‘পুরাই অস্থির’

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:১৪, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৬, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলামকথায় কথায় ইদানীং বলতে শোনা যায়–‘অস্থির’। কেউ বা বলে ‘পুরাই অস্থির’। বিশেষ করে আজকের প্রজন্মের কিশোর তরুণ বা তরুণ-তরুণীরা কোথাও কোনও কিছু দেখে এসে বিস্ময়ের বহিঃপ্রকাশ করে বলে–‘অস্থির, সেরকম, এক্কেবারে ঝাক্কাস, মাত্থাই নষ্ট’!
আমরা ‘অস্থির’ কথার নানা অভিব্যক্তি দেখে থাকি। ‘অস্থির’ শব্দটা নেতিবাচক হিসেবে দেখলেও বর্তমান প্রজন্মের প্রকাশভঙ্গিতে এটা বেশ উৎফুল্ল অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। এই অস্থিরতার শুরু কবে? সেটা দিনক্ষণ বা বছর হিসেবে বলা খুবই কঠিন। অস্থিরতা চলছে সমাজের সর্বত্র। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক,ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, সরকারি দফতর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প সাহিত্য সবখানেই অস্থিরতা বিরাজমান।
অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সামাজিক জীবনকে অস্থির করে তুলেছে। কে কার চেয়ে এগিয়ে বিত্ত-বৈভবে  এটার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সে কী কাতরতা মানুষের মধ্যে। কার কটা গহনা, কার পোশাক কোন ব্র্যান্ডের, কোনটা কোন দেশ থেকে ওমুক এনে দিয়েছে, তমুক এনে দিয়েছে– এটা নিয়ে চলছে সামাজিক দৌড়। এ দৌড় থামানোর কোনও কি ট্যাবলেট তৈরি হয়েছে বিশ্বে?

পড়াশোনায় অল্প-স্বল্প, কিন্তু রাজনৈতিক দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে, এমন একজন তরুণ এক শিক্ষিত মেধাবী যুবকের চেয়ে শত গুণ টাকা কামাচ্ছে। পড়াশোনা করে কিছু হবে না-বরং সরকারি দলের একটি অঙ্গ সংগঠনের নামমাত্র পদ বা উপ-কমিটিতে জায়গা করে নিতে পারলেই আর পায় কে? ঘরে বসে খালি মোবাইলে হুকুম-‘টাকা তুলে নিয়ে আয় ফুটপাতের দোকান থেকে, ওমুক গার্মেন্টেস-এর মালিকের কাছ থেকে, পরিবহন থেকে। ওমুক এলাকায় রাস্তার উন্নয়ন কাজ চলছে, যা ঠিকাদারকে ধরে নিয়ে আয়। লাখ দশেক টাকা দিতে বল। না দিলে কি করতে হবে, সেটা কি বলে দিতে হবে?’

এরকম হুমকি-ধামকি দিয়ে মাসে প্রচুর ইনকাম। ‘রাজনীতি’ সবচেয়ে দামি পেশা বাংলাদেশে এই অস্থির সময়ে। অথচ রাজনীতি হওয়ার কথা শুধুমাত্র মানুষের কল্যাণে। রাজনীতিবিদদের মানুষের অধিকার নিয়েই কথা বলার কথা। কিন্তু মানুষের অধিকারের কথা কে বলে এখন?  শোষণের বিরুদ্ধে কে কথা বলে রাজপথে? সবাই খালি ক্ষমতায় যেতে সাধারণ মানুষকে ‘গিনিপিগ’ বানিয়ে রাখে। অস্থির সময়ে নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত সবাই।

অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের খুবই নাজুক। এক ধরনের অস্থিরতা সব সময় রয়েছে। শেয়ারবাজারে টানা দরপতনে অনেক সাধারণ মানুষ পথে বসে গেছে। যারা নিজের সহায়-সম্বল বিক্রি করে বুঝে না বুঝে বিনিয়োগ করেছিল,তাদের অনেকেই সিকিউরিটি হাউসগুলোতে বসে থাকে কখন এক টাকা বাড়বে সে আশায়।

পাশাপাশি রয়েছে ব্যাংক জালিয়াতি, ঋণখেলাপি। তাদেরকে না ধরে বরং সুযোগ দেওয়া হচ্ছে নানা রকমের ‘ভেলকিবাজি’র কথা বলে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, কী নেই? সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে, কেন? ব্যাংকই তো ছিল নিম্নবিত্তের একমাত্র সঞ্চয়ের ভরসার স্থল। মানুষ তার তিল তিল করে জমানো টাকা কোথাও বিনিয়োগ করার ভরসা পাচ্ছে না।

অর্থনীতির এই অস্থির সময়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে পেনশনভোগী, অসহায় নারী-পুরুষের শেষ অবলম্বন সঞ্চয়পত্রেও কর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও সরকারের লক্ষ্য ধনীদের লাগাম টেনে ধরে সঞ্চয়পত্র থেকে তাদেরকে সরিয়ে রাখা। কারণ অনেক ধনী মানুষ কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নামে বেনামে নানা জায়গায় থেকে লিমিট ছাড়া সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছে। তাদের জন্য সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কারণ এখন ই-টিন এবং ব্যাংক হিসেব দিতে হয় সঞ্চয়পত্র কেনাকাটা করতে গেলে। অনেকে এটাকে ভয় হিসেবে দেখছে।

অস্থিরতা চলছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। সুযোগ পেলেই ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে মুনাফাখোর- কালোবাজারিরা চাল ডাল তেল লবণসহ সবশেষে পেঁয়াজ নিয়ে যা করেছে তা ইতিহাসে জায়গা নেওয়ার মতো অবস্থা। সবচেয়ে অবাক লাগে তখনই যখন দেখা যায় এদের কারও টিকিটিও ধরা যায়নি। অনেকে বলে থাকেন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এমনটা করা হয়েছে। কিন্তু সরকার কেন তাদের ব্যাপারে কঠোর হচ্ছে না? এখন পর্যন্ত একজন মজুতদারকেও ধরা গেছে? শুধু আমদানির কাগজপত্র দেখেই খালাস। সর্ষের ভেতরেই ভূত থাকে, নিন্দুকদের এ কথাটা কখনো কখনো সত্যি মনে হয়।

প্রশাসনে কোনও প্রকার সুস্থ পরিবেশ আছে? ঘুষ, দুর্নীতির মহাউৎসব সবখানে। কোনও একটা কাজ সাধারণ মানুষ ঘুষ ছাড়া বা অফিস খরচ ছাড়া করতে পারে না। যেন প্রশাসনের কর্মকর্তা বা কর্মচারিরা বেতন পান না, ওই অফিস খরচের টাকা দিয়েই তাদের সংসার চালাতে হয়। সরকারি দফতরে নৈরাজ্যের কথা প্রায়ই পত্রপত্রিকায় পড়ে থাকি। অফিস না করে শুধু ওভারটাইম করে কর্মচারিরা প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছেন। এর পেছনে সিবিএ নেতাদের একটা বিরাট অংশ জড়িত বলেও অভিযোগ আছে। এই নেতাদের রাজনৈতিক হুংকারে অনেক কর্মকর্তা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে নানা রকমের অস্থিরতা। ভর্তি বাণিজ্য থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফরম ফিলাপে বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ টাকা বেশি নেওয়া হয়। সরকার সে টাকা ফেরত দিতে বললেও অনেক সাংসদ-মন্ত্রীরা সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা বোর্ডে থাকার কারণে শেষপর্যন্ত না দিয়েই পার পেয়ে যান। অস্থিরতা কোথায় নেই? সবশেষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাগিং আতঙ্ক। যার বলি হলো বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মেরুদণ্ডহীন প্রধানদের কারণে ছাত্ররাজনীতি এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে পড়াশোনা শিকায় উঠে গেছে। অস্থিরতা কখনোই শিক্ষার জন্য অনুকূল পরিবেশ হতে পারে না। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজস্ব জ্ঞান গরিমায় দেশকে কিছু দিতে চায় তখনই দেখে নানা অসংলগ্নতা। বাধ্য হয়েই যাদের বাবা-মার টাকা পয়সা আছে তারা চলে যায় দেশের বাইরে পড়াশোনা করার জন্য। দেশে থেকে কখন না আবার প্রাণটা হারাতে হয়! এ ভয়ে।

শিল্প-সাহিত্য বলে কি এখন কিছু আছে?  অনেকেই প্রশ্নটা করেন আড়ালে থেকে। হুট করে রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার মতলব সবখানে। দু’চারটা গল্প কবিতা লিখে কিভাবে তেলবাজি করে পদক-টদক বাগিয়ে নেওয়া যায় সে ধান্দায় সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। আর আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরাও শুনি আজকাল টাকায় সবকিছু বিকিয়ে দেয়। ওমুক পুরস্কারের ব্যাপারে লবিং করে কাউকে পাইয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও নাকি ঘটে দেশে। এছাড়া সঙ্গীত সাধনায় নিমগ্ন না থেকে হুট করে যেনতেনভাবে বেসুরে গলায় গান তুলে সিডি বের করে বা ইউটিউবে গান ছেড়ে দেওয়া হয়। আর টাকার বিনিময়ে মিডিয়া কভারেজ পাওয়ার পাঁয়তারাও কারো কারোর মধ্যে লক্ষণীয়।

অস্থিরতা নিয়ে লিখতে গিয়ে অস্থিরতা বোধ করছি, কে জানে কার আঁতে আবার ঘা লেগে যায়!

অস্থির,পুরাই অস্থির যখন জাতি তখন সকলের ভেতর ভয় কাজ করবেই। কখন কার অস্থিরতা বেড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে।

আমরা অস্থির হতে চাই না, সুস্থির হতে চাই। নতুন প্রজন্মের মতো আনন্দার্থেই অস্থিরতাকে দেখতে চাই। জয় হোক আনন্দের।

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ