ভারতের নাগরিকত্ব বিল

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৩৫, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৯, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীনরেন্দ্র মোদি নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার দেশটাকে নিজেই অশান্ত করে তোলার মাঝে কী লাভ দেখছেন—কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মাথায় তা আসবে না। গত ৫ আগস্ট থেকে কাশ্মিরের ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে কাশ্মিরিদের কাছে নরকে পরিণত করেছেন তিনি। সেখানে তিনি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে চলছেন। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, অবাধে চলাচল করা এবং ধর্ম পালন করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন কাশ্মিরিরা। এখনও কাশ্মিরের শ্রীনগরের ঐতিহাসিক জামে মসজিদ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
সাত লক্ষ সেনা মোতায়েন করে কাশ্মিরিদের ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। ইন্টারনেটসহ সব যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কেউ একতরফা এমন অনাচার চালাতে পারেন না। এর মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ অনাচার বন্ধ করা, বন্দি নেতাদের মুক্তি দান, ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।
কাশ্মির পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আগেই আবার গত সোমবার (৯ ডিসেম্বর) ২০১৯ মধ্যরাতে ভারতের লোকসভায় বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বিপুল ভোটে পাস করিয়ে নিয়েছে বিজেপি। তাতে দেশে বিদেশে এই বিলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার কাছে বিলটি ‘মুসলিমবিরোধী’ আখ্যা পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত কমিশন এই আইনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছে, ধর্মীয় মানদণ্ডে বিচার করলে এই বিল উদ্বেগজনক এবং রাজ্যসভায় এই বিল পাস হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত মার্কিন সরকারের।

প্রস্তাবিত আইন অনুসারে ধর্মীয় নিপীড়নের সম্মুখীন হয়ে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী যারা ভারতে গিয়েছেন, তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করা হবে না এবং ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু বিলটিতে মুসলিমদের কোনও উল্লেখ নেই।

রাষ্ট্র হোক ব্যক্তি হোক, কেউই নিয়ম-শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে নন। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে এখন বিশ্ব আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন অং সান সু চি। মধ্য ইউরোপেও গণহত্যার বিচার হয়েছে। পাকিস্তান বা অন্য কোনও রাষ্ট্র যদি এখন নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে কাশ্মিরে গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়, তাহলে তো ভারতের ইজ্জত সারা বিশ্বে ভূলুণ্ঠিত হবে।

নয় ডিসেম্বর অমিত সাহা লোকসভায় যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এনেছেন সেটি এখন রাজ্যসভায় পাস হলে আইনে পরিণত হবে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপি প্রধান অমিত শাহ লোকসভায় বিলটি পেশ করতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেছেন। আবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে বলেছেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হিন্দুরা নাকি নির্যাতিত হচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা আর একইসঙ্গে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা মানে মাথাকে লাথি মেরে মাথার টুপিকে সালাম দেওয়ার অবস্থা।

অমিত শাহ বলেছেন, বাংলাদেশে আগে নাকি ২২ পার্সেন্ট হিন্দু ছিল, যা এখন ৭.৮ শতাংশে এসে উপস্থিত হয়েছে। বাংলাদেশে আহমেদাবাদের দাঙ্গার মতো কোনও দাঙ্গা বা গুজরাট দাঙ্গার মতো কোনও দাঙ্গা কখনও হয়নি, যার কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। ভারত বিভক্তির সময় ২২ শতাংশ হিন্দু বাংলাদেশে ছিল সে কথা সত্য, তবে অত্যাচারিত হয়ে কেউ দেশ ত্যাগ করেছেন এমন ঘটনা বিরল। কোনও প্রমাণও নেই।

সব দেশেই সাধারণত সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ভারত বিভক্তির পর উচ্চবিত্তের হিন্দুরা অনেকে মনের আনন্দে দেশত্যাগ করেছেন, আর অনুরূপ মুসলমানরা পাকিস্তান বা বাংলাদেশ অংশে এসেছেন। মধ্যবিত্ত কিছু হিন্দুও দেশ ত্যাগ করেছেন। দেশ বিভক্তির পর ১৯৫৬-৫৭ সাল পর্যন্ত প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ স্বাভাবিক নিয়মে চলেছিল। তখন লক্ষ লক্ষ হিন্দু প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ করে ভারতে চলে গেছে ভারত থেকে মুসলমানরা পাকিস্তানে এসেছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা অনুপাতে কমে গেছে। কোনোভাবেই তা অত্যাচারের কারণে দেশত্যাগ করায় কমে গেছে বলা যাবে না।

অমিত শাহ বিল উত্থাপনের সময় অত্যাচারের যে কাহিনি বলেছেন তা কল্পকাহিনী। তিনি বাংলাদেশকে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের কাতারে ফেলে ইসলামি রাষ্ট্র বলার মধ্যে তার অজ্ঞতা ধরা পড়ে। বরং এখন আমরা বলবো, অমিত শাহ যে নাগরিকত্ব বিল পেশ করেছেন তাতে বাংলাদেশের হিন্দুরা দেশত্যাগে উৎসাহিত হবেন। এখন বাংলাদেশে যেসব হিন্দু বসবাস করেন তারা ৮০ পার্সেন্ট নিম্ন-মধ্যবিত্ত। বাস্তুভিটা ত্যাগ করে কোনও নতুন জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপনের মতো তাদের আর্থিক সঙ্গতি নেই। যদি আর্থিক সঙ্গতি থাকতো তবে আরও বহু লোক দেশ ত্যাগ করতো।

এ ধরনের সংখ্যালঘুরা ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিতে পারে আশঙ্কা করেই সেখানে এখন আন্দোলন তীব্র হয়েছে এই বিলের বিরুদ্ধে। আরেকটা বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। বাংলাদেশের যেসব হিন্দু বাস্তু ত্যাগ করে ভারতে গিয়েছে সেখানে তারা নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য কোনও চাকরি-বাকরি তারা পায়নি। এদের ৮০% লোক কলকাতা শহরে হকারি করে বা নিম্ন আয়ের পেশায় আছে। খোদ ভারতের ভূমিপুত্ররা যেখানে বিএ, এমএ পাস করার পরও কোনও চাকরির ব্যবস্থা হয় না সেখানে বাংলাদেশ থেকে গিয়ে কী করবে! ভারত বিভক্তির পর নির্বিচারে কিছু লোক গিয়েছিল সত্য। ভারত সরকার তাদের বসতির ব্যবস্থা করেছে দণ্ডকারণ্যে। আর দণ্ডকারণ্য মানে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ তাদের পছন্দ হয়নি।

অমিত শাহ যে নাগরিক সংশোধনী বিল এনেছেন সেটি একটি মুসলিমবিরোধী আইন বলে ভারতের বুদ্ধিজীবী সমাজ, বিবেকবান মানুষরাও প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। লোকসভায় বিরোধী নেতা অধীর চৌধুরী বলেছেন, এই সংশোধনী শাসনতন্ত্রের পরিপন্থী। শিবসেনার মতো দলও বলছে, এই আইন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দেয়াল সৃষ্টি করবে। শিবসেনা আরও বলেছে, অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দিয়ে মোদি সরকার ধর্মযুদ্ধের ইন্ধন দিচ্ছে। ত্রিপুরায় নাগরিক বিরুদ্ধে গঠিত জয়েন্ট মুভমেন্ট নামক একটি সংগঠন এই বিলের বিরুদ্ধে লাগাতার হরতাল ডাকার কথা বলেছে। এক লক্ষ তামিল শ্রীলঙ্কা থেকে উচ্ছেদ হয়ে ভারত এসেছে। আজ ৩০ বছর ধরে তাদের উড়িষ্যার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তারা নাগরিকত্বহীন অথচ তাদের নাগরিকত্ব সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি।

পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে অশান্তি দাবানলের মতো জ্বলে উঠছে। বিলটি লোকসভায় পাসের পর দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ-প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। আসাম ও ত্রিপুরায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে শেষ পর্যন্ত সেনা নামানো হয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। ৪৮ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছে রাজ্য সরকার। আসামে মুসলমানদের বাইরে যেসব লোক নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়েছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হলে তারা সহজেই ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন। একই ঘটনা ঘটতে পারে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অন্য রাষ্ট্রগুলোতেও। সেটাই ভয় সেভেন সিস্টারে।

দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী রাজ্যসভায় বিলটি নিয়ে বিতর্ক শুরুর আগে টুইটারে দেওয়া এক বার্তায় লিখেছেন, ‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জাতিগত নিধন চালাতে মোদি-শাহ সরকারের একটি চেষ্টা হলো এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি)। সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা এবং ভারতের বৈশিষ্ট্যের ওপর এটা এক ধরনের ফৌজদারি আক্রমণ। আমি উত্তর-পূর্বের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি জানাই এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবো।’

কংগ্রেসের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট আরেক টুইটবার্তায় লিখেছেন, ‘সিএবি-টা হচ্ছে ভারতীয় সংবিধানের ওপর একটি আঘাত। আর এটাকে সমর্থনের মানে হচ্ছে আমাদের জাতির মূলভিত্তিকে ধ্বংসের চেষ্টা ও আক্রমণে শামিল হওয়া।’

ভারত আর্থিক মন্দার কবলে পড়েছে। রাজনৈতিক কারণে বিশৃঙ্খলা দেশকে আরও দুর্গতিতে ফেলবে মনে হচ্ছে। আমরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করি। তিনি বলেছেন তার রাজ্যে এনআরসি এবং সিএবি বিল কিছুই কার্যকর করতে দেবেন না। আসলে নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহরা প্রাচীন ধারণাকে অবলম্বন করে যে বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারত শাসন করতে চাচ্ছেন তা কখনও সম্ভব নয়। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য ছাড়া ভারত টিকতে পারে না। তারা যে পথে অগ্রসর হতে পা বাড়িয়েছেন তাতে ভারতের সংহতি নষ্ট হবে, ভারত বিপর্যস্ত হবে।

নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের কর্মকাণ্ডে মনে হয় এদের কোনও আধুনিক স্বপ্ন নেই। তাদের কোনও কাজও নেই। শিল্প বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব যে দুনিয়ার চেহারা পাল্টে দিয়েছে তার কোনও খবরই তাদের কাছে পৌঁছায়নি। তাদের দৃষ্টিতে মনে হয় এখনও বাস্তিলের পতন হয়নি। পরিবর্তনের ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনও জাতি বাঁচতে পারে না। এনআরসি-সিএবি একত্রিত করে সাভারকারের ধারণার ভিত্তিতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন তারা।

ইন্টারপ্রেটার নাটকের এক চরিত্রের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে, ‘তোমরা অন্ধের হাতে দর্শনের মোমবাতি তুলে দিচ্ছ। অন্ধ এটাকে লাঠি ছাড়া আর কী রূপে ব্যবহার করতে পারে!’ তেমনি মনে হয় নরেন্দ্র মোদির মতো ধর্মান্ধরা ক্ষমতার মোমবাতি হাতে পেয়ে কীভাবে আর ব্যবহার করবে! সম্ভবত ভারতটাকেই জ্বালিয়ে দেবে এখন, সেই মোমবাতির আগুনে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ