বিএনপির আসল পরিকল্পনা কী?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:৫০, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫১, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারবিজয়ের মাস ডিসেম্বর শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাদের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল ১৬ ডিসেম্বর। ২৫ মার্চ রাত থেকে যে গণহত্যা শুরু হয়েছিল, সেটা চলেছিল চূড়ান্ত বিজয়ের আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত। তিরিশ লাখ মানুষের জীবন, দুই লক্ষাধিক নারীর সম্ভ্রম এবং কোটি কোটি মানুষের চরম দুঃখ-দুর্ভোগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম আমাদের স্বাধীনতা, বিজয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করার অপার আনন্দে আমরা মাতোয়ারা হয়েছিলাম এই ডিসেম্বর মাসে। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা দুঃসময় বা দুর্দিন দূর করার জন্য বারবার সংগ্রাম করি, বিজয় অর্জন করি, কিন্তু অর্জিত বিজয় ধরে রাখতে পারি না। লড়াই-সংগ্রামের আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা। অনেক সাফল্যের কাহিনী আমরা তৈরি করেছি। আমরা জানি, আমাদের কোনও অতীত সংগ্রামেই ততোক্ষণ সাফল্য আসেনি, যতোক্ষণ ঐক্যবদ্ধ না হয়েছি। একা একা লড়া যায় হয়তো, কিন্তু বিজয় ছিনিয়ে আনা যায় না। একা মানুষের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ মানুষ সব সময়ই শক্তিশালী। বহুল প্রচলিত একটি বাক্য হলো—দশের লাঠি, একের বোঝা। একা যে ভার বহন করা যায় না, সমবেতভাবে তা সহজেই বয়ে নেওয়া যায়।
আমরা যেসব বড় সংগ্রাম করেছি, যেসব সংগ্রামে আমরা কালজয়ী ইতিহাস তৈরি করেছি, তার কোনোটিই একক মানুষের চেষ্টায় হয়নি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুই আমাদের বৃহত্তর ঐক্য এ সফলতার কাহিনী। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও আমাদের বড় সাফল্য এরশাদ পতনের আন্দোলন। সেখানেও আমরা একা ছিলাম না। সব রাজনৈতিক দল-মতের মানুষের বৃহত্তর ঐক্যই ছিল আমাদের বিজয়-সূত্র। তাই এটা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, আমরা যখনই এক হয়েছি, একতাবদ্ধ হয়েছি, তখনই বিজয় হাতের মুঠোয় এনেছি। বিজয়ের পর আমরা একা হয়েছি, বিচ্ছিন্ন হয়েছি, অর্জিত বিজয় আমাদের হাতছাড়া হয়েছে, ছিনতাই হয়েছে।

প্রত্যেক আন্দোলনেই শত্রুমিত্র থাকে। মিত্রকে সঙ্গে নিয়েই শত্রুকে পরাভূত করতে হয়। তবে শত্রুকে সব সময় চিহ্নিত করা সহজ হয় না। ছদ্মবেশী শত্রুও থাকে। আমরা জাতিগতভাবেই বুঝি কিছুটা বিস্মৃতিপরায়ণ। তাই কখনও কখনও চিহ্নিত শত্রুকেও আমরা ভুলে যাই অথবা তাদের ছলনায় ভুলি। সাফল্য লাভ করা এবং সাফল্য ধরে রাখার জন্য সঠিকভাবে শত্রুমিত্র চেনা খুব জরুরি।
আমাদের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধেও শত্রুমিত্র ছিল। সেটা দেশের ভেতরে যেমন ছিল, তেমনি দেশের বাইরেও ছিল। আমরা শত্রুদের প্রতি অতি বেশি উদারতা-নমনীয়তা দেখিয়েছি। শত্রুরা আমাদের দুর্বলতা-বিভেদ-অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছে। সংগঠিত হয়েছে। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে আঘাত হেনেছে, অস্ত্র শানিয়েছে।

প্রতিটি ডিসেম্বর আমাদের সামনে একরকম আনন্দ বার্তা নিয়ে হাজির হয় না। কোনও কোনও ডিসেম্বর আমাদের রক্তে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেও কোনও কোনও ডিসেম্বর আসে বেদনার সুর শুনিয়ে। গত বছর বিজয়ের মাস শুরু হয়েছিল একটি দুঃসংবাদ দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সেনানি তারামন বিবি গত বছর ১ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কাচারিপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বীরকন্যা কয়েক বছর থেকেই শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। একাত্তরে সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া এই যোদ্ধার মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করেছিল এজন্য যে, বীরপ্রতীক খেতাব পাওয়া এই তারামন বিবির জীবনের মূল্যবান সময় কেটেছে অবহেলায়, অসম্মানে। তারামন বিবি চলে গেছেন, রেখে গেছেন রক্তমূল্যে কেনা বাংলাদেশ। একাত্তরে সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া সব মুক্তিযোদ্ধাই একদিন চলে যাবেন,  কিন্তু থাকবে বাংলাদেশ।

প্রশ্ন হলো, এই বাংলাদেশ একাত্তরের ধারায় চলবে, নাকি পাকিস্তানি ধারায় চলবে? স্বাভাবিকভাবে এটাই হওয়ার কথা, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানি ধারায় ফিরবে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীন বাংলাদেশেও এই প্রশ্নে বিতর্ক চলে এবং দেশকে ওই বাতিল ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার পক্ষেও একদল মানুষ অপচেষ্টা চালায়। গত বছর ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল একদিকে আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্র দলগুলো। অন্যদিকে বিএনপি এবং তার মিত্রশক্তি। বিএনপির মিত্র তালিকায় ছিল (এখনও আছে) মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতকে ধানের শীষ মার্কা দিয়ে আত্তীকরণ করে নিয়েছিল বিএনপি। শুধু তাই নয়, বিএনপির মনোনয়ন তালিকায় ঠাঁই পেয়েছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের সন্তান-স্বজনরা। ‘এরা তো কোনও অপরাধ করেনি’—এমন কথা বলে যারা বিষয়টিকে হালকা করে দেখেন, তারা কার্যত মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের প্রতি অবজ্ঞা দেখান। ঘাতক-দালালদের সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত, তারা তাদের পূর্বসূরিরা যে জাতিবিরোধী ভূমিকা পালন করে ভুল করেছিলেন, তাদের বিচার ও শাস্তি দেওয়া যে যথার্থ হয়েছে, এমন কথা কি কখনও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন? তারা কি দেশবাসীর কাছে মার্জনা ভিক্ষা করেছেন, নাকি তাদের পূর্বসূরিদের অবস্থানেরই সাফাই গেয়েছেন?

৩০ ডিসেম্বরের ভোট বাহ্যত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হলেও এটা ছিল আসলে একাত্তরের বিজয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি লড়াই। বাঙালির বিজয়ের লড়াইয়ে একাত্তরে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ। এখন নতুন যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এবং আজকের আওয়ামী লীগ এক নয় বলে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান, তারা বাস্তবে ওই শক্তিকেই সহায়তা করেন যারা আওয়ামী লীগকে দুর্বল দেখতে চান। একাত্তরে বিজয়ের জন্য পুরো জাতির ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য ছিল, এখনও সেই ঐক্যের বিকল্প নেই। কিছু সংশয়, দ্বিধা এবং বিভ্রান্তি থাকলেও দেশের মানুষ একাত্তরের প্রশ্নে এখনও আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকতে চায়। বিএনপি কখনও মুক্তিযুদ্ধের নির্ভরযোগ্য মিত্র ছিল না কিংবা হয়ে উঠতে পারেনি।

এবার ডিসেম্বরে লক্ষ করা যাচ্ছে বিএনপির পক্ষ থেকে রাজনীতির মাঠ তাতিয়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। কেউ সরকার পতনের ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, কেউবা দেখছেন রাজপথে জনজোয়ার। বিএনপি গত কিছুদিন সরকারের অবাধ্য হয়নি। সরকারের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের শক্তি-সামর্থ্যও বিএনপির নেই বলেও অনেকে মনে করেন। বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। নেতারা আন্দোলন প্রশ্নে বিভক্ত। তারেক রহমান লন্ডন থেকে যেভাবে স্কাইপে দল চালাচ্ছেন, সেটাও অনেকের পছন্দ না। এই অবস্থায় এই বিজয়ের মাসে বিএনপির আন্দোলন-পরিকল্পনা রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিএনপি কি কোথাও থেকে কোনও ‘সিগন্যাল’ পেয়েছে? রাজনৈতিক আবহাওয়া বিএনপির অনুকূলে যাওয়ার কোনও পূর্বাভাস কি কোনও রাজনৈতিক জ্যোতিষী দিয়েছেন?
তবে এক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু বিএনপির জন্য একেবারেই উৎসাহজনক নয়। খালেদা জিয়া নিজে নেতৃত্ব দিয়েও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একটিও সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। এখন তিনি কারাগারে। তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নেমে বিএনপি সফল হবে, সেটা কষ্ট-কল্পনার মতোই মনে হয়। কিছু কিছু ঘটনা থেকে কারও কারও মনে হতে পারে, সরকারের নিয়ন্ত্রণ বুঝি শিথিল হয়ে পড়েছে। পেঁয়াজের দামের অস্বাভাবিকতা সরকারকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে, এটা ঠিক। তবে পেঁয়াজ-রাজনীতি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবে, এত বড় দুরাশা নিশ্চয়ই উন্মাদ ছাড়া কেউ পোষণ করেন না। ৫ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানির দিন ধার্য আছে। বিএনপি বলছে, সরকারি হস্তক্ষেপে খালেদা জিয়ার মুক্তি হচ্ছে না। আবার সরকার বলছে, আদালত খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিলে তারা বাধা দেবে না। এই টানাটানির মধ্যে কী সিদ্ধান্ত আদালত দেবেন, তা বলা যাচ্ছে না। তবে আদালত খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সম্পর্কে সর্বশেষ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষকে। আদালতের নির্দেশের ওপর নাকি নির্ভর করছে বিএনপির আন্দোলন-সিদ্ধান্ত। খালেদা মুক্তি পেলে নো আন্দোলন। মুক্তি না পেলে আন্দোলন। আন্দোলন মানে কি গাড়ি ভাঙচুর, সহিংসতা? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কিন্তু কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা দমনে সরকার নমনীয়তা দেখাবে না। বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর সময় সম্ভবত এখনও হয়নি। তাছাড়া ঘুরে দাঁড়াতে হলে বিএনপিকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। মানুষের কাছে পরিষ্কার হতে হবে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান। এক জায়গায় লেফট-রাইট করে মানুষকে পক্ষে পেতে চাইলে তা হবে না।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে কোন পক্ষ কোন বিজয় পায়, দেখার বিষয় সেটাই। বিএনপি দলগত এবং জোটগতভাবে একাট্টা আছে তো, বা থাকতে পারবে তো? সরকারের ক্ষমতাকেন্দ্র এবং জোট-মহাজোটে কোনও ফাটল নেই তো?

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ