এন্ড্রু কিশোর, শিল্পী ও শিল্পের অধিকার

Send
ফয়েজ রেজা
প্রকাশিত : ১৭:১৬, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৭, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

ফয়েজ রেজাএন্ড্রু কিশোরের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অর্থ-সহযোগিতা নেওয়া না নেওয়া প্রসঙ্গে তর্কযুদ্ধ হয়ে গেছে কিছুদিন আগে। একজন শিল্পী সারাজীবন সেধেছেন গলা। সারাজীবন রেওয়াজ করেছেন কণ্ঠের। সারাজীবন মানুষের মনের খোরাক দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। নিজের কষ্ট দিয়ে কোটি মানুষের কষ্ট ভোলানোর চেষ্টা করেছেন। এ কাজে সফলতার স্বাক্ষরও রেখেছেন! জীবনসায়াহ্নে রাষ্ট্রের অর্থভাণ্ডারে যদি সে শিল্পীর অধিকার না থাকে, তবে অধিকার থাকবে কার? এন্ড্রু কিশোরের গান শুনে যারা বড় হয়েছেন, এন্ড্রু কিশোরের গান শুনে যারা নিজের অতীত ভুলে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছেন, তাদের অনেকেই  এখন বিত্তশালী, অস্বাভাবিক অর্থের মালিক!
এন্ড্রু কিশোরের গান যখন ঢেউ তুলতো গ্রামে-গঞ্জে, তখন যারা গ্রামে ছিলেন, এখন তারা শহরে। এখন তাদের অনেকে বিপুল সম্পদের অধিকারী। শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের সোনালি সময়ের পর যারা জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন, তাদের অনেকেই তো পরে বিত্তবৈভবের প্রাচীর গড়ে তুলেছেন দেশে-বিদেশে।

মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়ে যারা চাকরি করেছেন শেষ জীবনের সুরক্ষার জন্য, অবসর ভাতা তো তারা গ্রহণ করেন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে! সেই অর্থ যদি জনগণের প্রদত্ত করের অর্থ হয়, তাহলে সেই মানুষকে বিনোদন দিয়ে যিনি সারাজীবন কাটিয়েছেন, তিনি কেন বঞ্চিত হবেন চিকিৎসাসেবা থেকে? এটি শুধু শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের জন্য নয়, এ ব্যবস্থা থাকা দরকার রাষ্ট্রের সব শিল্পীর জন্যও।

অবকাঠামোর উন্নয়ন করে প্রাণহীন একটি রাষ্ট্র উপহার দেওয়া যায়। প্রাণে স্পন্দন জাগানোর জন্য দরকার শিল্পীদের। একজন কুদ্দুস বয়াতি তৈরি করতে পারবে না শত শত বিশ্ববিদ্যালয়। এটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজও নয়। প্রাকৃতিকভাবে কুদ্দুস বয়াতিরা বেড়ে ওঠেন, বেড়ে উঠবেন। ‍কুদ্দুস বয়াতিদের পরিচর্যা করতে পারে সরকার। পরিচর্যা করা জরুরি। কাঙালিনী সুফিয়ারা অট্টালিকায় বেমানান, কুঁড়েঘরে তাদের থাকার বন্দোবস্ত করা তো উচিত। রোগে ভুগে আর কত কণ্ঠের অপচয় দেখবো আমরা, আর কত কবির অপমৃত্যু দেখব।  অভিনেতা আহমদ শরীফ, আমজাদ হোসেন, প্রবীর মিত্র, কাজী হায়াত, চিত্রতারকা নতুন, রেহানা জলি, অভিনেত্রী দিতি, আনোয়ারা, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার আমাদের বাংলা সংস্কৃতিতে যে অবদান রেখেছেন, তা কে অস্বীকার করতে পারবে? তারা যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সহযোগিতা পান, তাতে আপত্তি কেন? যৌবনে তারা কাড়ি কাড়ি টাকা আয় করেছেন। টাকা জমাতে পারেননি, খরচও করেছেন। আসলে কি এত টাকা তারা আয় করেছেন, যা দিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো সম্ভব? চিকিৎসা খরচ মেটানো সম্ভব! যৌবন কাল তো তারা দিয়েছেন মানুষের বিনোদনের চাহিদা মেটানোর পেছনে। এ যৌবনকাল যদি তারা ব্যয় করতেন টাকার পেছনে, তাহলে কত টাকার মালিক হতে পারতেন তারা? তাদের কালের মানুষেরা এখন কত টাকার মালিক! তুলনা করে দেখুন।  

বাড়ির বাইরে, কাঁচা মাটির আল দিয়ে সবেমাত্র যখন হাঁটতে শিখেছি, কাঁচা ধান ক্ষেতে পোকা দেখলে যখন ধরতে চাই, ধরতে যাই, ফড়িং ধরতে গিয়ে কখনও সখনও উল্টে পড়ি কাদায়, আবার উঠে ছুটে যাই, কিছু গান তখন খোলা প্রান্তরে উড়ে বেড়াতো। বাতাসে ভেসে আসতো আমাদের কানে। কেউ হয়তো এক গ্রাম থেকে যাচ্ছে অন্য গ্রামে। কোমরে বাঁধা ট্রানজিস্টার থেকে শোনা যেতো—‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি/ও ও  ও ও/এই চোখ দুটো মাটি খেয়ো না/ আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ/ মিটবে না গো মিটবে না।’ গ্রামে কবরের পাশ দিয়ে কখনো যদি একা একা হেঁটে যেতাম, কানে শোনা গানটি মনের মধ্যে ঘোরপাক খেতো—‘আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি, এই চোখ দুটো মাটি খেয়ো না’। কেউ হয়তো গাঙে নৌকা বাইছে। নৌকা থেকে ভেসে আসছে একটি গান—‘তোমায় নিয়ে নাও ভাসিয়ে যাবো তেপান্তর, ভালোবাসার ঘর বানিয়ে হব দেশান্তর’। হাটে, মাঠে, ঘাটে, যেখানে যেতাম, কোনও না কোনও একটি গান কানে ভেসে আসতো। কখনো ট্রানজিস্টার থেকে, কখনও মাঝির কণ্ঠ থেকে, চাষির কণ্ঠ থেকে। কখনও দূরের গ্রাম থেকে মাইকে ভেসে আসতো—‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, সেদিন থেকে গানই জীবন গানই আমার প্রাণ।’ এগুলো যে গান, এগুলো যে সুর করে গাইতে হয়, গানের পেছনে যে মিউজিক বসাতে হয়, এসব কিছু বোঝার আগেই গানের কথাগুলো সুরসহ আমাদের কানে ঢুকে পড়েছিল। শহুরে সভ্যতার (?) সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর ‍বুঝতে পেরেছিলাম, এসব গানের বাইরেও আছে গানের অন্য একটি জগৎ। তারও বহু পরে জেনেছি—আমার ছোটবেলায় মাঠে প্রান্তরে যেসব গান উড়ে বেড়াতো ধুলার মতো, যেসব গান আমাদের কানে ঢেউ খেলতো বাতাসের মতো, সেসব গানের বেশিরভাগই গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর। অনেক গানের শিল্পী রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, কনকচাঁপা, সৈয়দ আব্দুল হাদী। আরও বেশ কয়েকজন শিল্পীর নাম জেনেছি পরে। জীবন কী, মৃত্যু কী, প্রেম, ভালোবাসা কী—এসব  বোঝার আগেই আমাদের কানে এসেছিল ‘আমি চিরকাল, প্রেমেরও কাঙাল’, ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া/ অন্তরে তুষেরই আগুন জ্বলে রইয়া, রইয়া’।

এগুলো সে সময়ের গান, যে সময় বাংলাদেশের নদীতে নতুন জোয়ার আসতো, আর সে জোয়ারের ঢেউ এসে লাগতো মানুষের মনে, কণ্ঠে, বাঁশিতে। যে সময় বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ছিল গরিব, দিনে একবেলা, বড়জোর দুই বেলা খেতো। তারা গ্রামে বাস করতো। কিছু কিছু মানুষ অন্ন-বস্ত্রের ভালো জোগান পেতে শহরের দিকে ছিল ধাবমান। যে সময় গ্রাম থেকে শহরে আসতে হতো, নৌকা, রিকশা, ট্রেন ও লঞ্চে চড়ে। একক কোনও বাহনে আসার সুযোগ ছিল না। সে সময় মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল বাংলাদেশ বেতার ও বাংলা সিনেমা। রাতের অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে কান পেতে মানুষ শুনতো বাংলা গান। সিনেমা হলের অন্ধকারে স্তব্ধ হয়ে মানুষ দেখতো বাংলা সিনেমা। সিনেমা মুক্তির আগেই সিনেমার গানগুলো মানুষের কান ও মন জয় করে নিতো। গ্রামোফোন কোম্পানির দৌলতে সিনেমার বাইরেও গানের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়ে যেতো। যার মাধ্যমে বাংলা সিনেমাও জনপ্রিয় হয়ে যেতো মূলত গানের মাধ্যমে।  সিনেমা ও গানে ছিল লোকজ জীবন ও সংস্কৃতির উপস্থিতি। সিনেমা মুক্তির আগেই মানুষ সিনেমার গান শুনে প্রেম যমুনায় সাঁতার দিতো। সে সময় গ্রামের মানুষ ভিসিআর ভাড়া করে সারারাত জেগে উঠানে পাটি বিছিয়ে বসে দেখতো বাংলা সিনেমা, শুনতো গান। এক গ্রামে ভিসিআর ভাড়া করে আনলে সে খবর জানতো অন্যপাড়ার মানুষ। তারাও ছুটে আসতো সিনেমা দেখতে। পরের সপ্তাহে দেখা যেতো, সে পাড়ায়ও বসেছে সিনেমা দেখার আসর। সিনেমাগুলো ছিল কষ্টের। সিনেমার গানগুলো যেন গাওয়া হতো কষ্ট আরেকটু বাড়ানোর জন্য। সিনেমায় নায়কেরা শুধু ভালোবেসে যেতো নায়িকাদের, আর নায়িকার বিয়ে ঠিক হতো অন্য কারও সঙ্গে। নায়কেরা গান গাইতো—‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’। নায়িকাদের দেখা যেতো গানের সুরে কান্নারত। সময় ও সমাজের প্রতিচ্ছবি যে প্রকাশ পেতো সিনেমা ও গানে, সে কথা আশা করি স্বীকার করবেন আমার সময়ে যারা বেড়ে উঠেছেন, তারা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন আর গরিব না। বেশিরভাগ মানুষ শহরে বাস করে। গ্রামে বাস করে কম মানুষ। গ্রামগুলো শহরের চেহারা পেয়েছে, পাচ্ছে। নামি-দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি হাঁকিয়ে রাস্তায় জ্যাম বাঁধিয়ে রাখেন সচেতন নাগরিক সমাজ! একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য পাওয়া যায় দুই কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ। প্রায় অর্ধ শত কোটি টাকা খরচ করে এই শহরে গড়ে উঠেছে ৩৪টি স্যাটেলাইট চ্যানেল। যে শিল্পী দিনের পর দিন রাতের পর রাত গলা সেধে, সাধনা করতে করতে গলা থেকে রক্ত বের করে মানুষকে উপহার দিয়েছেন একের পর এক বাংলা গান, জয় করেছেন মানুষের হৃদয়, সেই শিল্পী ও শিল্পীর কণ্ঠ সুরক্ষার জন্য কী উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্র? একটি পণ্যের প্রচারের জন্যে শিল্পী খোঁজার নামে কোটি কোটি টাকা শ্রাদ্ধ করার সামর্থ্য হয়েছে দেশের। একজন এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠ সুরক্ষার জন্য কতটাকা খরচ করেছে আমাদের ব্যবসায়ী সমাজ।

এন্ড্রু কিশোর সারাদেশে যখন সুরের জাল বিস্তার করেছিলেন, তখন আট আনায় পাওয়া যেতো একটি চকলেট। এন্ড্রু কিশোরের এক-একটি গান যদি একটি করে চকোলেটের দামে কিনে শুনতে হতো, তাহলে কত শত কোটি টাকার মালিক থাকতেন শিল্পী এন্ড্রু কিশোর? ওই সময় সারাদেশে জনসংখ্যা ছিল আট কোটি, এখন ষোল কোটি জীবিত। এর মধ্যে যারা বিগত হয়েছেন, তাদের সংখ্যা ধরে যদি হিসাব করেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী হওয়ার কথা এন্ড্রু কিশোরের, এন্ড্রু কিশোরের মতো শিল্পীদের। পৃথিবীতে বিনা পয়সায় একটি চকোলেটও পাওয়া যায় না আর শিল্পীরা কত মূল্যহীন, তাদের গান শুনতে পয়সাও লাগে না। শিল্পীদের কী খেতে হয় না, ঘুমানোর জন্য দরকার হয় না ঘরের? তাদের সন্তান নিতে হয় না, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ দিতে হয় না, চিন্তা করতে হয় না সন্তানের ভবিষ্যতের?

সরকার প্রতি বছর শিল্পীদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় পুরস্কার দেয়, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক দেয়। অনেক সময়ই প্রকৃত শিল্পীরা থাকেন এসব পুরস্কার থেকে দূরে, আড়ালে, নিভৃতে। পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষার জন্যে কালেভদ্রে তাদের সম্মানে যুক্ত হয় পুরস্কার। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, জাতীয় পুরস্কারের অর্থমূল্য যদি এমন করা হয়, যা দিয়ে শিল্পী ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য স্থায়ী বন্দোবস্ত করা যায়, তাহলে কি খুব বেশি ঘাটতি হবে দেশের বাজেটে? প্রতিবছর অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য যদি খরচ করা যায় শত শত কোটি টাকা, পঞ্চাশ কোটি টাকা খরচ করে যদি প্রতি বছর পঞ্চাশ জন শিল্পীকে স্বাবলম্বী করা হয়, তা কি খুব বেশি অপচয় হয়ে যাবে রাজস্ব বাজেটের? যদি না হয়, তাহলে এ উদ্যোগটি নেওয়া দরকার এবছর থেকে। এ অর্থমূল্য যেন এন্ড্রু কিশোরের মতো প্রকৃত শিল্পীদের ঘরে যায়, সে ব্যবস্থাও করা দরকার। 

দুস্থভাতা কেন নেবেন শিল্পীরা? শিল্পীদের মধ্যে যারা দুস্থ (প্রতিভার দিক থেকে) তাদের ‍দুস্থভাতা দিতে চান তো, দিতে পারেন। প্রকৃত শিল্পীদের দেওয়া উচিত মূলত সম্মান।

লেখক: ছড়াকার ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

 

    

    

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ