ধর্মনিরপেক্ষতা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

Send
ফারজানা মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৬:৩৩, নভেম্বর ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৭, নভেম্বর ২৯, ২০১৯

ফারজানা মাহমুদবাংলাদেশ বহু ধর্মের দেশ। এখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ দশমিক ৫ শতাংশ মুসলমান, ৮ দশমিক ৫ শতাংশ হিন্দু, শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বৌদ্ধ, শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ খ্রিষ্টান এবং ০১ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। বাংলাদেশের সংবিধান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে। এছাড়া এটি ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে, যা কোনও ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণকে সমর্থন করে না। উপরন্তু স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করে।
ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন ও সহিংসতার তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার এবং পাকিস্তান সরকারের সময়ে। এই অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় সংবিধানপ্রণেতারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার রোধে ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে একটি মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে অক্টোবর গণপরিষদ বিতর্কে বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক সরকারগুলো রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বৈধতা পাওয়ার জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন আনে, যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দেয়া, বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সূচনা ইত্যাদি। অগণতান্ত্রিক সামরিক সরকার তাদের বৈধতা ও একনায়কতন্ত্র বজায় রাখার জন্য জনগণকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে প্রচারণা চালায় এই বলে যে, বাঙালিদের জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ধর্ম।

অনুচ্ছেদ যা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন দেয় না, সেই অনুচ্ছেদকে সংবিধান থেকে মুছে ফেলা যায়। ফলে জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রায় ৪০টি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পায়।

২০০৫ সালে হাইকোর্ট ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত গৃহীত সব সামরিক আইনকে বাতিল ঘোষণা করেন। অবশেষে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট নীতিগুলোকে সংবিধানে পুনরায় সংযোজন করেন।

পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ভাবা হয় কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতা হলো সব ধর্মের সমান অধিকার।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা বা রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ পৃথক করে দেওয়া বোঝায় না, বরং রাষ্ট্রের প্রদত্ত সুবিধায় সব ধর্মের সমান অধিকার ও অংশগ্রহণকে বোঝায়। সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বলার পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও সমান স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যাতে বোঝা যায় রাষ্ট্র ইসলামসহ সব ধর্ম পালনে সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। তবে, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতি সংবিধানের এক ধরনের সৌজন্য বা আলঙ্কারিক স্বীকৃতি বলা যেতে পারে।

ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি যা সংবিধানের ৮(১) অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত হয়েছে। এটির ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করে ও সংবিধান বা আইনের ব্যাখ্যা দেয় এবং এটি রাষ্ট্র ও জনগণের সব কাজের মূল ভিত্তি। সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়েছে, যার ভিত্তি ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, যা ছিল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনা। ৯নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে একটি শোষণমুক্ত ন্যায়ানুগ সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে।

উপরন্তু ১২নং অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য বা নিপীড়ন ও ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদার সুযোগ বিলোপ করার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের স্বাধীনভাবে যেকোনও ধর্ম প্রচার ও পালনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের কতিপয় অনুচ্ছেদে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার এবং সমান মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। ২৭-২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার ভোগ করবে। রাষ্ট্রধর্মের ভিত্তিতে কোনও নাগরিকের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না। সুতরাং যেকোনও হিন্দু বা বৌদ্ধ বাংলাদেশি নাগরিকের বৈষম্যহীনভাবে ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার আছে। সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার সংবিধানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে বিধায় এ দেশে হিন্দু-মুসলমান সবাই রাষ্ট্রের চোখে সমান। সংবিধানের এই স্বীকৃতি দেশের বিদ্যমান আইন ও রাষ্ট্রের নীতিমালাতেও প্রতিফলিত হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯৬০-এ হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাঙচুর ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে বা ধর্মীয় সমাবেশে শান্তি বিঘ্ন করে এমন কর্মকাণ্ডকে পরিষ্কারভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

বাংলাদেশে একটি মানবাধিকার কমিশন রয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন বা যেকোনও নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে সরকারকে জানতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারকে তাদের অভিমত জানাতে পারে। এছাড়া, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে সব ধর্মীয় সম্প্রদায় ও মানুষের অধিকার রক্ষায় ও কল্যাণে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের জন্য পৃথক ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট রয়েছে।

ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার্থে ধর্মনিরপেক্ষতার বিকল্প নেই। সংবিধান ও বিদ্যমান আইনে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হয় নানা কারণে। যেমন—সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ধর্মনিরপেক্ষতার পথে অন্তরায়। সাম্প্রদায়িক আচরণ ও মনোভাব এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। আমাদের সংবিধানে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলের কথা বলা হয়েছে কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কী তার কোনও ব্যাখ্যা কোথাও নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে জামায়াত-বিএনপির মতো রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এখনও প্রশ্নবিদ্ধ থাকা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধে ও তাদের শতভাগ অধিকার নিশ্চিতে সর্বস্তরে ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। কিন্তু এই ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা বাস্তবে কেন আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে দেখতে পাচ্ছি না, কেন অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরিবেশের বিকাশ ঘটছে না, তা পর্যালোচনা করা বিশেষ জরুরি। কারণ, একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প রুখে দিতে পারে এবং সর্বস্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অর্জনে সফল হতে পারে।

লেখক: আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ; প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ মানবাধিকার ও পরিবেশ আন্দোলন।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ