প্রতিবাদ করার অধিকার বিশ্বের সবার আছে

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৪:৪২, ডিসেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৫, ডিসেম্বর ২১, ২০১৯

প্রভাষ আমিননুরুল হক নুর প্রচলিত মানদণ্ডে ‘আনস্মার্ট’। এখনও চলনে বলনে ‘গেঁয়ো ভাব’ আছে। বড় কোনও সংগঠনেরও সমর্থন নেই তার। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, স্বার্থপর, অন্যায় কিন্তু জনপ্রিয় এই আন্দোলনই তাকে নেতৃত্বের সামনের কাতারে নিয়ে আসে। তবে এত বড় আন্দোলন কিন্তু নুরুল হক নুর ছাড়া আর কাউকে নেতা বানাতে পারেনি। আর এখন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের চেয়েও অনেক বড় নেতা নুরুল হক নুর। হঠাৎ করে নেতৃত্বে আসা নুরের ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়ে যাওয়াটা চমকে দিয়েছিল অনেককেই। আমি অনেক ভেবেছি তার সাফল্য নিয়ে, তার যোগ্যতা নিয়ে। অনেক কিছুই আছে এই সাফল্যের পেছনে। তবে আমার বিবেচনায় তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা মার খেতে পারা এবং মার খেয়েও মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারা। কেউ মার খেলে তার প্রতি সাধারণ মানুষের একটা সহানুভূতি তৈরি হয়। নুরুল হক নুরের মধ্যে একটা ‘নাটুকে’ ব্যাপার আছে, ফুলের ঘায়েই মুর্ছা যাওয়ার দশা। সেই ফুলের আঘাতে মুর্ছা নিয়েও অনেক কথা হয়। কিন্তু তাকে ফুলের আঘাত দিতেও তো কেউ না কেউ যায়। আর যায় বলেই নুরু ‘নাটক’ করার সুযোগ পায়। ছাত্রলীগ বা সরকার সমর্থকরা মেরে মেরেই নুরুল হক নুরকে ভিপি বানিয়েছে। এখন আরও বড় নেতা বানানোর প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার কেন জানি মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, নুরু তার ওপর হামলা চালানোর জন্য হামলাকারীদের ভাড়া করেনি তো। একটু ফাইল ঘেটে দেখুন, সাম্প্রতিক সময়ে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের সব নিউজই তার ওপর হামলা সংক্রান্ত। তার মানে হামলা না হলে এতদিনে তিনি মিডিয়ায় হারিয়ে যেতেন। ছাত্রলীগ এবং সরকার সমর্থকরা হামলা চালিয়ে চালিয়ে তাকে মিডিয়ার নজরে রেখেছে এবং আরো বড় নেতা হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বারবার হামলা করতে করতে ছাত্রলীগ বোধহয় ক্লান্ত। আর একা একটা লোকের ওপর বারবার হামলা চালানোটা কাপুরুষোচিতও। তাছাড়া নানা ঘটনায় ছাত্রলীগ বিতর্কিত। সে কারণেই কিনা জানি না, ছাত্রলীগ একটু বিরতি নিয়েছে। নুরুল হক নুরকে ঠেকাতে এখন মাঠে নেমেছে মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সে আন্দোলনের বিরোধিতা করতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থ সংরক্ষণের ভাবনায় গঠিত মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ এ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন কিছু হামলা চালানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারেনি। অবশ্য সাংগঠনিক অন্তর্দ্বন্দ্বকে অর্জন ধরলে অল্প সময়ে তাদের অনেক অর্জন। বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার, কমিটি-পাল্টা কমিটিতে বেশ জমজমাট মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ।

এখন তো তাদের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে, নাম যাই হোক, তাদের আসল কাজ নুরুল হক নুরকে ঠেকানো। কয়েকদিন আগে নুরের একটি টেলি কনফারেন্স ফাঁস হয়। তার ভিত্তিতে নুরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তার পদত্যাগ দাবি করে মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ। এরপর তারা ডাকসু কার্যালয়ে ভিপির রুমে তালা লাগিয়ে দেয়। পদত্যাগ দাবি পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু ডাকসু ভিপির রুমে তালা লাগিয়ে দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চকে? দুর্নীতির অভিযোগে ডাকসুর ভিপির রুমে তালা দিয়ে তার পদত্যাগ দাবি করলেও এর আগে ডাকসু জিএস যখন দুর্নীতির অভিযোগে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন কিন্তু মঞ্চের কোনও তৎপরতা দেখা যায়নি। তার মানে এই মঞ্চের আসল নাম নুর ঠেকাও মঞ্চ। নাম মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ হলেও এটি আসলে ছাত্রলীগেরই এক্সটেনশন। যে অপকর্মে ছাত্রলীগের লজ্জা লাগে, সেগুলো করতেই হয়তো মঞ্চকে লেলিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল একই সঙ্গে ছাত্রলীগেরও সহসভাপতি। আর মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন এক সময় ছাত্রলীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপসম্পাদক ছিলেন। তাই যাহা বায়ান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন।
ফেসবুকে দেখলাম অনেকেই বলছেন, নুর ভারতে নির্যাতন নিয়ে প্রতিবাদ করেছে, পাকিস্তান নিয়ে করেনি কেন, উইঘুর নিয়ে করেনি কেন? আরে কী মুশকিল। নুরুল হক নুর কোনটা নিয়ে প্রতিবাদ করবে, কোনটা করবে না; সেটা তো তার সিদ্ধান্ত।

আপনার কাছে যেটা অন্যায় মনে হচ্ছে, নুরুল হক নুরের কাছে তো সেটা অন্যায় নাও মনে হতে পারে। যেমন ভারতের নাগরিকত্ব বিল সংশোধনের বিপক্ষে অনেক মানুষ যেমন প্রতিবাদ করছে, আবার অনেক মানুষ নিশ্চয়ই এর পক্ষেও আছে। আপনার বিবেচনা তো আপনি আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারেন না। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের সব মানুষের চিন্তার, মত  প্রকাশের, সমাবেশ করার অধিকার রয়েছে। আপনার মতের সঙ্গে না মিললে আপনিও প্রতিবাদ করুন। কিন্তু কারো সমাবেশে হামলা করার অধিকার কারোই নেই।
একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘বঙ্গবন্ধু’ কোনও সংগঠনে এই দুটি শব্দ ব্যবহার করার ব্যাপারে আমাদের অতি সতর্ক থাকা দরকার। আমার মনে হয় সরকারের এ ব্যাপারে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। কারো ইচ্ছা হলো, আর আগে পরে মুক্তিযুদ্ধ বা বঙ্গবন্ধু লাগিয়ে একটি সংগঠন করে ফেললেন; এটা হওয়া উচিত নয়। কারণ সংগঠনের তৎপরতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু শব্দও আলোচিত বা সমালোচিত হয়। যেমন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ যে বারবার হামলা চালাচ্ছে, তাতে কিন্তু বারবার ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি বিতর্কিত হচ্ছে। তাই আমি দাবি জানাচ্ছি, কেউ যাতে যেনতেনভাবে আমাদের অতি আবেগের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দকে অবমাননা করতে না পারে।
মার না খেলে ডাকসু ভিপি নুরের অন্য কোনও তৎপরতা তেমন পত্রিকায় আসে না। তবে নুরুল হক নুর কিন্তু নানাকিছু করেন। ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গত ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন নুরুল হক নুর এবং ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেয়। দু’পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়। দুইপক্ষই পাল্টাপাল্টি মামলা করেছে। এখানে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ হামলাকারী, আর নুর আক্রান্ত। প্রশ্নটা হলো মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ নুরুল হক নুরের প্রতিবাদের অধিকারে বাধা দিতে গেলো কেন? মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেছেন, ‘এনআরসি ও ক্যাব ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। নুরুল একজন ছাত্র প্রতিনিধি। এটা নিয়ে কথা বলা বা প্রতিবাদ করার এখতিয়ার তার নেই।’ প্রতিবাদ করা নুরুল হক এবং তার সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, সেখানে এই আল  মামুনকে নাক গলানোর এখতিয়ার কে দিয়েছে? তাছাড়া বাংলাদেশের মানুষের কথা বলা বা প্রতিবাদ করার বিষয় ঠিক করার এখতিয়ারই বা আল মামুনকে কে দিয়েছে? এই আল মামুনটা কে, কবে থেকে তিনি মত  প্রকাশের লিমিট ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন?
বাংলাদেশে কিছু শারীরিকভাবে আটকে পড়া পাকিস্তানি আছে। আবার কিছু আছে মানসিকভাবে আটকে পড়া পাকিস্তানি। একইসঙ্গে মানসিকভাবে আটকে পড়া কিছু ভারতীয়ও আছে। এই আটকে পড়ারা তাদের আসল দেশের স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে সবকিছু বিবেচনা করে। বাংলাদেশটা তাদের বিবেচনায় পড়ে থাকে। এই আল মামুনরা হলো মানসিকভাবে আটকে পড়া ভারতীয়। তাই ভারত যখন ধর্মনিরপেক্ষ দেশ থেকে কট্টর হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে কাশ্মিরকে যখন একটি বিভক্ত কেন্দ্রশাসিত রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে; তখন সেটা তাদের কাছে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার মনে হয়। আল মামুনদের বিবেচনায় ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর এখতিয়ার কারও নেই। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, পাকিস্তানে কিছু হলে এই আল  মামুনরা চিল্লায়া গলার রগ ছিড়ে ফেলবে। তখন সেটা তাদের কাছে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় মনে হবে না। আমাদের দেশে এমন আল মামুনদের যেমন অভাব নেই। আবার মানসিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের সংখ্যাও কম নয়। অবশ্যই আমরা আলাদা দেশকে আলাদাভাবে বিবেচনা করবো। তবে সবকিছুর আগে বিবেচনা হতে হবে বাংলাদেশ। দেশের স্বার্থের মানদণ্ডেই নির্ধারিত হবে বন্ধুত্ব।
একাত্তরের ভূমিকার কারণে পাকিস্তানের প্রতি আমার চিরদিনের ঘৃণা। একাত্তরের সহায়তার জন্য ভারতের প্রতি আমার চিরদিনের কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা আছে, তাই বলে ভারতের কোনও অন্যায়ে গলা মেলাতে হবে বা চুপ করে মেনে নিতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। একাত্তরে ভারতের সহায়তা ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা সম্ভব ছিল না, এটা যেমন সত্যি; আবার বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, সেটিও ভারতকে মাথায় রাখতে হবে। স্থিতিশীল পারস্পরিক সম্পর্ক দুই দেশের জন্যই দরকার। তবে সম্পর্কটা হতে হবে সমতা আর মর্যাদার ভিত্তিতে। সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবি জারি রাখতে হবে। নাগরিকপঞ্জি করে ভারতের বাংলাভাষী মুসলমানদের কোণঠাসা করার অপচেষ্টায় আমরা উদ্বিগ্ন হই। নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের মৌলিক কাঠামোতে আঘাত করে তাকে কট্টর কিন্তু রাষ্ট্রে বদলে দেওয়ার চেষ্টায় আমরা শঙ্কিত হই। আল  মামুনদের বুঝতে হবে, বিবেচনাটা হতে হবে শুধু ন্যায় না অন্যায়; সেটা দিয়ে।

কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে আসলে কিছু নেই। কোথাও অন্যায় হলে সারাবিশ্বের মানুষ তার প্রতিবাদ করবে। ভারতের মতো একটা বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যখন ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা থেকে সরে যায়, তখন তা উদ্বিগ্ন করে গোটা বিশ্বের শুভ ইচ্ছার মানুষদেরই। কারণ এর প্রভাব শুধু ভারতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিবেশী ছাপিয়ে এর প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বেই। কারণ প্রযুক্তির কল্যাণে গোটা বিশ্বই এখন একটা গ্রাম। আল মামুন সাহেব কী বলবেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ই যদি হবে তাহলে গাম্বিয়া কেন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করলো? যুগে যুগে দেশে দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ হয়েছে, হবে। বিবেচনাবোধটা কখনোই কোনও দেশের সীমানায় আটকে থাকেনি। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদ হয়েছে সারাবিশ্বে। একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে ছিল বিশ্ব বিবেক। তাই আপনি শুধু ঘটনার ন্যায্যতা বিবেচনা করবেন, অন্যায়টা বিবেচনা করবেন; আপনার বিবেককে প্রশ্ন করুন। অভ্যন্তরীণ বিষয় একটি কূটনৈতিক টার্ম। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো এ ভাষায় কথা বলবেন। কিন্তু একজন বিবেকবান মুক্ত মানুষ কখনই অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যাবেন না। অন্যায় মনে হলে প্রতিবাদ করুন; দেশটা ভারত হোক, পাকিস্তান হোক, চীন হোক, ইসরায়েল হোক, যুক্তরাষ্ট্র হোক। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার বিশ্বের সব মানুষের আছে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ