থনীতি দ্রুত মন্দাকবলিত হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতি মন্দাকবলিত হওয়ার লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়েছে। রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, বিনিয়োগও হতাশাব্যঞ্জক, কাঁচামালের আমদানি কমে গেছে, বেকারত্ব বাড়ছে। মন্দা নিয়ে বাড়াবাড়ি, লুকোচুরি না করে সরকারকে অনুরোধ করবো দেশের অর্থনীতির মন্দা অবস্থা ধরেই যেন ব্যবস্থা গ্রহণে এখনই উদ্যোগী হয়। মন্দা নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। চীনের মতো মজবুত অর্থনীতিকেও মন্দা গ্রাস করেছে।

বিষয়টি স্বীকার করে মন্দা মোকাবিলার পথে হাঁটলেই হয়তো মন্দা আমাদের দেশকে বিপর্যস্ত করতে পারবে না। যেহেতু আমরা মন্দার ইঙ্গিত পাচ্ছি সুতরাং আমাদের দ্রুত এর মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের রফতানি এখন নিম্নগামী। আমরা যদি রফতানির অভিমুখ ঘুরাতে পারি তবে বিপদ কম হবে। অবশ্য তা মন্দা অবস্থায় খুবই কঠিন ব্যাপার। মনে রাখতে হবে, বিশ্ব যখন মন্দাকবলিত হচ্ছে তখন আমাদের মতো ছোট দেশ, ছোট অর্থনীতির অবস্থা টালমাটাল হবে– যদি আমরা কোনও ভুলভ্রান্তিতে পা বাড়াই।

আমরা চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ৩০৭ কোটি ৩২ লক্ষ ডলার রফতানি খাতে পেয়েছি। তা গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। আর চলতি অর্থবছরের চার মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হিসাবে রফতানি আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ। সার্বিক পরিস্থিতিকে খারাপ বলেছেন রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। বাণিজ্য ঘাটতিও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এ বছরের জুলাই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগস্ট শেষে এটা হয়েছে ১৯৭ কোটি ডলার আর সেপ্টেম্বরে হয়েছে ৩৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও হতাশাব্যঞ্জক চিত্র উঠে এসেছে। কোনও রাজনৈতিক গোলযোগ না থাকার পরেও ২০১৩/১৪ সালের রাজনৈতিক গোলযোগের সময়ের চেয়েও ঋণ প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা আশানুরূপ ঋণ না পাওয়ার কথাই এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে।

এখন ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ভারসাম্য হারাচ্ছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর– এই তিন মাসে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতি থাকলে তা ঋণ নিয়ে পূরণ করতে হয়। আমদানি ব্যয় গত অর্থবছরের চেয়ে এক দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রথম প্রান্তিকে তা ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ ঋণাত্মক হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে প্রথম প্রান্তিকে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ৮ শতাংশ। জ্বালানি তেল আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশ আর শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ২০ শতাংশ। সার্বিক পর্যালোচনায় আমদানি নিম্নমুখী হয়েছে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর হার বৃদ্ধি এবং আমদানি কমার পরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে। আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে থাকে। এখন রিজার্ভ হচ্ছে ৩১ বিলিয়ন ডলার (১৪ নভেম্বর ১৯)। ২২ জুন এটা ছিল ৩৩ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী কিন্তু তাতে অর্থনীতিতে যে মন্দা নেমে এসেছে তা ঠেকানো যাবে না। মন্দা কাটাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে আরও বহু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে হতাশ হলে চলবে না। আমাদের জনসংখ্যার ৭৬ শতাংশের বয়স চল্লিশের নিচে। ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের সংখ্যা হচ্ছে ৫ কোটির ওপরে। শক্তভাবে পরিচালনা করে জনশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। এবং জনশক্তি রফতানির নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে। এই জনশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর করতে হলে তার জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

দুর্ভাগ্য বলতে হবে, সরকার সেদিকে যথাযথ নজর দিচ্ছে না। বাংলাদেশ দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারে না বলে ভারত-শ্রীলংকার শ্রমিকের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকের আয় কম। বাংলাদেশ মূলত জনশক্তি রফতানি করছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও মালয়েশিয়ায়। এই জনশক্তির সিংহভাগ শ্রমিক এবং নিম্ন আয়ের শ্রমিক। প্রবাসী আয়ের সিংহভাগও আসে এই কয়েকটি দেশ থেকে। তবে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে সংকট চলছে। জাপান অধিকহারে বাংলাদেশি চাচ্ছে। নার্সিং করলে আমরা সেই বাজারটি ধরতে পারি।

সরকারি হিসাবে গত দুই বছরের তুলনায় এ বছর জনশক্তি রফতানি কমে গেছে। তবে জনশক্তি কমলেও প্রবাসী আয়ে রেকর্ড করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স ছিল ১৫ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাবে প্রবাসী আয় এরই মাঝে ১৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মোট শ্রমশক্তিতে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অবদান ১২ শতাংশ। ২০১৯ সালের মে মাস শেষে জনশক্তি রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৭৭১ জন। অর্থাৎ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে বলা যায়, চলতি বছর জনশক্তি রফতানির পরিমাণ ৭ লাখের নিচে নেমে আসবে।

তবে শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পোশাক খাত আমাদের রফতানি আয়ের প্রাণ। বিশ্বমন্দার ধাক্কা সামলাতে পোশাক রফতানিকারকরা কতটা প্রস্তুত সেটা দেখতে হবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে তাদের সহায়তায়। নয়তো আমাদের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।

এছাড়াও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে সরকারকে। দুর্নীতি বন্ধ করা যাচ্ছে না। দেশের টাকা বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সরকার সেখানে আরও নজর দিতে হবে। দেশীয় শিল্প উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। যদি শিল্প উৎপাদন না বাড়ে তাহলে তো ভ্যাট বাড়বে না। রাজস্ব আয় হতাশাব্যঞ্জক। আয়কর খাত থেকেও রাজস্ব বাড়ছে না। যে কয়টা মুরগি এনবিআর-এর জালে ধরা আছে তারাই শুধু আয়কর দিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টেক্স দেওয়া টাকার ওপর পুনরায় টেক্স দিচ্ছে এসব নাগরিকরা। আয়কর আদায় আরও আধুনিক করতে হবে। আধুনিক নয় বলেই এটা হচ্ছে। এনবিআর-এর লোকবল বাড়াতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বেড়েছে। যা আয় করলাম তা যদি সরকার চালাতেই চলে যায় জনগণ টেক্সের সুফল পাবে কীভাবে!

বড় বড় ঋণখেলপি ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। আটকে যাচ্ছে মাঝারি এবং ছোট আকারের খেলাপিরা। বাংলা ট্রিবিউনের ২৭ নভেম্বরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিলের মধ্যেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে ব্যাংকগুলোতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। তবে, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরও বেশি। কারণ, অনেক ব্যাংক বড় অঙ্কের ঋণ আদায় করতে পারছে না। আবার ওই ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবেও চিহ্নিত করছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। এর আগে, জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। আর ৯ মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা (অবলোপন ছাড়া)।’

সরকারের উচিত সুযোগ দিতে হলে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠান সচল রাখা এবং বড় বড় খেলাপিদের ধরা। তারা বেশিরভাগই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। টাকা পাচারে জড়িত।

সবশেষে বলবো, শস্য পরিমাণ অবহেলায় জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতি যেমন শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করে, মন্দা মোকাবিলায়ও জাতিকে কঠিন প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হতে হবে। যেন কোনোভাবে বিপর্যস্ত অবস্থা সৃষ্টি না হয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ