মানবাধিকার ও রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরার অধিকার

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১২:১২, ডিসেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৭, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৯

সালেক উদ্দিনডিসেম্বর মাস বাংলাদেশিদের জন্য যেমন বিজয়ের মাস, অহংকারের মাস; তেমনি সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য মানবাধিকারের মাসও। এই মাসেই পালিত হয় বিশ্ব মানবাধিকার দিবস।
এ মাসেই সভা-সমাবেশে বিজ্ঞ বক্তারা বলেন, সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিয়ে পৃথিবীর সব দেশে সব মানুষ যে জন্মগ্রহণ করে সেই কথা। বলেন, মানুষের সহমর্মিতার কথা, ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব পোষণ করার কথা, স্বাধীনতা ও ব্যক্তির নিরাপত্তা অধিকারের কথা, নিষ্ঠুরতা, আমানবিকতা ও অবমাননাকর আচরণ পরিত্যাগের কথা, আইনের চোখে সবার সমতার কথা, প্রত্যেকের চিন্তা বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকারের কথা, অভিমত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা।
জন্মগতভাবে সব মানুষ স্বাধীন এবং প্রত্যেকেই সমান সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। মানুষের এই সমান মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষার অধিকারই মানবাধিকার, যা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সংবিধিবদ্ধ আইনের অবতারণা করা হয়েছে। পৃথিবীতে মানবাধিকারের বিষয়টি জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী শুরু হয়েছে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এর গোড়াপত্তন হয়েছিল বহুকাল আগে। ধারণা করা হয়ে থাকে, ৫৩৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পারস্যের রাজা দ্বিতীয় সাইরাস ব্যাবিলন জয় করে সেখানকার নির্যাতিত দাস জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করে দেন এবং সাম্রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহিংসতা প্রতিরোধ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেন। মনে করা হয়ে থাকে মানবাধিকারের গোড়াপত্তন তখন থেকেই।

পৃথিবীর প্রথম মানবাধিকার সংবিধান প্রবর্তিত হয় ৬২২ সালে। সে বছর মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবী (সা.) পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত মানবাধিকার সংবিধান প্রবর্তন করেন। ওই সনদে সব সম্প্রদায়ের সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করার কথা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করার কথা, অন্যের ধর্মে হস্তক্ষেপ না করার কথা, রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা, সব ধরনের রক্তক্ষয়, হত্যা ও ধর্ষণ নিষিদ্ধ করার কথা, দুর্বল ও  অসহায়দের সর্বাত্মকভাবে  সাহায্য-সহযোগিতা করার কথা বলা হয় এবং বিশ্বমানবাধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়।

মদিনা সনদের পর ম্যাগনা কার্টা, পেটিশন অব রাইটস, বিল অব রাইটস ইত্যাদি পর্ব অতিক্রম করে মানবাধিকারের বিষয়টি বর্তমান অবস্থানে এসেছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। ১৯৫০ সালে এই দিনটিকে জাতিসংঘ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেই থেকেই বিশ্বজুড়ে ১০ ডিসেম্বর দিনটি বিশ্ব মানবাধিকার দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে, যা এখনও চলছে এবং চলবে অনন্তকাল। পালিত হবে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস হিসেবেই।

বাংলাদেশে আমরা যখন মানবাধিকার নিয়ে এত সোচ্চার, তখন আমাদের ঘাড়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমারের মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত কারণে তাদের রাখাইন প্রদেশের প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বোঝা। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মানসকন্যার তকমা পাওয়া এবং ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলরের গদিতে বসে থাকা অং সান সু চি’র দেশের সেনাদের অমানবিক নির্যাতনের কারণে ধাপে ধাপে এসব রোহিঙ্গা শরণার্থী জীবন বাজি রেখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হাজারো পৈশাচিক নির্যাতনের চিত্র।

শত শত রোহিঙ্গা নারী পুরুষকে উলঙ্গ করে চোখ বেঁধে বেয়নেট দিয়ে রক্তাক্ত করার চিত্র। জাতিগত নিধনের উদ্দেশ্যে দেশের সেনাবাহিনীর হাতে রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য, নির্বিচারে গণহত্যা গণধর্ষণের নরক রচনার দৃশ্য, সর্বোপরি রাখাইনে মানবাধিকার হত্যার চিত্র।

মানুষের রক্তে ভাসমান রাখাইনের সেই নির্যাতন থেকে বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে বানের স্রোতের মতো পালিয়ে এসেছিল বাংলাদেশে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরাও আশ্রয় দিয়েছি তাদের এবং মানবাধিকারের দাবিতেই বিশ্ববিবেকের কাছে ধরনা দিয়েছি তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে যাওয়ার সার্বিক ব্যবস্থা করতে।

জাতিসংঘসহ বিশ্ববিবেকের কাছে আমরা প্রশংসিত হয়েছি। আমাদের ডাকে তারা সাড়াও দিয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিসিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে মামলা হয়েছে, যা এখনও তদন্তাধীন আছে। এরপর ওআইসির সমর্থনে আফ্রিকার ক্ষুদ্রতম দেশ গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ ( আইসিজে)তে মামলা হয়েছে। এর শুনানি অনুষ্ঠিত হলো নেদারল্যান্ডের দ্য হেগ শহরের পিস প্যালেসে ১০ ডিসেম্বর, যেদিন বিশ্ববাসী বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পালন করছিল।

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়া গত ১১ নভেম্বর ‘ওয়ার্ল্ড কোর্ট’ নামে পরিচিত  আইসিজেতে এই মামলাটি করে। মামলার পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধি দল গিয়েছিল সেখানে। শুধু বাংলাদেশ নয়, কানাডা ও নেদারল্যান্ডসও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে গাম্বিয়াকে সাহায্য করেছে।

মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল এবং তাদের আইনজীবী ছাড়া তাদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য কেউ কথা বলেনি। বলিষ্ঠ কোনও যুক্তিও দাঁড় করাতে পারেনি তারা। ভুক্তভোগী দেশ বাংলাদেশ গণহত্যা বিবেচনা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন মনে না করার বিষয়টিকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে গাম্বিয়ার অভিযোগ অযৌক্তিক।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে গাম্বিয়ার এই উদ্যোগ। তারা সু চি’র মিয়ানমারকে ধিক্কার দিয়েছে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার জন্য। রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার প্রত্যাশা করছে সবাই। সেই সঙ্গে পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমি রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়ার যৌক্তিকতা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

তারপরও বলতে দ্বিধা নেই, এই পৃথিবী পরিচালিত হয় গুটিকয়েক পরাশক্তিধর দেশের ইশারায় বা ইচ্ছায়। সেই রকম কোনও শক্তির হাতছানিতে রাখাইনের রোহিঙ্গারা যদি গণহত্যার বিচার না পায়, যদি শত শত বছর ধরে রাখাইনে বসবাস করেও নাগরিকত্বের গৌরব নিয়ে নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে না পারে, জাতিগত অধিকার ফিরে না পায়, মানবাধিকার নিশ্চিতকল্পে যদি কফি আনান পরিষদের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন না হয়, তবে ‘বিশ্ব মানবাধিকার’ শব্দটি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয় বলেই প্রমাণিত হবে।

লেখক: কথা সাহিত্যিক

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ