এমন তালিকা মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান

Send
বিধান রিবেরু
প্রকাশিত : ১২:৩২, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৭, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

বিধান রিবেরুকোনও রাষ্ট্রের জনগণ যখন মন খুলে সরকারের কোনও কৃতকর্মের সমালোচনা বা ভুল ধরিয়ে দিতে আতঙ্ক বা শঙ্কাবোধ করেন, তখন তারা বেশিরভাগ সময়ে হয় চুপ করে থাকেন, নয়তো সীমিত পরিসরে মৃদুস্বরে বলার চেষ্টা করেন, অথবা ব্যঙ্গ ও রূপকের ছলে তাদের সমালোচনা প্রকাশ করেন। অনেকে আবার সরকারের নেক নজর থেকে বঞ্চিত হতে পারে কিংবা সরকারি যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তা আর নাও জুটতে পারে, এমন ভয় থেকেও সমালোচনা থেকে বিরত থাকেন। উল্টো যারা মৃদুস্বরে বা ব্যঙ্গ করে সমালোচনা করছেন, তাদেরও একহাত নিয়ে নিতে পারে।
এই যেমন সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা, সমালোচনা ও অনালোচনা। [যদিও ইতোমধ্যে বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) রাজাকারের তালিকাটি স্থগিত করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।] তালিকায় ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের নাম আছে। ফারসি শব্দ রাজাকারের অর্থ স্বেচ্ছাসেবী। তো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসে এই স্বেচ্ছাসেবীরা পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিলে স্বেচ্ছায় যে কাজ করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য, মানবতাবিরোধী। তবে পরবর্তীকালে আমরা এই মুক্তিযুদ্ধ ও তার বিরুদ্ধ শক্তির দ্বন্দ্বকে নিয়ে যে নোংরা খেলায় মেতে উঠলাম, সেটি কি ক্ষমার যোগ্য? সদ্য প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় কেবল নামকরা মুক্তিযোদ্ধাই নন, যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে মৃত্যুবরণ করা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের স্ত্রীর নামও রয়েছে দেখা যাচ্ছে। আজ অবধি কেউ শুনেছেন হিন্দু কোনও মানুষ, তাও নারী, রাজাকারি করেছেন? যাইহোক, এই তালিকা প্রকাশ করেছে এমন একটি দল, যে দলটি আবার ১৯৭১ সালে যুদ্ধে বড় ভূমিকা রেখেছিল। অবশ্য একাত্তরের আওয়ামী লীগ আর ২০১৯ সালের আওয়ামী লীগ আকাশ আর পাতাল তফাৎ।

তালিকা তো হাজারটা জিনিসের হতে পারে। হয়েছেও। যেমন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা; এখন রাজাকারের তালিকা হলো। এমন তালিকা হতেই পারে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যে প্রবণতা সেটি আসলে বাংলাদেশে গত প্রায় সাড়ে চার দশক ধরেই গড়ে উঠেছে। এখন এই প্রবণতা ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। মতের বিরুদ্ধে গেলেই ‘রাজাকার’ বলে দেগে দেওয়ার মানসিকতা এখন প্রবল। এর প্রাতিষ্ঠানিক একটি রূপ দেখা গেলো এই নতুন রাজাকারের তালিকায়। নয়তো বাসদ নেতা ও বরিশালের সাবেক মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বাবা অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তীর নাম কেন থাকবে রাজাকারের তালিকায়? পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে খুন হওয়া মনীষার ঠাকুরদা অ্যাডভোকেট সুধীর কুমার চক্রবর্তীর সহধর্মিণী ঊষারানী চক্রবর্তীকেও রাখা হয়েছে রাজাকারের তালিকায়। এমন আরও নাম তোলা হয়ে গেছে এই নামাবলিতে। যা দেখে আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই এর মুখ্য কারণ।  

এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠলে, আত্মপক্ষ সমর্থনের ছাতা মেলে ধরে বলা হচ্ছে, না না, এই তালিকা নাকি তৎকালের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর করা। কী আশ্চর্য ঘটনা! এই তালিকা এতদিন কারও নজরে পড়লো না? নিশ্চয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গবেষকরা কাজে ফাঁকি দিয়েছেন। নয়তো এমন একটি তালিকা অনাবিষ্কৃত থাকে?

মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ২০১৩ সালেও একটি তালিকা হয়েছিল। পক্ষ ও বিপক্ষ ব্লগারদের তালিকা। সেই তালিকা খুনিদের হাতে পড়ার পর যা হওয়ার তা তো সবাই দেখেছেন। তালিকা নিয়ে রাজনীতি চলছে ভারতেও। তারা নতুন জাতীয় নাগরিক তালিকা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি, নাগরিকত্ব আইনও পাস করে ফেলেছে। সেখানে আবার সংকট ভিন্ন জায়গায়। বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণেই ভারতে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ভেতর সর্বদা উত্তেজনা বিরাজ করে, এটি ইচ্ছাকৃতভাবেই জিইয়ে রাখা হয়। ব্যাপারটি কুৎসিত।

মোদি সরকারের এমন কুৎসিত খেলা নিয়ে সে দেশের চিত্রতারকারা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। যদিও একটু দেরিতে। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাগরিক তালিকা ও নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন যখন রক্তারক্তিতে গড়ালো তখনই তারা মুখ খুলেছেন। যেমন, অনুরাগ কশ্যপ, তাপসী পান্নু, রাজকুমার রাও, স্বরা ভাস্কর প্রমুখ আন্দোলনে পুলিশি ভূমিকা ও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বোঝা গেলো ভারতে এখনও এমন তারকা আছেন, যারা সরকারি হালুয়া রুটির প্রতি ‘লালায়িত’ নন, বা তারা আদতে আতঙ্কিতও নন। তাই মুখের ওপর নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে পেরেছেন।

বাংলাদেশের তারকাদের কী অবস্থা? তারা কি সরকার বা প্রশাসনের কোনও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এখন? যা টুকটাক করে থাকেন তাদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ, নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করেন। তাও আবার সরাসরি কিছু বলেন না। বলেন ঘুরিয়ে, রূপকের আশ্রয় নিয়ে, অথবা মজা করে। তাতেও দেখি, অনেক হালুয়ারুটি প্রত্যাশী, বুদ্ধিজীবী যশপ্রার্থী তেলে বেগুন ছাড়ার মতো ছ্যানছ্যান করে ওঠেন, আর একরকম বকা দিয়েই বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে তোমরা তামাশা করো, তোমাদের তো সাহস কম নয়? তাদের এমন বকাঝকা খেয়ে নিশ্চয় উল্টো প্রশ্ন জাগে, তো মুক্তিযুদ্ধকে এমন জায়গায় টেনে আনলো কারা? কিন্তু শঙ্কা থেকে তারা আর উল্টো প্রশ্ন করেন না। এরপর বকা একা না এসে, ‘ঝকা’ বা ঝাঁকিসহ আসতে পারে, তখন সামলানো মুশকিল হবে। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়।

মজার ব্যাপার, কিছু দিন আগে এক সাজাপ্রাপ্ত রাজাকার, মানবতাবিরোধী অপরাধী কাদের মোল্লাকে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা ‘শহীদ’ বলায় এই ‘বকাঝকা’ করাদের দলই বেশ সরব হয়ে উঠেছিল। এমনকি অন্য দল পত্রিকা অফিসে ভাঙচুরও চালিয়েছে। অথচ আজ যখন মহান মুক্তিযোদ্ধাদের নাম উঠে যাচ্ছে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায়, সবাই দেখি কেমন নীরব। কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলায় মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত শহীদদের যেমন অপমান করা হয়, তেমনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকার বানিয়ে দেওয়াও কম দোষের নয়। এর দায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে হবে না। এর দায় নিতে হবে। নইলে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মা শুধু নয়, জীবিত মুক্তিযোদ্ধারাও ব্যথিত হবেন, এমনকি তারা মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মানকেও প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ